মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থিত পারমাণবিক নিউক্লিয়াস: এক অতি-ঘন কোয়ান্টাম ফোঁটা যার মধ্যে পরমাণুর মোট ভরের ৯৯.৯৫%-এরও বেশি পুঞ্জীভূত থাকে ইলেকট্রন মেঘের তুলনায় ১০ লক্ষ কোটি গুণ ক্ষুদ্র স্থানে। যেকোনো স্থিতিশীল নিউক্লিয়াসের মোট ভর তার ভেতরের পৃথক প্রোটন ও নিউট্রনগুলোর মুক্ত ভরের যোগফলের চেয়ে সামান্য কম হয়। এই হারানো ভরই হলো ভর ত্রুটি ((Delta m)), যা আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ (E = mc^2) অনুযায়ী রূপান্তরিত হয় নিউক্লিয়ার বন্ধন শক্তিতে (Binding Energy)—যা নক্ষত্রের ফিউশন এবং পৃথিবীর পারমাণবিক চুল্লির মূল ভিত্তি।

১. ভর ত্রুটি ও নিউক্লিয়ার বন্ধন শক্তি

(Z) সংখ্যক প্রোটন এবং (N = A – Z) সংখ্যক নিউট্রনযুক্ত একটি নিউক্লিয়াসের ভর ত্রুটি হলো:

[
Delta m = left[ Z m_p + (A – Z) m_n
ight] – M(A, Z)
]

নিউক্লিয়াসটিকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে তার প্রতিটি নিউক্লিয়নকে অসীম দূরত্বে আলাদা করতে যে পরিমাণ বাহ্যিক শক্তি সরবরাহ করতে হয়, তাকে বলে মোট বন্ধন শক্তি:

[
B(A, Z) = Delta m cdot c^2
]

প্রতি নিউক্লিয়ন প্রতি বন্ধন শক্তি ((B/A)) ডয়টেরিয়ামে মাত্র ১.১১ MeV থেকে শুরু করে খাড়াভাবে উপরে উঠে লোহা-৫৬ (({}^{56} ext{Fe}), ৮.৭৯ MeV) এবং নিকেল-৬২ (({}^{62} ext{Ni}))-এ সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। এরপর ভারী মৌলগুলোর দিকে ধীরে ধীরে কমে ইউরেনিয়াম-২৩৮-এ এসে দাঁড়ায় ৭.৫৭ MeV-তে।

এই গ্রাফটি পারমাণবিক শক্তির দুটি পথকে ব্যাখ্যা করে:

  • নিউক্লিয়ার ফিউশন: হালকা পরমাণুগুলোকে জোড়া লাগালে বন্ধন শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং প্রচণ্ড শক্তি মুক্ত হয়।
  • নিউক্লিয়ার ফিশন: ইউরেনিয়ামের মতো ভারী পরমাণুকে ভেঙে মাঝারি আকারের পরমাণুতে পরিণত করলে লোহা-৫৬ শিখরের দিকে অগ্রসর হওয়ায় শক্তি নির্গত হয়।

২. বেথে-ভাইৎসজেকার সমীকরণ (লিকুইড ড্রপ মডেল)

১৯৩৫ সালে প্রবর্তিত এই মডেলে নিউক্লিয়াসকে একটি অসংকোচনীয় তরল ফোঁটা হিসেবে বিবেচনা করা হয় যার ঘনত্ব (
ho_0 approx ০.১৭ ext{ nucleons/fm}^3)। মোট বন্ধন শক্তিকে পাঁচটি পদের সমন্বয়ে প্রকাশ করা হয়:

[
B(A, Z) = a_V A – a_S A^{2/3} – a_C rac{Z(Z-1)}{A^{1/3}} – a_A rac{(A – 2Z)^2}{A} + delta(A, Z)
]

  1. আয়তন শক্তি ((a_V A)): তীব্র নিউক্লীয় বলের স্বল্প দূরত্বের সম্পৃক্ততার কারণে প্রতিটি নিউক্লিয়ন কেবল তার প্রতিবেশীদের আকর্ষণ করে, যা মোট আয়তনের (বা (A)) সমানুপাতিক।
  2. পৃষ্ঠ শক্তি ((-a_S A^{2/3})): তরলের পৃষ্ঠটানের মতো নিউক্লিয়াসের বাইরের স্তরের কণাগুলোর প্রতিবেশী কম থাকায় বন্ধন শক্তি কিছুটা হ্রাস পায় ((propto A^{2/3}))।
  3. কুলম্ব বিকর্ষণ শক্তি ((-a_C rac{Z^2}{A^{1/3}})): সমধর্মী ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটনগুলোর পারস্পরিক বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ মোট স্থায়িত্ব কমিয়ে দেয়।
  4. অপ্রতিসাম্য শক্তি ((-a_A rac{(A-2Z)^2}{A})): পাউলির অপবর্জন নীতির কারণে প্রোটন ও নিউট্রনের সংখ্যার অসমতা ((N
    e Z)) শক্তি বৃদ্ধি করে স্থায়িত্ব নষ্ট করে।
  5. জোড় শক্তি ((delta)): সমান্তরাল ও বিপরীতমুখী স্পিনের কণাগুলো পরস্পরের সাথে জোড় বাঁধলে (Even-Even) সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীলতা লাভ করে।

৩. স্থিতিশীলতার উপত্যকা (Valley of Stability)

হালকা মৌলগুলোর ক্ষেত্রে প্রোটন ও নিউট্রনের সংখ্যা সমান ((N approx Z)) হলে সবচেয়ে বেশি স্থায়িত্ব পাওয়া যায়। কিন্তু ভারী মৌলগুলোর ক্ষেত্রে প্রোটনের প্রকাণ্ড কুলম্ব বিকর্ষণ প্রতিহত করতে অতিরিক্ত নিউট্রনের প্রয়োজন হয়, ফলে ইউরেনিয়ামের ক্ষেত্রে নিউট্রন ও প্রোটনের অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় ১.৫৪। যে পরমাণুগুলো এই স্থিতিশীলতার উপত্যকা থেকে দূরে সরে যায়, তারা তেজস্ক্রিয় আলফা বা বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে উপত্যকার তলদেশে নেমে এসে স্থায়ীত্ব লাভ করে।