বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দীর্ঘায়ু নির্ধারণে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত প্রতিবন্ধকতা প্লাজমা নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং পদার্থবিজ্ঞান ও বস্তু প্রকৌশল (Materials Science)। ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম ফিউশনে উৎপন্ন শক্তির (৮০%) নির্গত হয় প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন ১৪.১ MeV ফিউশন নিউট্রন হিসেবে। চার্জহীন এই নিউট্রনগুলো ভ্যাকুয়াম ভেসেলের ধাতব প্রাচীর ভেদ করে পরমাণুগুলোকে তাদের স্ফটিক ল্যাটিস থেকে উচ্ছেদ করে, ধাতুর রাসায়নিক রূপান্তর ঘটায় এবং হিলিয়াম গ্যাস তৈরি করে চরম ভঙ্গুরতা সৃষ্টি করে।
১. নিউট্রন বিকিরণ ক্ষতি ও dpa মানদণ্ড
ফিশন চুল্লির নিউট্রনের ((১ ext{–}২ ext{ MeV})) তুলনায় ফিউশনের ১৪.১ MeV নিউট্রন বহু গুণ বেশি শক্তিশালী। এই অবিরাম বোমাবর্ষণে উপাদানের ক্ষতি পরিমাপ করা হয় Displacements Per Atom (dpa) এককে:
[
ext{dpa} = int Phi(E) , sigma_d(E) , dE cdot t
]
একটি ফিউশন চুল্লির প্রথম প্রাচীরে (First Wall) প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ dpa ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। এর অর্থ হলো, কয়েক বছরের মধ্যে ধাতব কাঠামোর প্রতিটি পরমাণু তার মূল স্ফটিক অবস্থান থেকে ডজনখানেক বার ছিটকে স্থানচ্যুত হয়।
২. হিলিয়াম জনিত ভঙ্গুরতা ও ধাতব ফোলা (Void Swelling)
উচ্চ শক্তির নিউট্রনগুলো কাঠামোর লোহা, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের সাথে ((n, alpha)) পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে ধাতুর ভেতর অদ্রবণীয় হিলিয়াম গ্যাস তৈরি করে:
[
{}^{58} ext{Ni} + n o {}^{55} ext{Fe} + alpha , ({}^4 ext{He})
]
- ধাতুর ভেতর মুক্ত হিলিয়াম পরমাণুগুলো গ্রেইন বাউন্ডারিতে জমা হয়ে ন্যানো-আকারের উচ্চচাপযুক্ত গ্যাস বুদবুদ তৈরি করে।
- চুল্লির প্রচণ্ড তাপীয় টানে এই বুদবুদগুলো ধাতুকে কাঁচের মতো ভঙ্গুর করে তোলে, যার ফলে ধাতু স্বাভাবিক সহনশীলতার আগেই ফেটে যায়।
- একই সাথে ধাতুর অভ্যন্তরীণ শূন্যস্থানগুলো (Vacancies) একত্রিত হয়ে পুরো ধাতুর আয়তন (৫%) বা তার বেশি ফুলিয়ে দেয় (Void Swelling), যা সূক্ষ্ম চৌম্বক কয়েল ও ভ্যাকুয়াম সিল বিনষ্ট করতে পারে।
৩. উন্নত সংকর ধাতু: RAFM ও ODS স্টিল
চুল্লির উপাদান যেন ব্যবহারের ১০০ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ নিরাপদ তেজস্ক্রিয়তাহীন স্তরে নেমে আসে, সেজন্য দীর্ঘস্থায়ী আইসোটোপ তৈরি করে এমন উপাদান (নিকেল, মলিবডেনাম, কোবাল্ট) বাদ দিয়ে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত উপাদান (টাংস্টেন, ভ্যানাডিয়াম, ট্যানটালাম) দিয়ে তৈরি করা হয় RAFM (Reduced Activation Ferritic-Martensitic) স্টিল (যেমন EUROFER97)।
আরও চরম পরিবেশে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছে ODS (Oxide Dispersion Strengthened) স্টিল, যার মধ্যে ন্যানোমিটার আকারের ইট্রিয়াম অক্সাইড (( ext{Y}_2 ext{O}_3)) কণা ছড়ানো থাকে। এই ন্যানো-কণাগুলো নিউট্রনজনিত ত্রুটিগুলোকে পুনরায় জোড়া লাগায় এবং হিলিয়াম বুদবুদকে বড় হতে না দিয়ে নিরাপদে আটকে রাখে। ডাইভার্টারের চরম তাপীয় অঞ্চলে ((১০ ext{–}২০ ext{ MW/m}^2)) ব্যবহৃত হয় উচ্চ গলনাঙ্কের বিশুদ্ধ টাংস্টেন (Tungsten) আর্মার।
৪. জ্বালানির স্বয়ংসম্পূর্ণতা: লিথিয়াম ব্রিডিং ব্ল্যাঙ্কেট
প্রকৃতিতে ট্রিটিয়ামের কোনো খনি নেই এবং এর অর্ধায়ু মাত্র ১২.৩ বছর। ১ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি ফিউশন রিঅ্যাক্টরে বছরে প্রায় ৫৬ কেজি ট্রিটিয়াম প্রয়োজন। তাই ভ্যাকুয়াম ভেসেলের চারপাশে স্থাপিত লিথিয়াম ব্ল্যাঙ্কেটে নিউট্রন আঘাত ঘটিয়ে চুল্লির ভেতরেই ট্রিটিয়াম উৎপাদন করতে হয়:
- ({}^6 ext{Li} + n_{ ext{thermal}} o {}^3 ext{H} , ( ext{T}) + {}^4 ext{He} + ৪.৭৮ ext{ MeV})
- ({}^7 ext{Li} + n_{ ext{fast}} o {}^3 ext{H} , ( ext{T}) + {}^4 ext{He} + n’ – ২.৪৭ ext{ MeV})
চুল্লির দেয়ালে শোষিত নিউট্রনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেরিলিয়াম বা সীসার মতো নিউট্রন গুণক উপাদান ব্যবহার করা হয়, যাতে ট্রিটিয়াম ব্রিডিং অনুপাত (TBR) সর্বদা (১.০৫) থেকে (১.১৫) এর উপরে থাকে।