পৃথিবীর বৈশ্বিক দ্বিমেরু চৌম্বক ক্ষেত্র হলো সৌরঝড় এবং মহাজাগতিক রশ্মির বিরুদ্ধে গ্রহের প্রাকৃতিক বর্ম। কিন্তু যেকোনো লৌহচৌম্বকীয় খনিজ তার কিউরি তাপমাত্রার উপরে ((T_C approx ৫৮০^circ ext{C}), যা ভূত্বকের ৩০-৫০ কিমি নিচেই অর্জিত হয়) চৌম্বকত্ব সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। সুতরাং ভূত্বকের স্থায়ী চুম্বকত্ব দিয়ে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। এর প্রকৃত উৎস হলো তরল লৌহনির্মিত বহিঃস্থ কোরে অবিরাম ঘূর্ণায়মান একটি স্বতঃস্ফূর্ত তাপ-রাসায়নিক ভূ-ডায়নামো (Geodynamo)।
১. ম্যাগনেটোহাইড্রোডায়নামিক্স ও ইন্ডাকশন সমীকরণ
ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চুম্বকীয় সমীকরণ এবং সান্দ্র তরলের নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের যুগল মিলনে (বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা (sigma approx ১০^৬ ext{ S/m}), চৌম্বকীয় ডিফিউসিভিটি (ta = ১ / (mu_০ sigma) approx ১ ext{–}২ ext{ মি}^২/ ext{সে})) গঠিত হয় মৌলিক চৌম্বকীয় ইন্ডাকশন সমীকরণ:
[
rac{partial mathbf{B}}{partial t} =
abla imes (mathbf{u} imes mathbf{B}) + ta
abla^২ mathbf{B}
]
এই গতিশীলতা মাত্রাহীন ম্যাগনেটিক রেনল্ডস সংখ্যা (( ext{Rm})) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়:
[
mathrm{Rm} = rac{U L}{ta}
]
যখন ( ext{Rm} ll ১), চৌম্বকীয় বিচ্ছুরণ প্রাধান্য পায় এবং ক্ষেত্র নিঃশেষিত হয়। কিন্তু পৃথিবীর তরল কোরে ((U sim ১০^{-৪} ext{ মি/সে}), (L sim ১০^৬ ext{ মি})), ( ext{Rm} sim ১০০ ext{–}৩০০)। আলফভেনের উপপাদ্য (Alfvén’s Frozen-in Flux Theorem) অনুসারে চৌম্বক বলরেখাগুলো তরলের সাথে সেঁটে থাকে, ফলে তরল প্রবাহের ঘূর্ণন চৌম্বকীয় ফ্লাক্সকে প্রসারিত ও ঘনীভূত করে রোধজনিত ক্ষয় সত্ত্বেও ক্ষেত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
২. (alpha)-(Omega) ডায়নামো কৌশল ও টেইলর কলাম
কাউলিংয়ের উপপাদ্য অনুসারে সমতল ও সম্পূর্ণ বৃত্তাকার প্রবাহ কখনো একটি ত্রিমাত্রিক স্বতঃস্ফূর্ত চৌম্বক ক্ষেত্র টিকিয়ে রাখতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন দ্বি-পর্যায়ের (alpha)-(Omega) প্রক্রিয়া:
ক. (Omega)-প্রভাব (টোরয়ডাল শিয়ারিং)
বহিঃস্থ কোরের ডিফারেনশিয়াল ঘূর্ণন বিদ্যমান পোলোয়ডাল (উত্তর-দক্ষিণ) বলরেখাকে অক্ষ বরাবর টেনে প্যাঁচিয়ে ফেলে অত্যন্ত শক্তিশালী পূর্ব-পশ্চিমমুখী টোরয়ডাল ক্ষেত্রে ((mathbf{B}_{ ext{tor}})) রূপান্তর করে:
[
B_phi sim r sin heta , (mathbf{B}_{ ext{pol}} cdot
abla) Omega_{ ext{rot}}
]
খ. (alpha)-প্রভাব (হেলিক্যাল ঊর্ধ্বপ্রবাহ)
তাপীয় ও উপাদানী প্লবতার কারণে তপ্ত তরল ওপরের দিকে উঠতে চায়। পৃথিবীর তীব্র ঘূর্ণনের কারণে কোরিওলিস বল ((-২
ho boldsymbol{Omega} imes mathbf{u})) কনভেকশন প্রবাহকে ঘূর্ণন অক্ষের সমান্তরাল খাড়া সিলিন্ডারে বিন্যস্ত করে, যাকে টেইলর-প্রউডম্যান কলাম (Taylor Columns) বলা হয়। এই ঘূর্ণি উল্লম্ব ঊর্ধ্বপ্রবাহের সাথে যুক্ত হয়ে টোরয়ডাল চৌম্বক লুপকে মোচড় দিয়ে পুনরায় উত্তর-দক্ষিণ পোলোয়ডাল তলে ফিরিয়ে আনে:
[
mathcal{E} = langle mathbf{u}’ imes mathbf{B}’
angle = alpha mathbf{B}_০ – beta
abla imes mathbf{B}_০
]
এই চক্রাকার ফিডব্যাক লুপ কোটি কোটি বছর ধরে গ্রহীয় চৌম্বক ক্ষেত্রকে অক্ষুণ্ণ রাখে।
৩. কোর চালিকাশক্তি: তাপীয় বনাম উপাদানী প্লবতা
ভূ-ডায়নামোর সংবহন প্রবাহ দুটি প্রধান ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল:
- তাপীয় সংবহন (Thermal Convection): কোর-ম্যান্টল বাউন্ডারি দিয়ে ম্যান্টলে তাপ স্থানান্তর কোর রুদ্ধতাপীয় প্রবাহের ((১০ ext{–}১৫ ext{ টেরাওয়াট})) চেয়ে বেশি হতে হয়।
- উপাদানী সংবহন (Compositional Convection): পৃথিবী শীতল হওয়ার সাথে সাথে প্রতি বছর প্রায় ১ মিলিমিটার হারে তরল কোর জমাট বেঁধে কঠিন অভ্যন্তরীণ কোর তৈরি করে। বিশুদ্ধ লোহা ও নিকেল স্ফটিকায়িত হলে হালকা মৌলগুলো (সিলিকন, অক্সিজেন, সালফার) তরল বহিঃস্থ কোরে মুক্ত হয়। এই হালকা তরলের ঊর্ধ্বমুখী প্লবতা ডায়নামোর বর্তমান শক্তির প্রায় ৮০% জোগান দেয়।
৪. সেকুলার পরিবর্তন ও ভূ-চৌম্বকীয় মেরু বিপরীতকরণ
আগ্নেয় শিলার প্যালিওম্যাগনেটিক পরিমাপে দেখা যায় ভূ-চৌম্বক অক্ষ স্থির নয়; এটি ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে এবং গড়ে প্রতি ২ থেকে ৩ লাখ বছরে একবার সম্পূর্ণ উল্টে যায় (উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরুতে পরিণত হয়)। একে জিওম্যাগনেটিক রিভার্সাল (Polarity Reversal) বলা হয়। উল্টে যাওয়ার সময় কয়েক হাজার বছর ধরে দ্বিমেরু ক্ষেত্র ৮০-৯০% দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জটিল বহু-মেরু রূপ ধারণ করে, পরবর্তীতে বিপরীত মেরুকরণে নতুন দ্বিমেরু প্রতিষ্ঠিত হয়।