আধুনিক ইরাকের বুক চিরে বয়ে চলা টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর উর্বর পলিমাটিতে মানব ইতিহাস পদার্পণ করে তার দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বৈপ্লবিক অধ্যায়ে: নাগরিক বিপ্লব। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে প্রাচীন সুমের (Sumer) ভূমিতে মানুষ প্রথমবারের মতো স্থায়ী বিশালাকার নগর-রাষ্ট্রে একত্রিত হয়। এরিদু, উরুক এবং উর নগরে আমাদের পূর্বপুরুষরা উদ্ভাবন করেছিল সুবিশাল জিকুরাত মন্দির, সিলিন্ডার সিলমোহর, সেচ ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক আইন এবং সর্বোপরি সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী বৌদ্ধিক প্রযুক্তি: কিউনিফর্ম (Cuneiform) লিপি।

মেসোপটেমিয়ার পলল সমভূমির পরিবেশগত ইঞ্জিন

সুমের অঞ্চলে কোনো প্রাকৃতিক পাথর ছিল না, ছিল না উন্নত কাঠ বা ধাতুর খনি। এর সমস্ত সমৃদ্ধি নির্ভর করত একটি অসাধারণ প্রাকৃতিক শক্তির ওপর: টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের হিমালয় থেকে বয়ে আনা উর্বর পলি এবং মরুভূমির প্রখর রোদ। কিন্তু বসন্তকালে নদী দুটির বিধ্বংসী বন্যা এবং গ্রীষ্মের খরা ছিল একক পরিবারের পক্ষে অপ্রতিরোধ্য। বেঁচে থাকার তাগিদে প্রয়োজন হলো যৌথ সামাজিক সংগঠন।

মন্দিরের পুরোহিতদের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ শত শত মাইল দীর্ঘ সেচ খাল খনন করে, মাটির বাঁধ নির্মাণ করে এবং শস্যের কেন্দ্রীয় গুদাম গড়ে তোলে। এই সম্মিলিত শ্রমের ফল ছিল অবিশ্বাস্য: প্রতি একর জমিতে বার্লি ও গমের ফলন ছিল ৩০ থেকে ৪০ গুণ। এই খাদ্য উদ্বৃত্তই জন্ম দেয় বিশ্বের প্রথম মহানগরীগুলোর, যেখানে একেকটি শহরে বসবাস করত প্রায় ৫০,০০০ নাগরিক।

উরুক সাম্রাজ্য ও লেখার বৈপ্লবিক উদ্ভাবন

খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০০ অব্দ নাগাদ উরুক (Uruk) নগরী ২৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল, যা ছিল কিংবদন্তির রাজা গিলগামেশের ছয় মাইল দীর্ঘ ইটের প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত। শহরের কেন্দ্রস্থলে ছিল প্রেমের দেবী ইনান্নার প্রতি উৎসর্গীকৃত ইয়ান্না জেলা। এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মানুষের জৈবিক স্মৃতির সীমা ভেঙে পড়ে।

হাজার হাজার মন বার্লি, ভেড়ার পাল, তিলের তেল এবং হাজারো শ্রমিকের মজুরির হিসাব মুখে মুখে রাখা পুরোহিতদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। লেখার এই বিকাশ ঘটেছে চারটি ঐতিহাসিক ধাপে:

  1. মাটির টোকেন (খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০–৩৫০০): বিভিন্ন আকৃতির পোড়ামাটির প্রতীক (শস্যের জন্য শঙ্কু, পশুর জন্য গোলক), যা বুলা নামের মাটির খামে রাখা হতো।
  2. চিহ্নিত ফলক (খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০০): খামের ভেতরের টোকেন দেখার ঝামেলা এড়াতে নরম মাটির বাইরের গায়ে টোকেনটি চেপে ছাপ দেওয়া হতো।
  3. প্রোটো-কিউনিফর্ম চিত্রলিপি (খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০): নলখাগড়ার কলম দিয়ে নরম মাটির ফলকে সরাসরি বস্তুর ছবি (গরুর মাথা, ধানের শিষ, মদের কলস) আঁকা শুরু হয়।
  4. ধ্বনিভিত্তিক কিউনিফর্ম (খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০): নলখাগড়া কোণাকুণি কেটে কিলক বা পেরেকের মতো (Wedge-shaped) ত্রিভুজাকার ছাপ দিয়ে শব্দের ধ্বনি বা সিলেবল প্রকাশ করা হয়। হিসাবের খাতা থেকে লেখা রূপান্তরিত হয় অমর কাব্য, মহাকাব্য ও আইনি বিধানে।

মন্দির, জিকুরাত ও প্রাসাদের সমাজ কাঠামো

সুমেরীয় নগর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জিকুরাত (Ziggurat)—ধাপে ধাপে ওপরে ওঠা এক কৃত্রিম মাটির পর্বত, যা আকাশ ও মাটিকে সংযুক্ত করত। খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ অব্দে রাজা উর-নাম্মুর নির্মিত উরের মহান জিকুরাত চাঁদের দেবতা নান্না-র উপাসনালয় হিসেবে তিন স্তরে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল।

পানি ও জমির দখল নিয়ে বিভিন্ন নগরের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পুরোহিতদের পাশাপাশি আবির্ভূত হয় সামরিক নেতা বা লুগাল (“মহান ব্যক্তি”), যারা প্রাসাদে বাস করত। সুমেরীয় সমাজ বিভক্ত ছিল কঠোর স্তরবিন্যাসে: শীর্ষে রাজা ও প্রধান পুরোহিত, মাঝে লিপিকার, ব্যবসায়ী ও কারিগর এবং সর্বনিম্নে কৃষক ও ক্রীতদাস।

আইন ও নীতি: হাম্মুরাবির অমর অনুশাসন

খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতকে ব্যাবিলনের মহান রাজা হাম্মুরাবি (খ্রিস্টপূর্ব ১৭৯২–১৭৫০) সমগ্র মেসোপটেমিয়াকে এক কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন। সাম্রাজ্যে ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সাত ফুট উঁচু কালো ব্যাসল্ট পাথরের ফলকে খোদাই করেন ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত সংবিধান: হাম্মুরাবির আইনবিধি (Code of Hammurabi)।

ফলকের শীর্ষে সূর্যের দেবতা শামাশের কাছ থেকে রাজা হাম্মুরাবির রাজদণ্ড গ্রহণের দৃশ্য খোদাই করা আছে। এর নিচে ২৮২টি ধারায় সম্পত্তি, বিবাহ, বাণিজ্য, চিকিৎসকদের দায়িত্ব এবং অপরাধের দণ্ড লিপিবদ্ধ রয়েছে। এটি ছিল প্রতিশোধমূলক ন্যায়বিচারের (Lex Talionis) প্রথম আইনি রূপ:

[text{Harm}(A to B) implies text{Penalty}(B to A) quad text{[“চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত”]}]

ইরাকের পললভূমি থেকেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক নগর জীবনের ভিত্তি: লিখিত আইন, প্রাতিষ্ঠানিক কর, ৬০ মিনিটে এক ঘণ্টা ও ৩৬০ ডিগ্রিতে বৃত্তের গাণিতিক ধারণা এবং প্রথম লিখিত সাহিত্য। সুমেরেই মানুষ শিখেছিল কীভাবে নরম কাদামাটির ফলকে নিজের সভ্যতার অমর ইতিহাস খোদাই করতে হয়।