বিংশ শতাব্দী ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী, নাটকীয় এবং প্রযুক্তিগতভাবে অভাবনীয় রূপান্তরের এক কালখণ্ড। ১৯১৪ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে মানবজাতি প্রত্যক্ষ করেছিল দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা, হলোকস্টের নারকীয় গণহত্যা, পারমাণবিক বোমার ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের পতন। মতাদর্শিক শীতল যুদ্ধের (Cold War) যুগে পারমাণবিক ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানুষ অর্জন করেছিল বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্য—মহাকর্ষের বাঁধন ছিন্ন করে মহাকাশে মানুষের প্রথম পদার্পণ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের পতন (১৯১৪–১৯১৮)
১৯১৪ সালের আগস্টে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আত্মঘাতী সংঘাত রূপ নেয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। যেসব প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার কথা ছিল, তা রূপ নেয় সংহারক অস্ত্রে:
- ট্রেঞ্চ যুদ্ধ: উত্তর সাগরের তীর থেকে সুইজারল্যান্ড পর্যন্ত হাজার হাজার মাইল কর্দমাক্ত পরিখায় লাখ লাখ তরুণ মাসের পর মাস আটকে থাকে।
- যান্ত্রিক সমরাস্ত্র: ম্যাক্সিম মেশিনগান, বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস, ভারী কামান এবং সাঁজায়া ট্যাঙ্কের আবির্ভাবে ব্যক্তিগত শৌর্যবীর্যের যুগ শেষ হয়ে সূচনা হয় কারখানানির্ভর গণ-হত্যার।
- ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যের পতন: এই যুদ্ধের আগুনে রাশিয়ার রোমানভ সাম্রাজ্য (যা ১৯১৭ সালে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লব ঘটায়), জার্মানির হোহেনজোলার্ন, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির হাবসবার্গ এবং অটোমান সাম্রাজ্য চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির অপমান এবং ১৯২৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার (Great Depression) সুযোগে জন্ম নেয় চরমপন্থী ফ্যাসিবাদ—ইতালিতে মুসোলিনি এবং জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের উত্থান ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকস্টের বিভীষিকা (১৯৩৯–১৯৪৫)
ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিণত হয় ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধে, যাতে সাত থেকে সাড়ে আট কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। নাৎসি জার্মানি ব্লিটজক্রিগ (বিদ্যুৎগতির আক্রমণ) চালিয়ে সমগ্র ইউরোপ দখল করে নেয়।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় ছিল হলোকস্ট—যেখানে নাৎসিরা সুপরিকল্পিতভাবে রেল যোগাযোগ ও জাইক্লন-বি গ্যাসের চেম্বার ব্যবহার করে ৬০ লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদি এবং লাখ লাখ রোমা ও যুদ্ধবন্দিকে নির্বিচারে হত্যা করে।
১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা পারমাণবিক বোমার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। এর মাধ্যমে মানবজাতি এমন এক ভয়াবহ যুগে প্রবেশ করে যেখানে এক মুহূর্তের বোতাম টেপায় সমগ্র পৃথিবীকে একাধিকবার ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব:
উপনিবেশমুক্তি ও বৈশ্বিক দক্ষিণের জাগরণ
বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জন্ম নেয় এশিয়া ও আফ্রিকার শত শত বছরের পরাধীন মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রাম—উপনিবেশমুক্তির যুগ:
- দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীনতা (১৯৪৭ ও ১৯৭১): মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের ত্যাগের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে দীর্ঘ শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
- এশিয়া ও আফ্রিকার মুক্তি: ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে গণচীনের বিপ্লব ঘটে; আলজেরিয়া, কেনিয়া, ভিয়েতনাম ও অ্যাঙ্গোলায় রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ফরাসি, ব্রিটিশ ও পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
- জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM): ১৯৫৫ সালে বান্দুং সম্মেলনের মাধ্যমে নবজাত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ঘোষণা করে যে তারা কোনো পরাশক্তির সামরিক ক্রীড়নক হবে না।
শীতল যুদ্ধ ও মহাকাশ জয়ের রোমাঞ্চ (১৯৪৭–১৯৯১)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবী বিভক্ত হয়ে পড়ে মার্কিন ধনতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এবং সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বমুখর শীতল যুদ্ধে। উভয় পক্ষের পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার ‘পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের’ (MAD) নিশ্চয়তা প্রদান করায় তারা সরাসরি যুদ্ধ না করে কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
তবে এই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি উজ্জ্বল দিক ছিল মহাকাশ অভিযান। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে পাঠায় প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক; ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানব হিসেবে মহাকাশ প্রদক্ষিণ করেন। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে অ্যাপোলো-১১ অভিযানে চাঁদের বুকে প্রথম পা রেখে মার্কিন নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং বলেন: “একজন মানুষের জন্য এ এক ছোট্ট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিরাট উল্লম্ফন।”
চাঁদের কক্ষপথ থেকে তোলা পৃথিবীর নীল মার্বেলের মতো একক ও সীমানাহীন ছবি মানুষের চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে বিংশ শতাব্দীর সমাপ্তি ঘটে—যে শতাব্দী মানবজাতিকে শিখিয়েছে যে আত্মধ্বংস এড়াতে আন্তর্জাতিক ঐক্য ও জাতিসংঘ সনদের মানবাধিকার নীতি অনুসরণই বেঁচে থাকার একমাত্র পথ।