সিসমিক এস-তরঙ্গের সফল সঞ্চালন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে পৃথিবীর ২,৯০০ কিমি পুরু ম্যান্টল যান্ত্রিকভাবে কঠিন। কিন্তু কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক স্কেলে এই কঠিন সিলিকেট ম্যান্টল একটি অতি-সান্দ্র তরলের ন্যায় প্রবাহিত হয়। তেজস্ক্রিয় ক্ষয়জনিত তাপ ও আদিম শীতলীকরণ দ্বারা চালিত কঠিনাবস্থায় ম্যান্টল সংবহন (Solid-State Mantle Convection) হলো পৃথিবীর মূল তাপীয় ইঞ্জিন, যা পৃষ্ঠের টেকটোনিক প্লেটসমূহকে ভাসিয়ে রাখে এবং গভীর ম্যান্টল প্লুমের জন্ম দেয়।
১. ম্যান্টল সিলিকেটের কঠিনাবস্থায় ক্রিপ রিওলজি
ম্যান্টলের বিকৃতি ঘটে সিলিকেট খনিজগুলোর (উচ্চ ম্যান্টলে অলিভাইন এবং নিম্ন ম্যান্টলে ব্রিজম্যানাইট) স্ফটিক জালিকার ভেতর তাপীয়ভাবে সক্রিয় প্লাস্টিক প্রবাহের মাধ্যমে। আরহেনিয়াস সূত্র অনুসারে এর স্ট্রেন রেট (dot{psilon}):
[
dot{psilon} = A left(rac{sigma}{mu}
ight)^n left(rac{b}{d}
ight)^m xpleft(-rac{E^* + p V^*}{R T}
ight)
]
এখানে (sigma) হলো পীড়ন (Stress), (d) হলো কণার আকার, (E^*) হলো সক্রিয়করণ শক্তি এবং (V^*) হলো সক্রিয়করণ আয়তন। ম্যান্টলে দুটি প্রধান অণু-গাঠনিক মেকানিজম কাজ করে:
ক. ডিফিউশন ক্রিপ ((n = ১), নিউটোনীয় রিওলজি)
নিম্ন পীড়নে খনিজের পরমাণু বা শূন্যস্থানগুলো স্ফটিকের ভেতর দিয়ে (ন্যাবারো-হেরিং ক্রিপ, (m=২)) বা কণার সীমানা বরাবর (কোবল ক্রিপ, (m=৩)) পরিবাহিত হয়। এখানে (n = ১) হওয়ায় কার্যকর সান্দ্রতা (ta = sigma / (২dot{psilon})) পীড়নের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি রৈখিক নিউটোনীয় তরলের মতো আচরণ করে। নিম্ন ম্যান্টল ও অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে ডিফিউশন ক্রিপ প্রভাবশালী।
খ. ডিসলোকেশন ক্রিপ ((n approx ৩ ext{–}৩.৫), নন-নিউটোনীয় পাওয়ার-ল)
উচ্চ পীড়নে স্ফটিক জালিকার ডিসলোকেশন স্থানচ্যুতির মাধ্যমে শিয়ার ঘটে। (n > ১) হওয়ায় সান্দ্রতা পীড়ন বৃদ্ধির সাথে হ্রাস পায় (Strain-rate weakening):
[
ta_{ ext{eff}} = rac{১}{২ A} sigma^{১-n} xpleft(rac{E^* + p V^*}{R T}
ight)
]
ডিসলোকেশন ক্রিপের ফলে অলিভাইন স্ফটিকগুলো একটি নির্দিষ্ট দিকে বিন্যস্ত হয়, যা মহাসাগরীয় ভূত্বকে সিসমিক অ্যানাইসোট্রপি (Seismic Anisotropy) তৈরি করে।
২. রেইলি-বেনার্ড কনভেকশন ও বাউন্ডারি লেয়ার
ম্যান্টলের সংবহন ক্ষমতা মাত্রাহীন রেইলি সংখ্যা (( ext{Ra})) দ্বারা নির্ধারিত হয়:
[
mathrm{Ra} = rac{
ho g alpha Delta T D^৩}{kappa ta}
]
এখানে (alpha approx ২.৫ imes ১০^{-৫} ext{ K}^{-১}), (kappa approx ১০^{-৬} ext{ মি}^২/ ext{সে}), (D approx ২৮৯০ ext{ কিমি}) এবং গড় সান্দ্রতা (ta approx ১০^{২১} ext{ Pa}cdot ext{s})। পৃথিবীর ম্যান্টলের জন্য ( ext{Ra} sim ১০^৭ ext{–}১০^৮), যা সংকট সীমা ( ext{Ra}_{ ext{crit}} approx ১০^৩) এর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ম্যান্টল কনভেকশন অত্যন্ত তীব্র ও পরিবর্তনশীল।
অভ্যন্তরে তাপ মূলত তরল প্রবাহের দ্বারা পরিবাহিত হওয়ায় মূল তাপীয় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে দুটি সংকীর্ণ থার্মাল বাউন্ডারি লেয়ারে:
- উচ্চ বাউন্ডারি লেয়ার (লিথোস্ফিয়ার): মহাকাশের বিপরীতে পরিবাহী শীতলীকরণের ফলে ঘন ও ভারী হয়ে সাবডাকশন জোনে তলিয়ে যায়।
- নিম্ন বাউন্ডারি লেয়ার (CMB-তে D” স্তর): কোরের তাপ শোষণ করে উত্তপ্ত হয় এবং সরু নলাকার ম্যান্টল প্লুম (Mantle Plume) আকারে ঊর্ধ্বমুখী ধাবিত হয়।
৩. তাপ-রাসায়নিক প্লুম ও লার্জ ইগনিয়াস প্রভিন্স (LIP)
নিম্ন বাউন্ডারি লেয়ার উত্তপ্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হলে একটি বিশাল গোলাকার প্লুম হেড (৫০০-১০০০ কিমি ব্যাস) এবং তার পেছনে একটি সরু প্লুম কন্ডুইট তৈরি হয়। প্লুমের এই বিশাল মাথা ভূত্বকের নিচে আঘাত হানলে ডিকম্প্রেশন গলনের ফলে স্বল্প সময়ে লাখ লাখ ঘনকিলোমিটার লাভা উদ্গীরিত হয়ে লার্জ ইগনিয়াস প্রভিন্স (LIP) সৃষ্টি করে (যেমন ভারতের ডেকান ট্র্যাপ এবং রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ট্র্যাপ, যা বৈশ্বিক গণবিলুপ্তির সাথে সরাসরি যুক্ত)।
প্লুমের মাথা মিলিয়ে যাওয়ার পর স্থায়ী প্লুম কন্ডুইটের ওপর দিয়ে টেকটোনিক প্লেট সরে যেতে থাকলে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মতো দীর্ঘ আগ্নেয় দ্বীপ শৃঙ্খল (Hotspot Track) তৈরি হয়।
৪. D” স্তর এবং LLSVP সুপারপ্লুম
আধুনিক সিসমিক টমোগ্রাফি প্রমাণ করেছে কোর-ম্যান্টল বাউন্ডারি রাসায়নিকভাবে সমসত্ব নয়। আফ্রিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে কোর-ম্যান্টল বাউন্ডারির ওপর অবস্থান করছে দুটি দানবীয় কাঠামো, যাদের বলা হয় LLSVP (Large Low-Shear-Velocity Provinces)। এগুলো ম্যান্টলে শত শত কিলোমিটার উঁচুতে উত্থিত এবং এদের ভেতর এস-তরঙ্গের গতিবেগ ১-৩% হ্রাস পায়। ভূ-পদার্থবিজ্ঞানীদের ধারণা, এগুলো আদি ম্যাগমা সাগরের অবশিষ্টাংশ অথবা বিলিয়ন বছর ধরে নিমজ্জিত মহাসাগরীয় ভূত্বকের ভারী রাসায়নিক সঞ্চয়, যার প্রান্তসীমা থেকেই প্রধান ম্যান্টল প্লুমের উৎপত্তি ঘটে।