জাগ্রোস পর্বতমালা থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত রুক্ষ ও বিশাল মালভূমিতে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম আন্তঃমহাদেশীয় সাম্রাজ্য: হাখমানেশি পারস্য সাম্রাজ্য (Achaemenid Persian Empire)। দূরদর্শী সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিভা মহান সাইরাস (Cyrus the Great)-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এই সাম্রাজ্য তার স্বর্ণযুগে পৃথিবীর প্রায় চুয়াল্লিশ শতাংশ মানব জনগোষ্ঠীকে একক শাসনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। আসিরীয় সন্ত্রাস ও নির্বাসনের যুগে পারস্য বিশ্বকে উপহার দিয়েছিল সাংস্কৃতিক সহনশীলতা, প্রাদেশিক সাত্রাপ (Satrapy) শাসনব্যবস্থা, আন্তঃমহাদেশীয় রয়্যাল রোড এবং জরথুস্ত্রীয় ধর্মের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক আলোকিত সাম্রাজ্য কাঠামো।
মহান সাইরাস এবং সহনশীলতার নতুন যুগ
সাইরাসের আগমনের পূর্বে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যজয়ের অর্থ ছিল চরম নৃশংসতা: পরাজিত জাতির চামড়া তুলে নেওয়া, চোখ উপড়ে ফেলা, মন্দির ধূলিসাৎ করা এবং সমগ্র জনগোষ্ঠীকে বন্দি করে নির্বাসনে পাঠানো। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ অব্দে ক্ষমতায় এসে সাইরাস মিডিয়ান ও লিডিয়ার ধনকুবের রাজা ক্রয়েসাসকে পরাজিত করে খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দে বিনা রক্তপাতে বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত মহানগরী ব্যাবিলন জয় করেন।
ব্যাবিলনে প্রবেশ করে সাইরাস কোনো হত্যাকাণ্ড বা লুটপাটের অনুমতি দেননি। তিনি স্থানীয় প্রধান দেবতা মারদুকের পূজা করেন এবং নরম মাটির একটি নলাকার ফলকে আক্কাদীয় কিউনিফর্ম লিপিতে জারি করেন ইতিহাসের প্রথম মানবাধিকার সনদ: সাইরাস সিলিন্ডার (Cyrus Cylinder)। এই সনদে তিনি ঘোষণা করেন:
- সাম্রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত উপাসনালয়গুলো পুনর্নির্মাণের নির্দেশ।
- জোরপূর্বক বাধ্যতামূলক শ্রম ও নিপীড়নমূলক দাসত্বের বিলোপ।
- ব্যাবিলনীয়দের দ্বারা বন্দি ও নির্বাসিত সমস্ত জাতিকে তাদের নিজ নিজ পিতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি—যার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটেছিল ইহুদি জাতির দীর্ঘ সত্তর বছরের ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের (Babylonian Exile)। সাইরাস নিজ খরচে ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের দ্বিতীয় মন্দির পুনর্নির্মাণ করে দেন, যার কারণে হিব্রু বাইবেলে একমাত্র অ-ইহুদি শাসক হিসেবে সাইরাসকে ‘ঈশ্বরের অভিষিক্ত’ (মেসায়া) আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
“আমি যখন শান্তিময় পদক্ষেপে ব্যাবিলনে প্রবেশ করলাম, আনন্দ ও উল্লাসের সাথে রাজপ্রাসাদে সিংহাসন স্থাপন করলাম… আমি সমস্ত ক্রীতদাসকে মুক্তি দিলাম; আমি তাদের দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটালাম এবং তাদের দুর্দশা লাঘব করলাম।”
— মহান সাইরাস, সাইরাস সিলিন্ডারের শিলালিপি, খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দ
প্রথম দারিয়ুস এবং সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক যন্ত্র
সাইরাস যদি হন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, তবে প্রথম দারিয়ুস (Darius the Great, খ্রিস্টপূর্ব ৫২২–৪৮৬) ছিলেন এর প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাতা ও শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী। সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি কারমানশাহর পর্বতগাত্রে খোদাই করেন তিন ভাষার সুবিশাল বেহিস্তুন শিলালিপি।
দারিয়ুস সুবিশাল সাম্রাজ্যকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য কয়েকটি বিপ্লবী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন:
- সাত্রাপি ব্যবস্থা: সমগ্র সাম্রাজ্যকে কুড়িটি প্রদেশে বা সাত্রাপিতে বিভক্ত করা হয়, যার প্রধান ছিলেন সাত্রাপ বা প্রাদেশিক গভর্নর। বিদ্রোহ ঠেকাতে বেসামরিক শাসন ও সামরিক বাহিনীকে আলাদা রাখা হতো এবং সম্রাট নিয়মিত তার গোপন পরিদর্শক দল পাঠাতেন, যাদের বলা হতো “সম্রাটের চোখ ও কান”।
- দ্য রয়্যাল রোড (The Royal Road): দারিয়ুস পারস্য উপসাগরের সুসা থেকে এজিয়ান সাগরের উপকূলীয় সারদিস পর্যন্ত প্রায় ২,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা মহাসড়ক নির্মাণ করেন। প্রতি দিনের দূরত্বে ১১১টি ডাকচৌকি বা চাপার খানেহ তৈরি করা হয়, যেখানে সর্বদা প্রস্তুত থাকত তাজা ঘোড়া ও রাজকীয় দূত। ফলে সাধারণ যাত্রায় যেখানে তিন মাস লাগত, রাজকীয় বার্তা পৌঁছাতে সেখানে সময় লাগত মাত্র সাত দিন। ঐতিহাসিক হেরোডোটাস মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন: “তুষার, বৃষ্টি, উত্তাপ কিংবা রাতের অন্ধকার—কোনো কিছুই এই রাজকীয় দূতদের তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে থামাতে পারে না।”
- স্বর্ণের দারিক মুদ্রা: দারিয়ুস চালু করেন ৯৫.৮% বিশুদ্ধ সোনার দারিক এবং রুপার সিগলোস মুদ্রা—যা ভূমধ্যসাগর থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত একক মুদ্রামান প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব বাণিজ্যের এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটায়।
পারসেপোলিস: নওরোজের মহাজাগতিক প্রাঙ্গণ
ফার্স প্রদেশের বুকে দারিয়ুস প্রতিষ্ঠা করেন নতুন রাজধানী পারসেপোলিস (Persepolis), যা পারস্যে পরিচিত ছিল পারসা নামে। ১,২৫,০০০ বর্গমিটারের বিশালাকার পাথুরে মঞ্চের ওপর নির্মিত এই নগরী কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না; এটি ছিল মূলত বসন্তের আগমনী ও পারস্যের নববর্ষ নওরোজ (Nowruz) উদযাপনের জন্য তৈরি এক মহাজাগতিক উপাসনালয়।
ডানাওয়ালা ষাঁড়ের কোলসি দিয়ে সুরক্ষিত ‘গেট অব অল নেশনস’ পার হয়ে প্রবেশ করতে হতো সুবিশাল আপাদানা (Apadana) হলে, যার ছাদ ধরে রেখেছিল কুড়ি মিটার উঁচু বাহাত্তরটি খোদাই করা মার্বেল স্তম্ভ। এর সিঁড়ির গায়ে খোদাই করা আছে বিখ্যাত করদ শোভাযাত্রার ভাস্কর্য: যেখানে পারস্য সাম্রাজ্যের ২৩টি ভিন্ন জাতির প্রতিনিধিরা—গ্রিক, মিশরীয়, ব্যাবিলনীয়, ভারতীয় ও ইথিওপীয়রা—নিজ নিজ জাতীয় পোশাকে কোনো অপমান বা শৃঙ্খল ছাড়াই শান্তিময় ভঙ্গিতে সারিবদ্ধভাবে সম্রাটের জন্য নিজ ভূমির উপহার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
জরথুস্ত্রীয় ধর্ম: আলো ও অন্ধকারের মহাজাগতিক সংগ্রাম
পারস্য সাম্রাজ্যের নৈতিক ভিত্তি ছিল পয়গম্বর জরথুস্ত্রের (Zoroaster) প্রচারিত ধর্ম। জরথুস্ত্রীয় ধর্ম ছিল এক নৈতিক দ্বৈতবাদী বিশ্বাস—যেখানে মহাবিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে সত্য ও আলোর দেবতা আহুরা মাজদা এবং অন্ধকার, বিশৃঙ্খলা ও মিথ্যার অপশক্তি আংরা মাইন্যু (আহরিমান)-এর মধ্যকার অনন্ত যুদ্ধের মাধ্যমে।
প্রতিটি মানুষকে এই যুদ্ধে আলোর পক্ষে অংশ নিতে হতো তিনটি সোনালী নীতির মাধ্যমে: হুমাতা, হুখ্যা, হুভর্শতা (সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম)। পারস্যের সম্রাটরা নিজেদের দেবতা দাবি করতেন না; তারা ছিলেন পৃথিবীতে আহুরা মাজদার প্রতিনিধি, যাদের পবিত্র দায়িত্ব ছিল সত্যের (আর্তা) প্রতিষ্ঠা এবং মিথ্যার (দ্রাউগা) বিনাশ করা।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ অব্দে মহাবীর আলেকজান্ডারের হাতে পারসেপোলিসের সিডার কাঠের ছাদ ভস্মীভূত হলেও পারস্যের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা মানব ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে। তাদের প্রাদেশিক শাসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পরবর্তী রোমান সাম্রাজ্যের মডেল হিসেবে কাজ করেছিল এবং তাদের সহনশীলতার আদর্শ আজও বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।