১৯৫১ সালে প্রিন্সটনের জ্যোতির্বিজ্ঞানী লাইম্যান স্পিটজার স্কি করার সময় এক বৈপ্লবিক চিন্তা করেন: টোকামাকের মতো প্লাজমার ভেতর বিপজ্জনক বিদ্যুৎ প্রবাহ না চালিয়ে যদি বাইরে থেকেই জটিল ত্রিমাত্রিক কয়েল পেঁচিয়ে চৌম্বক বলরেখাকে মোচড় দেওয়া যায়, তবে কেমন হয়? জন্ম নিল স্টেলারেটর (Stellarator)—নক্ষত্রের মতো এমন এক ফিউশন চুল্লি যা কোনো আকস্মিক প্লাজমা বিস্ফোরণ (Disruption) ছাড়াই অবিচ্ছিন্নভাবে মাসের পর মাস একটানা চলতে পারে।

১. স্টেলারেটরের মূলনীতি: বাহ্যিক চৌম্বক মোচড়

টোকামাকে প্লাজমার ভেতরেই কয়েক মিলিয়ন অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট চালাতে হয়, যা প্লাজমার ভেতর মারাত্মক অস্থিতিশীলতা তৈরি করে এবং চুল্লিকে থেমে থেমে (Pulsed) চালাতে বাধ্য করে। কিন্তু স্টেলারেটরে প্লাজমার ভেতর কোনো কারেন্ট থাকে না ((I_{ ext{plasma}} = ০))। চৌম্বক বলরেখার মোচড় পুরোপুরি বাইরের জটিল ত্রিমাত্রিক কয়েল দ্বারা তৈরি হয়। ফলে স্টেলারেটরে কোনো প্লাজমা বিস্ফোরণ ঘটার শক্তি থাকে না এবং এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে অবিরাম শক্তি উৎপাদন করতে পারে।

২. পুরোনো স্টেলারেটরের নিওক্লাসিক্যাল সমস্যা

টোকামাকে বৃত্তাকার প্রতিসাম্যের কারণে কণাগুলো চৌম্বক খাঁচায় আটকে থাকে। কিন্তু প্রাথমিক স্টেলারেটরগুলোতে কোনো প্রতিসাম্য না থাকায় কণাগুলো চৌম্বক খাঁচার খাঁজে আটকা পড়ে সরাসরি বাইরের দিকে ছিটকে বের হয়ে যেত। ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে সমস্ত তাপ সেকেন্ডে অপচয় হয়ে চুল্লি ঠান্ডা হয়ে যেত।

৩. সুপারকম্পিউটার বিপ্লব ও কোয়াসি-আইসোডায়নামিক ক্ষেত্র

১৯৮০-এর দশকে গণিতবিদ অ্যালেন বুজার এবং জুরগেন নুরেনবার্গ প্রমাণ করেন যে, চুল্লির বাহ্যিক আকৃতি গোল হওয়ার প্রয়োজন নেই; যা প্রয়োজন তা হলো চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতার ((|mathbf{B}|)) ভেতরের একটি বিশেষ প্রতিসাম্য। সুপারকম্পিউটারের সাহায্যে কোটি কোটি হিসাব সম্পন্ন করে এমন এক চৌম্বকীয় ক্ষেত্র আবিষ্কার করা হয় যাতে কণাগুলো খাঁজে আটকা পড়লেও বাইরে না গিয়ে চৌম্বক রেখা বরাবর ঘুরতে থাকে। একে বলে কোয়াসি-আইসোডায়নামিক (QI) ক্ষেত্র।

৪. ওয়েন্ডেলস্টাইন ৭-এক্স (Wendelstein 7-X)

জার্মানির গ্রাইফ্সওয়াল্ডে নির্মিত W7-X বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত স্টেলারেটর। এতে ব্যবহৃত হয়েছে ৫০টি প্রকাণ্ড সুপারকন্ডাক্টিং কয়েল যা দেখতে মোচড়ানো ফিতার মতো। ৪ কেলভিন তাপমাত্রায় পরিচালিত এই কয়েলগুলো মিলিসেকেন্ডের বদলে একটানা ৩০ মিনিট ধরে কোটি ডিগ্রির প্লাজমা সফলভাবে ভাসিয়ে রেখে প্রমাণ করেছে যে স্টেলারেটরই হতে পারে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবচেয়ে নিরাপদ ও স্থায়ী পথ।