আগ্নেয় শিলা হলো পৃথিবীর ভূত্বকের আদি ভিত্তিপ্রস্তর। ম্যান্টল থেকে উৎপন্ন আদিম ব্যাসল্ট ম্যাগমা যখন ভূত্বকের ভেতরে অবস্থিত ম্যাগমা চেম্বারে (Magma Chambers) প্রবেশ করে, তখন তাপগতিবৈজ্ঞানিক নিয়মে শীতলীকরণ ও স্ফটিকায়নের মাধ্যমে আদিম অতি-ম্যাফিক ম্যাগমা থেকে বিভিন্ন মধ্যবর্তী ও ফেলসিক শিলার (অ্যান্ডেসাইট, ডেসাইট ও গ্রানাইট) উদ্ভব ঘটে। এই অবিচ্ছেদ্য রূপান্তরকে প্রথম সুসংহত রূপ দেন নরম্যান বোয়েন তাঁর বোয়েনের বিক্রিয়া সিরিজ (Bowen’s Reaction Series)-এ।
১. তাপগতিবৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও গিবসের ফেজ সূত্র
(C) সংখ্যক রাসায়নিক উপাদান এবং (P) সংখ্যক ফেজ (কঠিন স্ফটিক, তরল ম্যাগমা, গ্যাসীয় বাষ্প) সম্বলিত একটি ম্যাগমা চেম্বারে সাম্যাবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয় গিবসের ফেজ সূত্র (Gibbs Phase Rule) দ্বারা:
[
F = C – P + ২
]
এখানে (F) হলো স্বাধীন চলকের সংখ্যা (ডিগ্রিজ অব ফ্রিডম)। নির্দিষ্ট চাপে ((P = ext{const})):
[
F = C – P + ১
]
একটি দ্বি-উপাদান ইউটেকটিক সিস্টেমে (যেমন ডায়োপসাইড-অ্যানরথাইট) যখন ইউটেকটিক বিন্দুতে তরল ও উভয় কঠিন খনিজ একসাথে থাকে ((P = ৩)), তখন (F = ২ – ৩ + ১ = ০)। অর্থাৎ সিস্টেমটি ইনভ্যারিয়েন্ট; শেষ ফোঁটা তরল জমাট না বাঁধা পর্যন্ত তাপমাত্রা ও গলনের উপাদান একদম নির্দিষ্ট থাকে।
২. বোয়েনের বিক্রিয়া সিরিজ: বিচ্ছিন্ন ও অবিচ্ছিন্ন শাখা
১৯২৮ সালে বোয়েন গবেষণাগারে পরীক্ষা করে প্রমাণ করেন যে শীতল হতে থাকা ম্যাগমার সাথে পূর্বে গঠিত স্ফটিকের বিক্রিয়া ঘটে। এটি দুটি সমান্তরাল ধারায় বিভক্ত:
ক. বিচ্ছিন্ন বিক্রিয়া শাখা (Fe-Mg সিলিকেট)
তাপমাত্রা হ্রাসের সাথে সাথে প্রাথমিক স্ফটিকগুলো তরলের সাথে বিক্রিয়া করে সিলিকা পলিমারাইজেশন বাড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন খনিজ কাঠামো তৈরি করে:
- অলিভাইন (( ext{Mg,Fe})_2 ext{SiO}_4) ((sim ১২০০ ext{–}১৪০০^circ ext{C})): বিচ্ছিন্ন একক টেট্রাহেড্রা (([ ext{SiO}_4]^{৪-}))।
- পাইরক্সিন (( ext{Mg,Fe}) ext{SiO}_3) ((sim ১০৫০ ext{–}১২০০^circ ext{C})): একক শিকল টেট্রাহেড্রা (([ ext{Si}_2 ext{O}_6]^{৪-}))।
- অ্যাম্ফিবোল (হর্নব্লেন্ড) ((sim ৯০০ ext{–}১০৫০^circ ext{C})): দ্বৈত শিকল টেট্রাহেড্রা (([ ext{Si}_8 ext{O}_{22}]^{১২-}))।
- বায়োটাইট অভ্র ((sim ৭৫০ ext{–}৯০০^circ ext{C})): সমতল পাতলা শীট কাঠামো (([ ext{Si}_4 ext{O}_{10}]^{৪-}))।
খ. অবিচ্ছিন্ন বিক্রিয়া শাখা (প্লাজিওক্লেস ফেল্ডস্পার)
এখানে স্ফটিকের গাঠনিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল ক্যাটায়নের বিনিময় ঘটে:
[
ext{অ্যানরথাইট } ( ext{CaAl}_2 ext{Si}_2 ext{O}_8) xrightarrow{+ ext{Na}^+, ext{Si}^{4+} atop – ext{Ca}^{2+}, ext{Al}^{3+}} ext{অ্যালবাইট } ( ext{NaAlSi}_3 ext{O}_8)
]
উচ্চ তাপমাত্রায় ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ অ্যানরথাইট তৈরি হয়; ম্যাগমা ঠান্ডা হওয়ার সাথে সাথে স্ফটিক সোডিয়াম সমৃদ্ধ অ্যালবাইটে রূপান্তরিত হতে থাকে।
গ. অবশিষ্ট ইউটেকটিক স্ফটিকায়ন
উভয় শাখার শেষে অবশিষ্ট সিলিকা ও উদ্বায়ী গ্যাস সমৃদ্ধ তপ্ত তরল থেকে সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় ((sim ৬৫০ ext{–}৭৫০^circ ext{C})) স্ফটিকায়িত হয়: পটাশিয়াম ফেল্ডস্পার (অর্থোক্লেস) ( o) মাস্কোভাইট অভ্র ( o) কোয়ার্টজ (( ext{SiO}_2)), যা গ্রানাইট শিলার মূল উপাদান।
৩. ফ্র্যাকশনাল ক্রিস্টালাইজেশনের রেইলি ডিসটিলেশন মডেল
ম্যাগমা থেকে সৃষ্ট স্ফটিকগুলো যখন ভারী হয়ে নিচে থিতিয়ে পড়ে, তখন অবশিষ্ট তরলের সাথে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই অপরিবর্তনীয় প্রক্রিয়াটি রেইলি সমীকরণ (Rayleigh Distillation) মেনে চলে:
[
C_l = C_0 F^{(D – 1)}
]
এখানে (C_0) হলো প্রাথমিক ঘনত্ব, (F) হলো অবশিষ্ট তরলের ভগ্নাংশ এবং (D) হলো বাল্ক পার্টিশন সহগ ((D = sum w_i K_d)):
- কম্প্যাটিবল মৌল ((D gg ১), যেমন নিকেল, ক্রোমিয়াম): অলিভাইন স্ফটিকে দ্রুত আবদ্ধ হয়ে তরল থেকে নিঃশেষিত হয়।
- ইনকম্প্যাটিবল মৌল ((D ll ১), যেমন ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, রেয়ার আর্থ): স্ফটিক জালিকায় স্থান না পেয়ে অবশিষ্ট তরলে ক্রমাগত ঘনীভূত হতে থাকে ((C_l approx C_0 / F))।
৪. স্তরীভূত ম্যাফিক অনুপ্রবেশ: স্কারগার্ড কমপ্লেক্স
গ্রিনল্যান্ডের বিখ্যাত স্কারগার্ড অনুপ্রবেশ (Skaergaard Intrusion) হলো ফ্র্যাকশনাল ক্রিস্টালাইজেশনের প্রাকৃতিক পাঠ্যশালা। একটি বদ্ধ ম্যাগমা চেম্বারে কোটি কোটি টন অলিভাইন ও প্লাজিওক্লেস নিচে জমা হয়ে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত নিখুঁত স্তর তৈরি করেছে, যার চূড়ায় চরম লোহা সমৃদ্ধ ফায়ালাইট ও গ্র্যানোফায়ার কোয়ার্টজ সঞ্চিত রয়েছে।