নিওপ্রোটেরোজয়িক যুগে (প্রায় ৭২০ থেকে ৬৩৫ মিলিয়ন বছর আগে) পৃথিবী তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, যা স্নোবল আর্থ (Snowball Earth) নামে পরিচিত। মেরু থেকে শুরু করে বিষুবরেখা পর্যন্ত সমগ্র মহাসাগর এক থেকে দুই কিলোমিটার পুরু নিরেট বরফের চাদরে ঢেকে গিয়েছিল। এই চরম গ্রহীয় বরফযুগ এবং কোটি কোটি বছরের প্রাচীন জলবায়ুর পরিবর্তন পাঠোদ্ধার করতে বিজ্ঞানীরা অক্সিজেন আইসোটোপ ((delta^{১৮} ext{O})) এবং কার্বন আইসোটোপ ((delta^{১৩} ext{C}))-কে প্রাকৃতিক থার্মোমিটার ও ক্রায়োস্ফিয়ার সূচক হিসেবে ব্যবহার করেন।

১. আইস-অ্যালবেডো পজিটিভ ফিডব্যাক ও বুডিকো-সেলার্স অস্থিতিশীলতা

স্নোবল আর্থের সূচনা ঘটেছিল বরফ ও অ্যালবেডোর (প্রতিফলন ক্ষমতা) মারাত্মক ধনাত্মক ফিডব্যাকের মাধ্যমে। সাগরের তরল পানির অ্যালবেডো খুব কম ((alpha_{ ext{water}} approx ০.০৬)), অর্থাৎ এটি সূর্যের ৯০% এর বেশি তাপ শোষণ করে। বিপরীতে বরফের অ্যালবেডো অত্যন্ত উচ্চ ((alpha_{ ext{ice}} approx ০.৮০)), যা অধিকাংশ সৌররশ্মি মহাকাশে প্রতিফলিত করে দেয়।

বুডিকো ও সেলার্স (১৯৬৯) এর এনার্জি ব্যালেন্স মডেলে পৃথিবীর তাপীয় ভারসাম্য হলো:

[
rac{S_0}{4}(1 – alpha_p(phi_i)) = I(T) = A + B T
]

এখানে (phi_i) হলো বরফের বিস্তার অক্ষাংশ। রোডিনিয়া অতিমহাদেশ বিষুবীয় অঞ্চলে ভেঙে যাওয়ার ফলে তীব্র বৃষ্টিপাত ও সিলিকেট আবহবিকার বায়ুমণ্ডলের ( ext{CO}_2) দ্রুত কমিয়ে দেয়। ফলে পৃথিবী শীতল হয়ে বরফের চাদর মেরু থেকে বিষুবরেখার দিকে অগ্রসর হয়। বরফ যখন সংকট অক্ষাংশ ((phi_{ ext{crit}} approx ৩০^circ)) অতিক্রম করে, তখন অ্যালবেডো ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে:

[
left. rac{d}{dphi_i} left[ rac{S_0}{4}(1 – alpha_p) – I(T)
ight]
ight|_{phi_{ ext{crit}}} > ০
]

কয়েক শতাব্দীর মধ্যে সমগ্র পৃথিবী জমে বরফের গোলকে পরিণত হয় এবং গড় তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ৫০° সেলসিয়াসে।

২. বরফ গলার মেকানিক্স: আগ্নেয় সুপার-গ্রিনহাউস ও ক্যাপ কার্বোনেট

এই চিরস্থায়ী বরফপিণ্ড থেকে পৃথিবী কীভাবে মুক্তি পেল? সমুদ্র সম্পূর্ণ বরফে ঢেকে যাওয়ায় পানির বাষ্পীভবন ও বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, ফলে সিলিকেট আবহবিকার সম্পূর্ণ থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু ভূ-অভ্যন্তরের আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত ( ext{CO}_2) বায়ুমণ্ডলে জমা হতে থাকে।

প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি বছর ধরে বায়ুমণ্ডলে আগ্নেয় ( ext{CO}_2) জমতে জমতে বর্তমানের চেয়ে কয়েকশত গুণ ঘনত্বে পৌঁছায় ((p ext{CO}_2 approx ০.১ ext{–}০.২ ext{ bar}))। এই অতি-গ্রিনহাউস প্রভাব একপর্যায়ে বরফের অ্যালবেডোকে পরাস্ত করে পৃথিবীজুড়ে বিস্ফোরণের মতো বরফ গলিয়ে ফেলে।

বরফ গলে যাওয়ার পর তীব্র অম্লীয় বৃষ্টি ও চরম গরমে ((T > ৪০^circ ext{C})) শিলার অতি-দ্রুত আবহবিকার ঘটে। সাগরে বিপুল পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও বাইকার্বোনেট মিশ্রিত হয়ে হিমবাহের পলির ওপর সরাসরি অধঃক্ষিপ্ত করে শত শত ফুট পুরু চুনাপাথরের স্তর, যাকে ক্যাপ কার্বোনেট (Cap Carbonates) বলা হয়।

৩. কার্বন আইসোটোপ ((delta^{১৩} ext{C})) এবং জৈব বিপর্যয়

কার্বন আইসোটোপ অনুপাত ভিপিডিবি (VPDB) স্ট্যান্ডার্ডের সাপেক্ষে প্রতি হাজারে ((‰)) পরিমাপ করা হয়:

[
delta^{১৩} ext{C} = left( rac{(^{১৩} ext{C}/^{১২} ext{C})_{ ext{sample}}}{(^{১৩} ext{C}/^{১২} ext{C})_{ ext{VPDB}}} – ১
ight) imes ১০০০
]

উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের সময় হালকা ({}^{১২} ext{C}) গ্রহণ করায় স্বাভাবিক সাগরে (delta^{১৩} ext{C}) এর মান ধনাত্মক ((+১ ext{–}+৫‰)) থাকে। কিন্তু স্নোবল আর্থ পরবর্তী ক্যাপ কার্বোনেটে (delta^{১৩} ext{C}) একলাফে (-৫‰)-এ নেমে যায়। এটি প্রমাণ করে যে কোটি কোটি বছর বরফের নিচে সাগরের সালোকসংশ্লেষণ ও জৈব পাম্প সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল এবং ক্যাপ কার্বোনেটের কার্বন সরাসরি ম্যান্টলের আগ্নেয় গ্যাস থেকে এসেছিল।

৪. অক্সিজেন আইসোটোপ থার্মোমেট্রি ((delta^{১৮} ext{O}))

সাগরের ক্যালসাইটে ধারণকৃত অক্সিজেন আইসোটোপ হলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বরফের পরিমাণের সেরা স্কেল:

[
delta^{১৮} ext{O} = left( rac{(^{১৮} ext{O}/^{১৬} ext{O})_{ ext{sample}}}{(^{১৮} ext{O}/^{১৬} ext{O})_{ ext{V-SMOW}}} – ১
ight) imes ১০০০
]

হালকা পানির অণু (( ext{H}_2{}^{১৬} ext{O})) দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে মেরু অঞ্চলে বরফ হিসেবে জমা হয়, ফলে বরফযুগে সাগরের পানি ভারী ({}^{১৮} ext{O}) সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ক্যালসাইট গঠনের তাপমাত্রা নির্ভর সমীকরণ:

[
T(^circ ext{C}) = ১৬.৯ – ৪.৩৮(delta^{১৮} ext{O}_c – delta^{১৮} ext{O}_w) + ০.১০(delta^{১৮} ext{O}_c – delta^{১৮} ext{O}_w)^২
]

এই সমীকরণ ব্যবহার করেই আজ থেকে সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ডাইনোসর বিলুপ্তির পর থেকে বর্তমান কোয়াটারনারি হিমযুগ পর্যন্ত পৃথিবীর সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওঠানামা পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে।