অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মাৎস্যায়মের শতবর্ষব্যাপী নৈরাজ্য ও গৃহযুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে বাংলার সামন্ত ও সাধারণ জনগণ এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঐক্যের স্বাক্ষর রাখে। তারা একমত হয়ে গোপাল নামক এক সুযোগ্য সামরিক নেতাকে সিংহাসনে বসায়। এই যুগান্তকারী নির্বাচনের মাধ্যমে সূচিত হয় গৌরবময় পাল সাম্রাজ্য (আনু. ৭৫০–১১৬১ খ্রি.)। প্রায় চারশত বছরব্যাপী এই বৌদ্ধ সাম্রাজ্য বাংলাকে উত্তর ভারতের এক মহাশক্তিতে পরিণত করে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ জ্ঞানপীঠ সোমপুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করে, তিব্বতে অতীশ দীপঙ্করের ঐতিহাসিক ধর্মপ্রচার ঘটায় এবং চর্যাপদ-এর সাধকদের অমর চরণের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার জন্ম দেয়।
১. গোপালের নির্বাচন ও খালিমপুর তাম্রশাসন
আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম গোপালের সিংহাসন আরোহণের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে তাঁর সুযোগ্য পুত্র সম্রাট ধর্মপালের ৩২তম রাজ্যাঙ্কে উৎকীর্ণ বিখ্যাত খালিমপুর তাম্রশাসন-এ। প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঐতিহাসিক দলিল:
“মাৎস্যায়ং অপোহিতুং প্রকৃতিভির্লক্ষ্ম্যাঃ করং গ্রাহিতঃ শ্রী গোপাল ইতি ক্ষিতীশ-শিরোমণিঃ…”
(“মাৎস্যায়মের অরাজকতা দূর করার জন্য প্রকৃতিপুঞ্জ (জনগণ ও সামন্তরা) যাকে রাজলক্ষ্মীর কর গ্রহণ করিয়েছিল—সেই নরপতিগণের শিরোমণি গোপাল থেকে এক অনুপম গুণরাশির জন্ম হয়…”)
— খালিমপুর তাম্রশাসন (আনু. ৭৮৫ খ্রি.)
এই ঐতিহাসিক শ্লোকটি প্রমাণ করে যে গোপাল কোনো বহিরাগত বিজেতা ছিলেন না; মাৎস্যায়মের অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে বাংলার সর্বস্তরের জনগণ সম্মিলিতভাবে তাঁকে নির্বাচিত করেছিল। গোপাল দ্রুত বরেন্দ্র, গৌড় ও বঙ্গ অঞ্চলকে একত্রিত করে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।
২. সাম্রাজ্যের স্বর্ণশিখরে: ধর্মপাল ও দেবপাল
গোপালের পুত্র ধর্মপাল (শাসনকাল আনু. ৭৭০–৮১০ খ্রি.) বাংলাকে একটি আঞ্চলিক রাজ্য থেকে সমগ্র উত্তর ভারতের প্রধান সাম্রাজ্যে রূপান্তর করেন। তিনি গঙ্গানদীর অববাহিকা ধরে অগ্রসর হয়ে কনৌজ অধিকার করেন এবং ইন্দ্রায়ুধকে অপসারিত করেন। কনৌজে আয়োজিত এক বিশাল দরবারে ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, অবন্তি ও গান্ধারের রাজারা ধর্মপালের অধীনতা স্বীকার করেন এবং ধর্মপাল পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ পরমেশ্বর উপাধি গ্রহণ করেন।
এই বিস্তারের মধ্য দিয়ে বাংলা জড়িয়ে পড়ে রাজপুতানার গুর্জর-প্রতিহার এবং দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটদের সাথে উত্তর ভারতের আধিপত্যের ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় সংঘাত-এ। ধর্মপালের পর তাঁর পুত্র দেবপাল (শাসনকাল আনু. ৮১০–৮৫০ খ্রি.) পাল সাম্রাজ্যকে তার ভৌগোলিক সীমানার সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে যান। তাঁর বাদাল স্তম্ভলিপি অনুযায়ী তাঁর অভিযান হিমালয় থেকে বিন্ধ্য পর্বত এবং আসামের কামরূপ থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।
৩. সোমপুর মহাবিহার ও বৌদ্ধ রেনেসাঁ
পাল রাজারা ছিলেন মহাযান ও বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের বদান্যতায় বাংলায় এমন সব জ্ঞানপীঠ গড়ে ওঠে যা সমগ্র এশিয়ার পণ্ডিতদের আকৃষ্ট করত:
- সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর, নওগাঁ): সম্রাট ধর্মপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই মহাবিহারটি প্রায় ২৭ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ক্রুশাকার সুবিশাল মন্দির এবং চারপাশের ১৭৭টি ভিক্ষুকক্ষ বিশ্ব স্থাপত্যের এক পরম বিস্ময়। মন্দিরের গায়ে খোদাই করা ২,৮০০টিরও বেশি পোড়ামাটির ফলকে বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন—নৃত্যশিল্পী, শিকারী, তীরন্দাজ ও পশুপাখির রূপ নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। এই স্থাপত্যরীতি পরবর্তীকালে মিয়ানমারের বাগান ও ইন্দোনেশিয়ার প্রাম্বানান মন্দিরের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
- বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরী: নালন্দার পাশাপাশি ধর্মপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিক্রমশীলা মহাবিহার ছিল বৌদ্ধ দর্শন ও তান্ত্রিক বিদ্যার প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়।
- আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: নালন্দা তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও জাভার শৈলেন্দ্র বংশের রাজা বালপুত্রদেব নালন্দায় একটি মঠ নির্মাণ করেছিলেন এবং দেবপালের কাছে সেই মঠের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পাঁচটি গ্রাম অনুদানের অনুরোধ জানিয়েছিলেন, যা বাংলার বৈশ্বিক মর্যাদার প্রমাণ দেয়।
পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮২–১০৫৪ খ্রি.)
বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ দার্শনিক পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। নালন্দা ও ওদন্তপুরীতে শিক্ষালাভ এবং সুমাত্রায় বারো বছর অবস্থান শেষে তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহারের আচার্য নিযুক্ত হন। ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতরাজের আমন্ত্রণে বৃদ্ধ বয়সে দুর্গম হিমালয় পর্বতমালা অতিক্রম করে তিনি তিব্বতে পৌঁছান। তিনি তিব্বতে বৌদ্ধধর্মকে সংস্কার করেন এবং তাঁর রচিত গ্রন্থ বোধিপথপ্রদীপ তিব্বতি বৌদ্ধ দর্শনের মূল স্তম্ভে পরিণত হয়। সমগ্র তিব্বত ও হিমালয় অঞ্চলে আজও তিনি পরম শ্রদ্ধায় পূজিত হন।
৪. চর্যাপদ: বাংলা ভাষার প্রথম পদধ্বনি
পাল যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হলো বাংলা ভাষার জন্ম। দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ—লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা ও শবরপা—যে আধ্যাত্মিক গানগুলো রচনা করেছিলেন, তা-ই হলো চর্যাপদ।
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের রয়েল লাইব্রেরি থেকে চর্যাপদের তালপাতার পুথি আবিষ্কার করেন। এই ৪৬টি গানে ব্যবহৃত প্রাচীন বাংলা ভাষা সান্ধ্য ভাষা (আলো-আঁধারির ভাষা) নামে পরিচিত। এই গানগুলোতে তান্ত্রিক সাধনার রহস্য প্রকাশের জন্য নদীমাতৃক বাংলার বাস্তব জীবনের রূপক ব্যবহার করা হয়েছে—খেয়া নৌকা, বাঁশের সাঁকো, তুলা ধোনা, মাছ ধরা এবং শবর ব্যাধের জীবন:
“কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥”
(“শরীর যেন একটি সুন্দর বৃক্ষ, তার পাঁচটি ডাল [পঞ্চ ইন্দ্রিয]। চঞ্চল চিত্তে কাল বা মৃত্যু প্রবেশ করে।”)
— লুইপা, চর্যাপদ (১ম পদ)
চর্যাপদের মধ্য দিয়েই বিশ্বসাহিত্যে বাংলা ভাষা প্রথম কথা বলে উঠেছিল। পাল সাম্রাজ্যের চারশত বছরের স্থিতিশীলতা, জ্ঞানচর্চা ও মানবিক উদারতাই জন্ম দিয়েছিল বাঙালির এই শাশ্বত সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- মজুমদার, রমেশচন্দ্র (১৯৪৩)। হিস্ট্রি অব বেঙ্গল: ১ম খণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
- কিলহর্ন, এফ. (১৮৯৬)। দ্য খালিমপুর প্লেট অব ধর্মপালদেব। এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা।
- শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ (১৯১৬)। হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধগান ও দোহা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ।
- চ্যাটার্জি, সুনীতিকুমার (১৯২৬)। দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ (ODBL)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।