নক্ষত্র, পরমাণু কিংবা খোদ সময়ের প্রবাহ শুরুর আগে, এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ছিল এক অকল্পনীয় ভৌত অবস্থায়: এক নিখুঁত পরম প্রতিসাম্য, যেখানে স্থান, কাল, পদার্থ এবং প্রকৃতির সমস্ত মৌলিক বল সংকুচিত ছিল একটিমাত্র অবিভাজ্য কোয়ান্টাম বিন্দুতে। মহাকালের সূচনা মুহূর্তের প্রথম এক কোটি ট্রিলিয়ন ভাগের এক ট্রিলিয়ন ভাগ সেকেন্ডের মধ্যে স্থান-কালের এক প্রচণ্ড সূচকীয় প্রসারণ—যাকে পদার্থবিজ্ঞানে মহাজাগতিক স্ফীতি (Cosmic Inflation) বলা হয়—অতি-পারমাণবিক স্তরের অতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম কম্পনকে মহাজাগতিক বিস্তারে টেনে প্রসারিত করেছিল। সেই অতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম বীজ থেকেই আজ জন্ম নিয়েছে দুই ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সির সুবিশাল মহাজাগতিক জাল।

জ্ঞানের প্রান্তসীমা: t = 0 মুহূর্তে আসলে কী ঘটেছিল?

বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ সম্পর্কে জনসাধারণের সাধারণ কল্পনাটি প্রায়শই একটি বিভ্রান্তিকর চিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: যেন একটি অন্ধকার, শূন্য ঘরের মধ্যে হঠাৎ একটি প্রচণ্ড পটকা ফেটে গেল। একটি উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি হলো, ধ্বংসাবশেষ মহাশূন্যে চারদিকে ছিটকে পড়ল এবং সেই শূন্যতার ভেতরে গ্রহ-নক্ষত্র তৈরি হলো। আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা (General Relativity) অনুসারে, এই মানসিক চিত্রটি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ।

প্রথমত, বিগ ব্যাং কোনো শূন্য মহাশূন্যের ভেতর ঘটা বিস্ফোরণ ছিল না; বিগ ব্যাং ছিল খোদ স্থান এবং কালের জন্মমুহূর্ত। বিগ ব্যাং-এর “বাইরে” বলে কোনো শূন্য স্থান আগে থেকে বিরাজ করছিল না। দ্বিতীয়ত, মহাবিশ্বের কোনো ভৌগোলিক কেন্দ্র নেই। মহাবিশ্বের প্রতিটি বিন্দু থেকেই মনে হয় প্রসারণটি ঠিক সেখান থেকেই ঘটছে। তৃতীয়ত, $t = 0$ মুহূর্তে ক্লাসিক্যাল সাধারণ আপেক্ষিকতা যেখানে অসীম ঘনত্ব এবং অসীম বক্রতার এক গাণিতিক “সিঙ্গুলারিটি” (Singularity) নির্দেশ করে, সেখানে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সাক্ষ্য দেয় যে স্থান-কাল নিজেই তার ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলেছিল।

স্থান-কালের মেট্রিক প্রসারণ বনাম প্রথাগত বিস্ফোরণের ভুল ধারণা
চিত্র ১.১: মহাজাগতিক উৎপত্তির গতিবিদ্যা। প্রচলিত পটকা বিস্ফোরণের ভ্রান্ত ধারণা (একটি শূন্য স্থানে পদার্থের ছড়িয়ে পড়া) বনাম সাধারণ আপেক্ষিকতার প্রকৃত সত্য: খোদ স্থান-কালের সুষম মেট্রিক প্রসারণ, যার কোনো একক কেন্দ্র নেই এবং যার কোনো বহিরাগত সীমানা নেই।

প্ল্যাঙ্ক কাল (০ থেকে ১০⁻⁴³ সেকেন্ড): কোয়ান্টাম ফোম হিসেবে স্থান-কাল

বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক সমীকরণসমূহ যে চরম সীমায় এসে তাদের কার্যকারিতা হারায়, তাকে বলা হয় প্ল্যাঙ্ক কাল (Planck Epoch)। এই চরম ক্ষণটি নির্ধারিত হয় প্রকৃতির তিনটি অপরিবর্তনীয় মৌলিক ধ্রুবক দ্বারা: প্ল্যাঙ্কের হ্রাসকৃত ধ্রুবক ($\hbar$), মহাকর্ষীয় ধ্রুবক ($G$), এবং শূন্যস্থানে আলোর দ্রুতি ($c$):

$$\text{প্ল্যাঙ্ক সময়: } t_P = \sqrt{\frac{\hbar G}{c^5}} \approx 5.39 \times 10^{-44}\text{ সেকেন্ড}$$ $$\text{প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য: } l_P = \sqrt{\frac{\hbar G}{c^3}} \approx 1.62 \times 10^{-35}\text{ মিটার}$$

এই স্কেলে মহাকর্ষের শক্তি এত প্রবল হয়ে ওঠে যে স্থান-কালের মসৃণ জ্যামিতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। স্থান-কাল কোনো মসৃণ ক্যানভাস নয়, বরং একটি ফুটন্ত, তোলপাড় করা কোয়ান্টাম ফোম (Quantum Foam)-এ পরিণত হয়, যেখানে অতিক্ষুদ্র মাইক্রোস্কোপিক ব্ল্যাকহোল এবং ওয়ার্মহোল নিরন্তর জন্ম নেয় এবং পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়। প্রকৃতির চারটি মৌলিক বল—মহাকর্ষ, সবল নিউক্লীয়, দুর্বল নিউক্লীয় এবং তড়িৎচুম্বকীয় বল—একীভূত হয়ে এক অবিভাজ্য পরম একক বল (Superforce) হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল।

প্ল্যাঙ্ক কালে হুইলারের কোয়ান্টাম স্পেসটাইম ফোম
প্ল্যাঙ্ক কালে হুইলারের কোয়ান্টাম স্পেসটাইম ফোম ($t \le 10^{-43}\text{ s}$)। প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য স্কেলে ($\ell_P \approx 1.6 \times 10^{-35}\text{ m}$), কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন সাধারণ আপেক্ষিকতার মসৃণ জ্যামিতিকে চূর্ণ করে দেয়। স্থান-কাল এক ফুটন্ত কোয়ান্টাম ফোমে রূপ নেয়, যেখানে প্ল্যাঙ্ক ভরের মাইক্রোস্কোপিক ব্ল্যাকহোল ও ক্ষণস্থায়ী অতিক্ষুদ্র ওয়ার্মহোল নিরন্তর জন্ম নেয় এবং বিলীন হয় ($T \sim 10^{32}\text{ K}$)।

স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গ: সুপারফোর্সের বিভাজন

মহাবিশ্বের বয়স যখন মাত্র $10^{-43}$ সেকেন্ড স্পর্শ করে, তখন আদিম মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ছিল প্রায় $10^{32}$ কেলভিন। এই তাপমাত্রায় মহাবিশ্ব তার প্রথম নাটকীয় দশান্তর বা ফেজ ট্রানজিশনের (Phase Transition) সম্মুখীন হয়: পরম সুপারফোর্স থেকে মহাকর্ষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে সূচনা ঘটে মহা-একীভূত বলের যুগ বা GUT Epoch (Grand Unified Theory Epoch)-এর।

স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গ এবং মৌলিক বলসমূহের পৃথকীকরণ
চিত্র ১.২: স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গ এবং বলের পৃথকীকরণ। মহাবিশ্বের তাপমাত্রা > ১০³² কেলভিন থেকে হ্রাস পেয়ে ১০¹⁵ কেলভিনে নেমে আসার সাথে সাথে আদিম পরম একক বল (Superforce) ক্রমান্বয়ে চারটি পৃথক মৌলিক বলে (মহাকর্ষ, সবল নিউক্লীয়, দুর্বল নিউক্লীয় ও তড়িৎচুম্বকীয় বল) বিভক্ত হওয়ার পর্যায়ক্রমিক চিত্র।

তাপমাত্রা যখন আরও হ্রাস পেয়ে $10^{27}$ কেলভিনে নেমে আসে (বয়স প্রায় $10^{-36}$ সেকেন্ড), তখন প্রকৃতিতে ঘটে দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বৈপ্লবিক প্রতিসাম্য ভঙ্গ। সবল নিউক্লীয় বল (Strong Nuclear Force) ইলেকট্রোউইক (Electroweak) বল থেকে পৃথক হয়ে যায়। এই বিচ্ছেদের ফলে একটি প্রচণ্ড শক্তির উদ্ভব ঘটে, যা স্থান-কালের শূন্যস্থান বা ভ্যাকুয়ামকে এক চরম পরাবাস্তব অবস্থায় রূপান্তরিত করে।

স্ট্যান্ডার্ড বিগ ব্যাং মডেলের তিনটি মারাত্মক ত্রুটি

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (CMB) আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে মূল প্রথাগত বিগ ব্যাং তত্ত্বে তিনটি অমীমাংসিত প্যারাডক্স রয়ে গেছে:

  • দিগন্ত সমস্যা (The Horizon Problem): রাতের আকাশে বিপরীত দিকে অবস্থিত মহাবিশ্বের দুটি প্রান্তের দূরত্ব প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। আলোর গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করেও তারা কখনো একে অপরের সংস্পর্শে আসতে পারেনি। অথচ তাদের তাপমাত্রা দশমিকের পর চার ঘর পর্যন্ত হুবহু এক ($2.7255\text{ K}$)। কার্যকারণ সম্পর্কহীন দুটি অঞ্চল কীভাবে একই তাপমাত্রায় পৌঁছাল?
  • সমতলতা সমস্যা (The Flatness Problem): আইনস্টাইনের সমীকরণ অনুযায়ী মহাবিশ্বের ঘনত্বের অনুপাত $\Omega$ যদি শুরুর মুহূর্তে ১.০০০০০০০০০০০০০০১ হতো, মহাবিশ্ব বহু আগেই সংকুচিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যেত; আর যদি ০.৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯ হতো, মহাবিশ্ব এত দ্রুত প্রসারিত হতো যে কোনো গ্যালাক্সি তৈরি হতে পারত না। শুরুর মুহূর্তে $\Omega$-এর মান ১-এর এত নিখুঁত কাছাকাছি কেন ছিল?
  • চৌম্বকীয় মনোপোল সমস্যা (The Monopole Problem): কণা পদার্থবিজ্ঞানের গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড তত্ত্ব অনুযায়ী উচ্চ তাপমাত্রায় প্রচুর বিচ্ছিন্ন উত্তর বা দক্ষিণ মেরুবিশিষ্ট অতিভারী চৌম্বকীয় মনোপোল তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সমগ্র দৃশ্যমান মহাবিশ্বে একটিও মনোপোলের সন্ধান পাওয়া যায়নি কেন?

মহাজাগতিক স্ফীতির অলৌকিক ঘটনা: অ্যালান গুথের সূচকীয় প্রসারণ

১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে তরুণ মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ অ্যালান গুথ (Alan Guth) এই তিন জটিল ধাঁধার এক যুগান্তকারী সমাধান আবিষ্কার করেন: মহাজাগতিক স্ফীতি তত্ত্ব (Cosmic Inflation)।

গুথ দেখালেন, সবল বল পৃথক হয়ে যাওয়ার সময় একটি কাল্পনিক স্কেলার কোয়ান্টাম ক্ষেত্র—ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্র ($\phi$)—তার সর্বনিম্ন শক্তি স্তরে পৌঁছাতে না পেরে একটি “মিথ্যা ভ্যাকুয়াম” (False Vacuum) দশায় আটকে পড়ে। এই মিথ্যা ভ্যাকুয়ামের শক্তি ঘনত্ব ছিল ধ্রুবক এবং এটি এক প্রচণ্ড ঋণাত্মক চাপ (Negative Pressure) সৃষ্টি করে। সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী, ঋণাত্মক চাপ তীব্র মহাকর্ষীয় বিকর্ষণ বা রিপালশন তৈরি করে।

মহাজাগতিক স্ফীতি: পূর্ববস্থা বনাম পরবর্তী রূপান্তর
চিত্র ১.৩: মহাজাগতিক স্ফীতির পূর্ব ও পরবর্তী রূপান্তর। কীভাবে ডি সিটার (de Sitter) সূচকীয় প্রসারণ ($a(t) \propto e^{Ht}$) কার্যকারণ ভারসাম্যে থাকা একটি অতি-ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম অঞ্চলকে মহাজাগতিক আকারে প্রসারিত করেছিল, যার ফলে স্থানিক বক্রতা সমতল হয়ে গিয়েছিল ($\Omega \to 1.000$) এবং দিগন্ত সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হয়েছিল।

মাত্র $10^{-36}$ থেকে $10^{-32}$ সেকেন্ডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময়ের মধ্যে মহাবিশ্ব সূচকীয় হারে প্রসারিত হয় ($a(t) \propto e^{Ht}$)। মহাবিশ্ব তার আদি আকারের চেয়ে কমপক্ষে $10^{26}$ গুণ (অন্য মতে $10^{78}$ গুণেরও বেশি) প্রসারিত হয়। এটি একটি প্রোটনের চেয়ে কোটি গুণ ছোট অঞ্চলকে এক লহমায় একটি মার্বেলের আকারে এবং পরবর্তীতে বর্তমান দৃশ্যমান মহাবিশ্বের চেয়েও বহু গুণ বিশাল আকারে রূপান্তরিত করে।

মহাজাগতিক ইনফ্ল্যাটন বিভব এবং মিথ্যা ভ্যাকুয়ামের সূচকীয় প্রসারণ
মহাজাগতিক ইনফ্ল্যাটন বিভব $V(\phi)$ ও মিথ্যা ভ্যাকুয়ামের সূচকীয় প্রসারণ ($10^{-36}\text{ s} \le t \le 10^{-32}\text{ s}$)। স্কেলার ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্র $\phi$ একটি সমতল সম্ভাব্যতা মালভূমির ওপর দিয়ে ধীর গতিতে গড়িয়ে পড়ে ($\epsilon, \eta \ll 1$), যা একটি মিথ্যা ভ্যাকুয়াম দশায় রূপ নেয়। এর অপরিবর্তনীয় শক্তি ঘনত্ব তীব্র ঋণাত্মক চাপ ($P = -\rho c^2$) সৃষ্টি করে মহাবিশ্বকে সূচকীয় হারে ($a(t) \propto e^{Ht}$) কমপক্ষে ৬০ $e$-ফোল্ড প্রসারিত করে।

মহাজাগতিক রোসেটা স্টোন: কোয়ান্টাম অস্থিরতা যেভাবে গ্যালাক্সিতে পরিণত হলো

মহাজাগতিক স্ফীতি শুধু দিগন্ত ও সমতলতা সমস্যার সমাধানই করেনি, এটি আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর রহস্যটিরও মীমাংসা করেছে: শূন্যস্থান থেকে গ্যালাক্সি ও নক্ষত্র কীভাবে সৃষ্টি হলো?

হাইসেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি ($\Delta E \Delta t \ge \frac{\hbar}{2}$) অনুসারে শূন্যস্থানের ভেতরেও শক্তির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম অস্থিরতা বা ফ্লাকচুয়েশন সতত ক্রিয়াশীল থাকে। স্ফীতি শুরু হওয়ার আগে এই অস্থিরতাগুলো ছিল অতিক্ষুদ্র পারমাণবিক স্কেলে। কিন্তু স্ফীতির প্রচণ্ড দ্রুত প্রসারণ এই কোয়ান্টাম তরঙ্গগুলোকে আলোর গতির চেয়েও দ্রুত মহাজাগতিক ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে টেনে নিয়ে যায়।

কোয়ান্টাম অস্থিরতা থেকে গ্যালাক্সির মহাজাগতিক জাল
চিত্র ১.৪: কোয়ান্টাম অস্থিরতা থেকে গ্যালাক্সির মহাজাগতিক জাল। চারটি সুনির্দিষ্ট রূপান্তর ধাপ: শূন্য-বিন্দু ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশন স্ফীতির সময় মহাজাগতিক ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করে প্রসারিত হয়, ক্লাসিক্যাল বক্রতার তরঙ্গে পরিণত হয়, সিএমবি-তে তাপমাত্রার ক্ষুদ্র তারতম্য ($\Delta T/T \sim 10^{-5}$) হিসেবে মুদ্রিত হয় এবং মহাকর্ষীয় পতনে গ্যালাক্সিতে রূপ নেয়।

যখন স্ফীতি থেমে যায়, তখন এই প্রসারিত তরঙ্গগুলো স্থান-কালের ঘনত্বে স্থায়ী ক্ষুদ্র ঢেউ হিসেবে জমে যায়। মহাবিশ্বের কিছু অংশ অন্য অংশের চেয়ে মাত্র ১ লাখ ভাগের এক ভাগ বেশি ঘন হয়ে পড়ে ($\Delta\rho/\rho \sim 10^{-5}$)। এই সামান্যতম অতিরিক্ত ঘন অঞ্চলগুলোই পরবর্তীতে মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আশেপাশের গ্যাস টেনে নিয়ে তৈরি করেছে মিল্কিওয়ে, অ্যান্ড্রোমিডা এবং কোটি কোটি গ্যালাক্সির মহাজাগতিক ওয়েব।

রিহিটিং: উত্তপ্ত বিগ ব্যাং-এর সূচনা

স্ফীতির সময় মহাবিশ্ব এত নাটকীয়ভাবে প্রসারিত হয়েছিল যে তার ভেতরের সমস্ত কণা পাতলা হয়ে গিয়েছিল এবং তাপমাত্রা পরম শূন্যের কাছাকাছি নেমে মহাবিশ্ব এক সম্পূর্ণ প্রাণহীন, বরফশীতল শূন্য মরুভূমিতে পরিণত হয়েছিল। তবে এই শূন্যতা ছিল ছদ্মবেশ মাত্র; কারণ সমস্ত শক্তি সঞ্চিত ছিল ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্রের অন্তর্নিহিত বিভব শক্তিতে।

রিহিটিং এবং মহাজাগতিক তাপীয় পুনর্জন্ম
চিত্র ১.৫: রিহিটিং এবং মহাজাগতিক তাপীয় পুনর্জন্ম। শক্তির রূপান্তরের গতিশীলতা: ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্র সম্ভাব্যতা ($V(\phi)$) বেয়ে নিচে নেমে আসে এবং সর্বনিম্ন বিন্দুতে প্রচণ্ড কম্পনের মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কোয়ার্ক, গ্লুয়ন ও লেপ্টন কণিকায় রূপান্তরিত হয় ($T_{\text{rh}} \sim 10^{27}\text{ K}$), যা মহাবিশ্বকে প্রচণ্ড উত্তপ্ত প্লাজমায় পূর্ণ করে।

যখন ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্রটি তার সম্ভাব্যতা কূপের সর্বনিম্ন বিন্দুতে নেমে আসে, তখন এটি প্রচণ্ড বেগে দোদুল্যমান হতে থাকে। এই কম্পন ইনফ্ল্যাটন ফিল্ডকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। ক্ষণিকের মধ্যে ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্রের সমগ্র শক্তি স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মৌলিক কণিকা—কোয়ার্ক, গ্লুয়ন, ইলেকট্রন, নিউট্রিনো এবং তাদের প্রতি-পদার্থে (Antimatter)—রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে পদার্থবিজ্ঞানে বলা হয় রিহিটিং (Reheating)।

মহাবিশ্বের তাপমাত্রা পুনরায় এক অভাবনীয় উচ্চতায় ($T_{\text{rh}} \sim 10^{27}\text{ K}$) লাফিয়ে ওঠে। এখান থেকেই শুরু হয় আমাদের পরিচিত সেই “উত্তপ্ত বিগ ব্যাং” (Hot Big Bang) এবং কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমার আদিম ফুটন্ত সমুদ্র।

আদিম রিহিটিং এবং আপেক্ষিক কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা
আদিম রিহিটিং এবং আপেক্ষিক কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা ($t \sim 10^{-32}\text{ s}$)। স্ফীতির সমাপ্তিলগ্নে ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্রের তীব্র কম্পন প্যারামেট্রিক রেজোন্যান্সের মাধ্যমে ভেঙে গিয়ে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কণিকাসমূহে রূপান্তরিত হয়। মহাবিশ্ব পুনর্বার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ($T_{\text{rh}} \sim 10^{27}\text{ K}$), যা মুক্ত কোয়ার্ক, গ্লুয়ন ও লেপ্টন কণিকার ফুটন্ত সমুদ্র—উত্তপ্ত বিগ ব্যাং-এর সূচনা করে।

কালানুক্রম: মহাজাগতিক উৎপত্তির প্রথম ভগ্নাংশ সেকেন্ড

যুগ ও কালপরিক্রমা সময়সীমা ($t$) তাপমাত্রা ($T$) মূল ভৌত রূপান্তর ও ঘটনাবলী
প্ল্যাঙ্ক কাল (Planck Epoch) $0$ থেকে $10^{-43}\text{ s}$ $> 10^{32}\text{ K}$ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি রাজত্ব; স্থান-কাল কোয়ান্টাম ফোম সদৃশ; চারটি মৌলিক বল একক সুপারফোর্স হিসেবে সংবদ্ধ।
গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন (GUT Epoch) $10^{-43}$ থেকে $10^{-36}\text{ s}$ $10^{32}$ থেকে $10^{27}\text{ K}$ সুপারফোর্স ভেঙে মহাকর্ষের পৃথকীকরণ; সবল, দুর্বল ও তড়িৎচুম্বকীয় বল ইলেকট্রোনিউক্লিয়ার বল হিসেবে অখণ্ড।
মহাজাগতিক স্ফীতি (Inflationary Epoch) $10^{-36}$ থেকে $10^{-32}\text{ s}$ তাপমাত্রা চরম হ্রাস পায় ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্রের ঋণাত্মক চাপে স্থান-কালের সূচকীয় সম্প্রসারণ ($10^{26}$ গুণ); সমতলতা ও দিগন্ত সমস্যার সমাধান।
পুনঃউত্তপ্তকরণ (Reheating) $10^{-32}$ থেকে $10^{-12}\text{ s}$ $10^{27}$ থেকে $10^{15}\text{ K}$ ইনফ্ল্যাটন ক্ষেত্রের ক্ষয়; কোয়ার্ক, লেপ্টন ও গেজ বোসনের জন্ম; উত্তপ্ত বিগ ব্যাং প্লাজমার সূচনা।
ইলেকট্রোউইক রূপান্তর (Electroweak Epoch) $10^{-12}\text{ s}$ (১ পিকোসেকেণ্ড) $\sim 10^{15}\text{ K}$ হিগস মেকানিজমের সক্রিয়করণ; দুর্বল বল ও তড়িৎচুম্বকীয় বলের চূড়ান্ত পৃথকীকরণ; মৌলিক কণিকাসমূহের ভর লাভ।

দার্শনিক উপসংহার: শূন্য থেকে মহাবিশ্ব?

আমরা যখন রাতের আকাশের পানে তাকাই, তখন আমরা কেবল দূর নক্ষত্রের আলো দেখি না; আমরা তাকিয়ে থাকি সেই আদিম কোয়ান্টাম বীজের দিকে, যা আজ থেকে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে স্থান-কালের শূন্যতায় অঙ্কুরিত হয়েছিল। কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব আমাদের শিক্ষা দেয় যে “পরম শূন্য” বা নাথিংনেস (Absolute Nothingness) বলে কোনো স্থির অবস্থার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। কোয়ান্টাম অস্থিরতা নিজেই শূন্যতার বুক থেকে সৃষ্টির আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

মহাকালের প্রথম পিকোসেকেণ্ডের এই অতি-পারমাণবিক নৃত্যই নির্ধারণ করে দিয়েছিল ভবিষ্যতের প্রতিটি গ্যালাক্সির সীমানা, প্রতিটি নক্ষত্রের পারমাণবিক চুল্লি, এবং কোটি কোটি বছর পর পৃথিবীর সমুদ্রতটে জন্ম নিতে যাওয়া জীবনের রাসায়নিক ব্যাকরণ। আমরা সেই একই আদিম মহাজাগতিক আগুনের উত্তরসূরি—যে আগুন ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে জ্বলে উঠেছিল সময়ের সূচনালগ্নে।


প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যসূত্র ও মৌলিক গ্রন্থপঞ্জি

  1. Guth, A. H. (1981). Inflationary universe: A possible solution to the horizon and flatness problems. Physical Review D, 23(2), 347–356. doi:10.1103/PhysRevD.23.347
  2. Linde, A. (1982). A new inflationary universe scenario: A possible solution of the horizon, flatness, homogeneity, isotropy and primordial monopole problems. Physics Letters B, 108(6), 389–393. doi:10.1016/0370-2693(82)91219-9
  3. Mukhanov, V. F., & Chibisov, G. V. (1981). Quantum fluctuations and a nonsingular universe. JETP Letters, 33(10), 532–535.
  4. Planck Collaboration. (2020). Planck 2018 results. VI. Cosmological parameters. Astronomy & Astrophysics, 641, A6. doi:10.1051/0004-6361/201833910
  5. Weinberg, S. (2008). Cosmology. Oxford University Press. ISBN:978-0198526827.