পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। পারমাণবিক চুল্লি থেকে বের করা জ্বালানির মধ্যে ৯৫%-এরও বেশি অব্যবহৃত ইউরেনিয়াম এবং প্লুটোনিয়াম থাকে, যার সাথে যুক্ত থাকে তীব্র তেজস্ক্রিয় ফিশন বর্জ্য এবং লক্ষ বছরের দীর্ঘস্থায়ী মাইনর অ্যাক্টিনাইড (আমেরিসিয়াম, কুরিয়াম, নেপচুনিয়াম)। এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে ব্যবহৃত হয় তিনটি বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি: রাসায়নিক পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ (PUREX), নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন এবং মাটির গভীরে ভূতাত্ত্বিক রিপোজিটরি (Deep Geological Repository)।
১. ব্যবহৃত জ্বালানির উপাদান ও তেজস্ক্রিয় স্থায়িত্ব
চুল্লি থেকে বের করা প্রতি টন ব্যবহৃত জ্বালানিতে থাকে:
- অব্যবহৃত ইউরেনিয়াম: প্রায় ৯৩.৫% (যার মধ্যে ০.৮-১.০% ফিসাইল ইউরেনিয়াম-২৩৫ থাকে)।
- প্লুটোনিয়াম: প্রায় ১.২% (যা নতুন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য)।
- স্বল্প ও মাঝারি স্থায়ী ফিশন বর্জ্য: প্রায় ৫.০% (প্রধানত সিজিয়াম-১৩৭ ও স্ট্রনশিয়াম-৯০, যাদের অর্ধায়ু প্রায় ৩০ বছর)।
- মাইনর অ্যাক্টিনাইড: প্রায় ০.১৫% (নেপচুনিয়াম-২৩৭ ও আমেরিকিয়াম-২৪১, যা কয়েক লক্ষ বছর তেজস্ক্রিয় থাকে)।
পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ না করলে এই বর্জ্য প্রাকৃতিকভাবে নিরাপদ হতে ৩ লক্ষ বছর সময় নেয়। কিন্তু অ্যাক্টিনাইডগুলোকে আলাদা করে ফিউশনে পুড়িয়ে ফেললে এই সময় নেমে আসে মাত্র ৩০০ বছরে।
২. PUREX রাসায়নিক নিষ্কাশন পদ্ধতি
বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত PUREX (Plutonium Uranium Redox Extraction) পদ্ধতিতে ব্যবহৃত জ্বালানিকে ফুটন্ত নাইট্রিক অ্যাসিডে দ্রবীভূত করে কেরোসিনে মিশ্রিত ৩০% ট্রাইবিউটাইল ফসফেট (TBP) দ্রাবকের সংস্পর্শে আনা হয়:
[
ext{UO}_2^{2+} + 2 ext{NO}_3^- + 2 ext{TBP}_{( ext{org})}
ightleftharpoons ext{UO}_2( ext{NO}_3)_2 cdot 2 ext{TBP}_{( ext{org})}
]
TBP যৌগটি কেবল ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়ামকে আকর্ষণ করে জৈব স্তরে টেনে নেয়, আর তেজস্ক্রিয় ফিশন বর্জ্যগুলো নিচে পানিতে থেকে যায়। এরপর একটি রাসায়নিক বিজারক যোগ করে প্লুটোনিয়ামের জারণ সংখ্যা কমিয়ে (( ext{Pu}^{4+} o ext{Pu}^{3+})) তাকে ইউরেনিয়াম থেকে পুরোপুরি আলাদা করা হয়। উদ্ধারকৃত ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম মিলিয়ে তৈরি হয় MOX (Mixed Oxide) জ্বালানি, যা চুল্লিতে পুনরায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
৩. নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন
দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্যগুলোকে ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর বা এক্সিলারেটর-চালিত সাব-ক্রিটিক্যাল সিস্টেমে (ADS) দ্রুতগতির নিউট্রন দ্বারা আঘাত করা হয়। তীব্র নিউট্রন প্রবাহের নিচে মাইনর অ্যাক্টিনাইডগুলো ভেঙে গিয়ে অ-তেজস্ক্রিয় বা স্বল্পস্থায়ী স্থিতিশীল মৌলে রূপান্তরিত হয়। ফলে পারমাণবিক বর্জ্য থেকে নিজেই কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ তৈরি হয়।
৪. ফিনল্যান্ডের অনকালো (Onkalo) ভূতাত্ত্বিক রিপোজিটরি
অবশিষ্ট চূড়ান্ত বর্জ্যকে তরল বোরোসিলিকেট কাচের সাথে মিশিয়ে নিরেট কাচ ব্লকে রূপান্তর করা হয়। ফিনল্যান্ডে নির্মিত বিশ্বের প্রথম গভীর ভূতাত্ত্বিক রিপোজিটরি অনকালো (Onkalo)-তে ভূগর্ভের প্রায় ৫০০ মিটার গভীরে গ্রানাইট পাথরের খাঁজে এই বর্জ্যকে তামা ও বেন্টোনাইট মাটির মাল্টি-ব্যারিয়ার আবরণে সিল করে দেওয়া হয়েছে—যা আগামী ১০ লক্ষ বছর পর্যন্ত মানবজাতি ও পরিবেশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকবে।