নিউক্লিয়ার ফিউশন হলো মহাবিশ্বের শক্তির পরম উৎস—যে মহাজাগতিক চুল্লিতে নক্ষত্ররা প্রজ্বলিত হয় এবং হাইড্রোজেন থেকে সৃষ্টি হয় সমস্ত ভারী মৌল। পৃথিবীতে এই নক্ষত্রশক্তিকে বশীভূত করতে পারলে মানবজাতি লাভ করবে কার্বনমুক্ত, অন্তহীন ও নিরাপদ শক্তির ভাণ্ডার। কিন্তু দুটি ধনাত্মক নিউক্লিয়াসকে জোড়া লাগাতে হলে প্রকৃতির এক প্রচণ্ড বাধার মুখোমুখি হতে হয়: সমধর্মী চার্জের তীব্র কুলম্ব বিকর্ষণ প্রাচীর।
১. কুলম্ব প্রাচীর ও কোয়ান্টাম টানেলিং
দুটি নিউক্লিয়াসকে ফিউশন ঘটাতে হলে তাদের তীব্র নিউক্লীয় বলের সীমার মধ্যে (প্রায় কয়েক ফেমটোমিটার দূরত্বে) নিয়ে আসতে হয়। ডয়টেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের জন্য এই কুলম্ব বাধার উচ্চতা প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ keV। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী এই বাধা টপকাতে হলে তাপমাত্রা হতে হবে ৫০০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস!
কিন্তু ১৯২৯ সালে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কারণে কণাগুলো প্রাচীরের ওপর দিয়ে না লাফিয়ে প্রাচীর ভেদ বা টানেল করে অপর পাশে চলে যেতে পারে। WKB সূত্র অনুসারে টানেলিং সম্ভাবনা:
[
P(E) = xpleft( – sqrt{rac{E_G}{E}}
ight)
]
যেখানে (E_G) হলো গ্যামো এনার্জি। এই কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের কারণেই তাপমাত্রা ৫০০ কোটি ডিগ্রির বদলে মাত্র ১৫ কোটি ডিগ্রিতেই ফিউশন সম্ভব হয়।
২. গ্যামো পিক (The Gamow Peak)
প্লাজমাতে কণার গতিশক্তি ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান বন্টন মেনে চলে। কণার সংখ্যা বাড়লে উচ্চ শক্তির কণার সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে ((e^{-E/kT})), কিন্তু কোয়ান্টাম টানেলিং সম্ভাবনা শক্তির সাথে দ্রুত বাড়তে থাকে ((e^{-sqrt{E_G/E}}))। এই দুটি বিপরীতমুখী বলের সংঘর্ষে তৈরি হয় একটি সংকীর্ণ শক্তি অঞ্চল—গ্যামো পিক (Gamow Peak):
[
E_0 approx ১.২২ left( Z_1^2 Z_2^2 A_r T_{ ext{keV}}^2
ight)^{1/3} ext{ keV}
]
১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গ্যামো পিকের কেন্দ্র থাকে প্রায় ৬৬ keV-তে। এই উইন্ডোর ভেতরেই প্লাজমার সমস্ত ফিউশন বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
৩. প্রধান ফিউশন বিক্রিয়াসমূহ
- ডয়টেরিয়াম-ট্রিটিয়াম (D-T):
[
{}^2 ext{H} + {}^3 ext{H} o {}^4 ext{He} (৩.৫ ext{ MeV}) + n (১৪.১ ext{ MeV}) quad [Q = ১৭.৬ ext{ MeV}]
]
সবচেয়ে কম কুলম্ব বাধা এবং সর্বোচ্চ বিক্রিয়ার হারের কারণে বিশ্বের সমস্ত প্রথম প্রজন্মের ফিউশন রিঅ্যাক্টর (যেমন ITER) এই বিক্রিয়া ব্যবহার করে। - ডয়টেরিয়াম-ডয়টেরিয়াম (D-D): সমুদ্রের পানিতে অফুরন্ত ডয়টেরিয়াম থাকলেও এর বিক্রিয়ার হার D-T-এর চেয়ে ১০০ গুণ কম, ফলে ৫০ কোটি ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়।
- ডয়টেরিয়াম-হিলিয়াম-৩ (( ext{D-}^3 ext{He})): এতে কোনো ক্ষতিকর নিউট্রন তৈরি হয় না, কিন্তু চাঁদের মাটি ছাড়া পৃথিবীতে হিলিয়াম-৩ প্রায় বিরল।
৪. লসন মানদণ্ড ও ট্রিপল প্রোডাক্ট
১৯৫৭ সালে জন লসন প্রমাণ করেন যে একটি চুল্লি নিজে থেকেই ফিউশন চালিয়ে যেতে পারবে (ইগনিশন) যদি প্লাজমার স্ব-উৎপাদিত আলফা কণার শক্তি তার সমস্ত তাপ অপচয়কে পুরোপুরি প্রতিহত করতে পারে। একে বলে লসনের ট্রিপল প্রোডাক্ট (Lawson Triple Product):
[
n cdot T cdot au_E ge ৩ imes ১০^{২১} ext{ m}^{-3} cdot ext{keV} cdot ext{s}
]
এখানে (n) হলো প্লাজমার ঘনত্ব, (T) হলো তাপমাত্রা এবং ( au_E) হলো তাপ ধরে রাখার সময় (Confinement Time)। আধুনিক চৌম্বক টোকামাক এবং লেজার ফিউশন এই শর্ত পূরণ করেই ফিউশন বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।