পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের ভেতর প্রোটনগুলোর পারস্পরিক কুলম্ব বিকর্ষণ বল কয়েকশত নিউটন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই চরম বিকর্ষণ সত্ত্বেও কী কারণে প্রোটনগুলো একে অপরের সাথে জমাট বেঁধে থাকে? এর কারণ হলো প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী বল—তীব্র নিউক্লীয় বল (Nuclear Force)। বিজ্ঞানী হিদেকি ইউকাওয়ার মেসন বিনিময় তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিক্স (QCD) অনুসারে এই বল কণাগুলোর মধ্যে তীব্র আকর্ষণ বজায় রাখে, আবার অতি-নিকটবর্তী দূরত্বে একটি অলঙ্ঘনীয় হার্ড কোর বিকর্ষণ তৈরি করে পরমাণুর পতন ঠেকায়।

১. ইউকাওয়া মেসন বিনিময় তত্ত্ব

১৯৩৫ সালে জাপানি পদার্থবিজ্ঞানী হিদেকি ইউকাওয়া প্রস্তাব করেন যে, তড়িৎচৌম্বকীয় বল যেমন ভরহীন ফোটন বিনিময়ের মাধ্যমে ঘটে যার বিস্তার অসীম, ঠিক তেমনি স্বল্প দূরত্বের নিউক্লীয় বল একটি নির্দিষ্ট ভরযুক্ত ভার্চুয়াল কণা বা মেসন বিনিময়ের মাধ্যমে ঘটতে হবে।

ক্লাইন-গর্ডন সমীকরণ সমাধান করে ইউকাওয়া তার ঐতিহাসিক বিভব সমীকরণ লাভ করেন:

[
V(r) = -g^2 rac{e^{-mu r}}{r} quad ext{যেখানে} quad mu = rac{m_pi c}{hbar}
]

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুযায়ী এই ভার্চুয়াল কণার স্থায়িত্বকাল (Delta t approx hbar / (m c^2))। আলোর গতিতে ভ্রমণ করলে এর সর্বোচ্চ বিস্তার দাঁড়ায় তার কম্পটন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমান:

[
R approx rac{hbar}{m_pi c} approx ১.৪ ext{ ফেমটোমিটার (fm)}
]

এই দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে ইউকাওয়া ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে এমন একটি কণা থাকা আবশ্যক যার ভর ইলেকট্রনের চেয়ে প্রায় ২৭০ গুণ বেশি (১৪০ MeV)। ১৯৪৭ সালে মহাজাগতিক রশ্মিতে পাই-মেসন ((pi)) আবিষ্কারের মাধ্যমে এই তত্ত্ব অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়।

২. আধুনিক নিউক্লীয় বল ও হার্ড কোর

কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিক্স অনুসারে নিউক্লিয়নের ভেতরের কোয়ার্কগুলো গ্লুয়ন দ্বারা আবদ্ধ থাকে। দুটি পৃথক নিউক্লিয়নের মধ্যবর্তী বল হলো একটি অবশিষ্ট তীব্র বল (Residual Strong Force)—যা নিরপেক্ষ অণুগুলোর মধ্যকার ভ্যান ডার ওয়ালস বলের মতো। এই বল তিনটি অঞ্চলে কাজ করে:

  1. দূরপাল্লার আকর্ষণ ((r > ২ ext{ fm})): একক পাই-মেসন বিনিময়ের মাধ্যমে টেনসর বল তৈরি করে যা ডয়টেরিয়াম নিউক্লিয়াসের উপবৃত্তাকার বিকৃতি ঘটায়।
  2. মধ্যম পাল্লার আকর্ষণ ((০.৮ ext{ fm} < r < ২.০ ext{ fm})): দুটি পাই-মেসন এবং ভারী সিগমা মেসন বিনিময়ের মাধ্যমে ৫০ থেকে ১০০ MeV গভীরতার আকর্ষণ কূপ তৈরি করে নিউক্লিয়াসকে বেঁধে রাখে।
  3. স্বল্প দূরত্বের হার্ড কোর বিকর্ষণ ((r < ০.৫ ext{ fm})): নিউক্লিয়ন দুটিকে ০.৫ ফেমটোমিটারের চেয়ে কাছে আনলে তাদের ভেতরের কোয়ার্কগুলোর পাউলি অপবর্জন এবং ওমেগা ভেক্টর মেসন বিনিময়ের কারণে বিভব তীব্র ধনাত্মক ((V > +১০০০ ext{ MeV})) হয়ে ওঠে। এই হার্ড কোরের কারণেই পরমাণুর নিউক্লিয়াস কোনো কৃষ্ণগহ্বরের মতো সংকুচিত হয়ে যায় না।

৩. নিউক্লিয়ার আইসোস্পিন প্রতিসাম্য

যেহেতু প্রোটন ও নিউট্রনের ভর প্রায় সমান (পার্থক্য মাত্র ০.১৪%), তাই হাইজেনবার্গ প্রস্তাব করেন যে এরা মূলত একই কণার দুটি ভিন্ন কোয়ান্টাম অবস্থা। একে বলা হয় আইসোস্পিন ((I = ১/২))। তীব্র নিউক্লীয় বলের কাছে প্রোটন-প্রোটন, নিউট্রন-নিউট্রন এবং প্রোটন-নিউট্রনের আচরণ পুরোপুরি অভিন্ন। কেবল বৈদ্যুতিক চার্জের উপস্থিতি এই নিখুঁত প্রতিসাম্যকে সামান্য ভেঙে দেয়।