একটি সুসংহত রাজনৈতিক ভূখণ্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশের বহু পূর্বেই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পলিগঠিত বদ্বীপ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল প্রাগৈতিহাসিক মানববসতির এক অনন্য পদচিহ্ন। পলল সঞ্চয়ন ও নদ-নদীর অবিরাম পথবদলের ভেতর দিয়ে প্রাচীন বাংলা কোনো বিচ্ছিন্ন পশ্চাদপদ জনপদ ছিল না। গ্রিক ও রোমান ঐতিহাসিকদের বিবরণে পাওয়া যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে মহামতি আলেকজান্ডার যখন পাঞ্জাবের বিপাশা (হাইফ্যাসিস) নদীর তীরে উপস্থিত হন, তখন তাঁর বিশ্বজয়ী ম্যাসেডোনীয় সৈন্যবাহিনী পূর্বের এক অপরাজেয় সামরিক শক্তির কথা শুনে বিদ্রোহ ঘোষণা করে—সেই পরাক্রমশালী শক্তি ছিল ‘গঙ্গারিডাই’ (Gangaridai), যারা গঙ্গার মোহনায় চার সহস্র যুদ্ধহস্তীর সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে পাহারারত ছিল।

১. ভূতাত্ত্বিক গঠন ও প্রাগৈতিহাসিক শিকড়

বাংলার ঐতিহাসিক বিবর্তন তার অনন্য বদ্বীপ প্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পদ্মা (গঙ্গা), যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) এবং মেঘনা—এই তিন সুবিশাল নদীপ্রণালীর পললধারায় গড়ে ওঠা বেঙ্গল বেসিন পৃথিবীর বৃহত্তম সক্রিয় বদ্বীপ। এই নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি মূলত প্রাচীন প্লাইস্টোসিন বরেন্দ্রভূমি ও মধুপুর গড় এবং নবীন উর্বর পলিমাটির প্লাবনভূমিতে বিভক্ত।

পশ্চিমবঙ্গের সুসুনিয়া পাহাড় ও দেওজালি হাডিং এবং বাংলাদেশের লালমাই-ময়নামতি ও সীতাকুণ্ড পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাপ্ত জীবাশ্ম-কাঠের তৈরি প্রাচীন প্রত্নপ্রস্তর ও নব্যপ্রস্তর যুগের কুঠার, বাটালি এবং চাঁচনি প্রমাণ করে যে হাজার হাজার বছর পূর্বেই এই বঙ্গীয় বদ্বীপে শিকারী ও প্রাথমিক কৃষিভিত্তিক মানবগোষ্ঠী সাফল্যের সাথে জীবনধারণ করত।

২. প্রাচীন জনপদ: আঞ্চলিক পরিচয়ের সূচনা

বৈদিক সাহিত্যে বাংলাকে আর্যাবর্তের মূল ভূখণ্ডের বাইরের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অঞ্চল হিসেবে দেখা হতো। ঐতরেয় আরণ্যক-এ ‘বঙ্গ’ ও ‘মগধ’ অঞ্চলের অধিবাসীদের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা বিকাশের সাথে সাথে প্রাচীন বাংলা কতগুলো স্বাধীন জনপদে বিভক্ত হয়ে পড়ে:

  • বঙ্গ: মধ্য, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় প্লাবনভূমি (বর্তমান ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল ও খুলনা)। নৌচালনা, নদীমাতৃক বাণিজ্য ও সমুদ্রযাত্রায় পারদর্শী হিসেবে এই জনপদের খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া।
  • পুণ্ড্র (পুণ্ড্রবর্ধন): উত্তরবঙ্গ (বগুড়া, দিনাজপুর, রাজশাহী)। পুণ্ড্রনগর (মহাস্থানগড়) ছিল এর সমৃদ্ধ রাজধানী দুর্গনগরী। কৃষিজ প্রাচুর্য ও নগর সভ্যতায় এটি ছিল অগ্রগণ্য।
  • গৌড়: ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী এলাকা (মুর্শিদাবাদ, মালদা, বীরভূম)। মধ্যযুগে সমগ্র বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এই গৌড়।
  • রাঢ়: ভাগীরথী নদীর পশ্চিমের পাহাড়ি ও রুক্ষ ভূখণ্ড। জৈনদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আচারাঙ্গ সূত্র-এ উল্লেখ রয়েছে তীর্থঙ্কর মহাবীরের রাঢ় অঞ্চলে ধর্মপ্রচারের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা।
  • সমতট ও হরিকেল: মেঘনা নদীর পূর্ব তীরের উপকূলীয় অঞ্চল (কুমিল্লা, নোয়াখালী) এবং হরিকেল (সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল), যা প্রাচীনকাল থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সামুদ্রিক বাণিজ্যে যুক্ত ছিল।

৩. কিংবদন্তি গঙ্গারিডাই ও আলেকজান্ডারের প্রত্যাবর্তন

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে ঝিলামের যুদ্ধে রাজা পুরুকে পরাজিত করার পর মহামতি আলেকজান্ডার গঙ্গা অববাহিকার দিকে অগ্রসর হতে উদ্যত হন। কিন্তু বিপাশা নদীর তীরে এসে তাঁর অপরাজেয় সেনাবাহিনী আর এক পা-ও সামনে বাড়াতে অস্বীকৃতি জানায়। সৈন্যদের এই বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল পূর্বের মহাশক্তিধর গঙ্গারিডাই (Gangaridai / গঙ্গার রাষ্ট্র) সাম্রাজ্যের যুদ্ধপ্রস্তুতির খবর।

গ্রিক ও রোমান ঐতিহাসিক ডিওডোরাস সিকুলাস, কুইন্টাস কার্টিয়াস রুফাস এবং প্লুটার্ক তাঁদের গ্রন্থে এই ঘটনা বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন:

“আলেকজান্ডার যখন নদী পার হওয়ার বিষয়ে অনুসন্ধান করলেন, তখন তাঁকে জানানো হলো যে নদীর ওপারে এক বিশাল সাম্রাজ্য রয়েছে, যার নাম গঙ্গারিডাই ও প্রাসিই। তাদের রাজা এক সুবিশাল বাহিনী নিয়ে অপেক্ষারত—যার মধ্যে রয়েছে বিশ হাজার অশ্বারোহী, দুই লক্ষ পদাতিক, দুই হাজার রথ এবং চার হাজার বর্মাবৃত রণহস্তী।”
— ডিওডোরাস সিকুলাস, বিবলিওথেকা হিস্টোরিকা

প্রাচীন নদীমাতৃক ভূখণ্ডে চার সহস্র রণহস্তী ছিল এক চলন্ত দুর্গ এবং আধুনিক কামানের মতো ধ্বংসাত্মক। ম্যাসেডোনিয়ার সেনারা বুঝতে পেরেছিল, এই জলাভূমি ও নদীময় বদ্বীপে এই গজবাহিনীর মুখোমুখি হওয়া আত্মহত্যার শামিল। বাধ্য হয়ে আলেকজান্ডার বারোটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে সিন্ধু নদীর পথ ধরে স্বদেশের উদ্দেশ্যে ফিরে যান।

৪. উয়ারী-বটেশ্বরের নগর বিস্ময়

দীর্ঘদিন ধরে ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকরা দাবি করতেন যে প্রাচীন বাংলায় নিজস্ব কোনো প্রাচীন নগর সভ্যতা ছিল না। নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় অবস্থিত উয়ারী-বটেশ্বর-এর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এই ঔপনিবেশিক ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত খননকার্যে জানা গেছে যে খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ-৩য় শতকে ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন অববাহিকায় উয়ারী-বটেশ্বর ছিল এক সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক নদী ও সমুদ্রবন্দর দুর্গনগরী:

  • ছাঁচে-ঢালা ও ছাপযুক্ত রৌপ্যমুদ্রা: হাজার হাজার রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে যা উন্নত অর্থনৈতিক লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় মুদ্রাব্যবস্থার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
  • রুলেটেড মৃৎপাত্র ও পোড়ামাটির সিলমোহর: যা ভূমধ্যসাগরীয় রোমান সাম্রাজ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক বাণিজ্যের সাথে সরাসরি সংযুক্ত ছিল।
  • মূল্যবান পাথরের পুঁতি ও বাল্টিক অ্যাম্বার: কোয়ার্টজ, কার্নেলিয়ান ও এগেটের তৈরি ৪০ হাজারেরও বেশি পুঁতি এবং সুদূর বাল্টিক সাগর থেকে আসা অ্যাম্বার প্রমাণ করে যে প্রাচীন বাংলা ছিল প্রাচীন সমুদ্র-সিল্ক রোডের অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র।
  • পরিখাবেষ্টিত নগর প্রাচীর: মাটির প্রাচীর ও গভীর পরিখা দ্বারা সুরক্ষিত এই নগরীতে মিলেছে উন্নত লোহার কামারশালা ও বসবাসের পাকা মাটির ঘর।

দ্বিতীয় শতকে গ্রিক ভূগোলবিদ ক্লডিয়াস টলেমির মানচিত্রে উল্লেখিত বিখ্যাত নদীবন্দর সোনাগৌরা (Sounagoura)-ই আজকের এই উয়ারী-বটেশ্বর বলে আন্তর্জাতিক গবেষকরা মনে করেন। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, আড়াই হাজার বছর আগেই বাংলার মাটি ছিল এক উন্নত বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • মজুমদার, রমেশচন্দ্র (১৯৪৩)। হিস্ট্রি অব বেঙ্গল: ১ম খণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
  • রহমান, সুফি মোস্তাফিজুর (২০০৭)। উয়ারী-বটেশ্বর: ইন সার্চ অব আর্লি হিস্টোরিক আরবানাইজেশন। আইসিএসবিএ।
  • চক্রবর্তী, দিলীপ কুমার (২০০১)। আর্কিওলজিক্যাল জিওগ্রাফি অব দ্য গঙ্গা প্লেন। পার্মানেন্ট ব্ল্যাক।
  • ম্যাকক্রিন্ডল, জে. ডব্লিউ. (১৮৭৭)। অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া অ্যাজ ডেসক্রাইবড বাই মেগাস্থিনিস অ্যান্ড অ্যারিয়ান। ট্রুবনার।