সৌরজগতের অন্যান্য পাথুরে গ্রহ, উপগ্রহ ও গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর বৈসাদৃশ্য পর্যালোচনা করাই হলো তুলনামূলক গ্রহবিজ্ঞান (Comparative Planetology)। পৃথিবী যেখানে গতিশীল প্লেট টেকটোনিক্সের মাধ্যমে পৃষ্ঠের ভূত্বককে ক্রমাগত পুনর্ব্যবহার করে, সেখানে বুধ, চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহ এক অবিচ্ছিন্ন একক-প্লেট কাঠামো বা স্ট্যাগনান্ট-লিড (Stagnant Lid) দ্বারা আবৃত। এর ফলে এই গ্রহগুলোতে কোটি কোটি বছর ধরে প্লেট না সরে এক স্থানেই অগ্ন্যুৎপাত ঘটে তৈরি হয়েছে সৌরজগতের দানবীয় আগ্নেয়গিরি।
১. গ্রহীয় লিথোস্ফিয়ার রেসিম: মোবাইল-লিড বনাম স্ট্যাগনান্ট-লিড
একটি গ্রহের অভ্যন্তরীণ তাপ কীভাবে বাইরে নির্গত হবে তা নির্ভর করে পৃষ্ঠের শিলার প্লাস্টিক নমনীয়তার ওপর:
- মোবাইল-লিড (পৃথিবী): ভূত্বকে পর্যাপ্ত পানির উপস্থিতি শিলার ঘর্ষণ কমিয়ে দেয়, যার ফলে লিথোস্ফিয়ার বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত হয়ে সাগরে নিমজ্জিত হয় ও ম্যান্টলে পুনর্ব্যবহৃত হয়।
- স্ট্যাগনান্ট-লিড (মঙ্গল, বুধ, চাঁদ): গ্রহের বাইরের খোসা একটি অখণ্ড নিরেট পাথুরে ঢাকনা। নিচে ম্যান্টল সংবহন ঘটলেও ওপরের ভূত্বক একদম স্থির থাকে। ফলে কোনো টেকটোনিক প্লেট সীমানা তৈরি হয় না; ম্যান্টল হটস্পটের ওপর ভূত্বক স্থির থাকায় কোটি কোটি বছর ধরে একই স্থানে লাভা জমা হতে থাকে।
- এপিসোডিক রেসিম (শুক্র গ্রহ): শুক্রে পানি না থাকায় ভূত্বক অত্যন্ত শুষ্ক ও অনমনীয়। ফলে স্বাভাবিক সাবডাকশন ঘটে না; কিন্তু ভেতরের তাপ জমতে জমতে প্রতি ৫০ কোটি বছর পর পর সমগ্র পৃষ্ঠ একযোগে গলিত লাভার বন্যায় পুড়ে সম্পূর্ণ নতুন রূপ লাভ করে।
২. মঙ্গল গ্রহ: স্বল্প মহাকর্ষ ও অলিম্পাস মনস
মঙ্গল গ্রহে অবস্থিত অলিম্পাস মনস (Olympus Mons) সৌরজগতের সর্ববৃহৎ আগ্নেয়গিরি। এটি প্রায় ২২ কিলোমিটার উঁচু এবং এর তলদেশের ব্যাস ৬০০ কিলোমিটার (সমগ্র ফ্রান্সের সমান)।
একটি গ্রহে সর্বোচ্চ কত উঁচু পর্বত টিকে থাকতে পারে ((h_{ ext{max}})), তা শিলার কাঠিন্য ((sigma_y)) এবং গ্রহের মহাকর্ষীয় ত্বরণ ((g)) দ্বারা নির্ধারিত হয়:
[
h_{ ext{max}} sim rac{sigma_y}{
ho g}
]
মঙ্গল গ্রহের মহাকর্ষীয় ত্বরণ ((g_{ ext{Mars}} approx ৩.৭২ ext{ মি/সে}^২)) পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ৩৮%। মহাকর্ষ কম হওয়ায় শিলা না ধসে পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২.৬ গুণ বেশি উঁচু পাহাড়ের ওজন ধরে রাখতে পারে। এর সাথে স্ট্যাগনান্ট-লিড যুক্ত হওয়ায় কয়েকশ কোটি বছর ধরে একই ফাটল দিয়ে লাভা নির্গত হয়ে এই দানবাকৃতির গঠন তৈরি করেছে।
৩. চাঁদের ভূতত্ত্ব: ভাসমান ম্যাগমা সাগর ও চান্দ্র মারিয়া
চাঁদের জন্মলগ্নে সমগ্র গ্রহ একটি বিশালাকার গলিত ম্যাগমা সাগরে আবৃত ছিল:
- লুনার হাইল্যান্ডস (অ্যানরথোসাইট ভূত্বক): চাঁদের উজ্জ্বল পাহাড়ি অঞ্চলগুলো প্রায় ৯০% বিশুদ্ধ প্লাজিওক্লেস ফেল্ডস্পার শিলা (অ্যানরথোসাইট) দ্বারা গঠিত। ম্যাগমা সাগর শীতল হওয়ার সময় ভারী অলিভাইন খনিজ নিচে ডুবে চাঁদের ম্যান্টল গঠন করে এবং হালকা অ্যানরথোসাইট খনিজ বরফের মতো ওপরে ভেসে উঠে চাঁদের প্রাচীন আদিম ভূত্বক ((৪.৪ ext{ Ga})) তৈরি করে।
- চান্দ্র মারিয়া (ব্যাসাল্ট সমুদ্র): চাঁদের দূর থেকে দৃশ্যমান কালো সমতল দাগগুলো হলো মারিয়া (Maria)। লেট হেভি বোম্বার্ডমেন্ট পর্বে বিশালাকার উল্কার আঘাতে তৈরি হওয়া গভীর গহ্বরগুলোতে পরবর্তীতে ভূ-অভ্যন্তরের অত্যন্ত তরল টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ কালো লাভা জমে এই সমতল ব্যাসল্ট স্তর তৈরি করেছিল।
৪. জোয়ার-ভাটার তাপ ও বরফ চাঁদের ক্রায়োভলকানিজম
সৌরজগতের বহির্ভাগে ভূতাত্ত্বিক শক্তির মূল উৎস তেজস্ক্রিয় ক্ষয় নয়, বরং দানব গ্রহগুলোর প্রবল মহাকর্ষীয় জোয়ার-ভাটা বিকৃতি (Tidal Dissipation)। বৃহস্পতির চাঁদ আয়ো ও ইউরোপা এবং শনির চাঁদ এনসেলাডাসে উপবৃত্তাকার কক্ষপথের কারণে বরফ ও পাথরের ভেতর অবিরাম ঘর্ষণ ঘটে তাপ উৎপন্ন হয়:
[
dot{E}_{ ext{tidal}} approx rac{21}{2} rac{k_2 G M_{ ext{primary}}^2 R^5 e^2 Omega}{a^6 Q}
]
শনির চাঁদ এনসেলাডাস (Enceladus)-এ জোয়ারের তাপে বরফের নিচে একটি বৈশ্বিক তরল মহাসাগর টিকে রয়েছে। দক্ষিণ মেরুর ফাটল দিয়ে সেকেন্ডে শত শত কিলোমিটার বেগে মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে উষ্ণ বাষ্প, লবণ ও জৈব অণুর সুপারসনিক ফোয়ারা (Cryovolcanism), যা প্রমাণ করে পৃথিবীর বাইরে সৌরজগতে প্রাণের সন্ধানের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো এই বরফ চাঁদগুলো।