১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে থাই বাতের ওপর একটি আকস্মিক আন্তর্জাতিক ফাটকাবাজি আক্রমণ “এশীয় অর্থনৈতিক মিরাকল”-এর অহংকার ধূলিসাৎ করে দেয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই মুদ্রার ধস দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে। ইতিহাসে এটি ১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট (Asian Financial Crisis) নামে কুখ্যাত। অবাধ আন্তর্জাতিক পুঁজি চলাচলের মধ্যে ডলারের সাথে কৃত্রিমভাবে মুদ্রা পেগ করে রাখার মারাত্মক পরিণতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই বিপর্যয়। এই সংকট থেকেই জন্ম নেয় আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জমানো এবং দ্বিপাক্ষিক কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থার সংস্কৃতি।

মুন্ডেল-ফ্লেমিং ট্রাইলেমা: অর্থনীতির অসম্ভব ত্রয়ী

১৯৯৭ সালের সংকটের মূলে ছিল নোবেলজয়ী রবার্ট মুন্ডেল ও মার্কাস ফ্লেমিংয়ের বিখ্যাত উন্মুক্ত সামষ্টিক অর্থনীতির উপপাদ্য: ইম্পসিবল ট্রিনিটি (The Impossible Trinity) বা অর্থনীতির অসম্ভব ত্রয়ী। এই তত্ত্বানুসারে, কোনো স্বাধীন দেশ একসাথে নিচের তিনটি অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে না:

  1. স্থির মুদ্রা বিনিময় হার (Fixed Exchange Rate): আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মুদ্রার অস্থিরতা দূর করা।
  2. মুক্ত মূলধনী হিসাব (Free Capital Mobility): পুঁজির অবাধ বহির্গমন ও আগমনের স্বাধীনতা।
  3. স্বাধীন অভ্যন্তরীণ মুদ্রানীতি (Sovereign Monetary Policy): দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার ইচ্ছামতো নির্ধারণের স্বাধীনতা।
[text{Target Count} le 2 quad text{from} quad {text{Fixed FX}, text{Open Capital Account}, text{Autonomous Rate}}]

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে “এশিয়ান টাইগার” দেশগুলো দ্রুত শিল্পায়নে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিদেশি সস্তা ঋণ আকৃষ্ট করতে তারা জাতীয় মুদ্রাকে মার্কিন ডলারের সাথে নির্দিষ্ট হারে বেঁধে রাখে এবং মূলধনী বাজার উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে স্থানীয় ব্যাংক ও শিল্পগোষ্ঠীগুলো মাত্র ৪% সুদে স্বল্পমেয়াদী ডলার ঋণ এনে তা ১২% স্থানীয় মুনাফার দীর্ঘমেয়াদী রিয়েল এস্টেট ও কারখানায় বিনিয়োগ করতে শুরু করে। তৈরি হয় চরম ‘কারেন্সি ও ম্যাচিউরিটি মিসম্যাচ’।

জর্জ সোরোস এবং থাই বাতের ওপর স্পেকুলেটিভ অ্যাটাক

১৯৯০-এর মাঝামাঝি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি থামাতে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে শুরু করলে বৈশ্বিক বাজারে ডলার শক্তিশালী হয়। ডলারের সাথে পেগ থাকার কারণে থাইল্যান্ড, কোরিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার তৈরি পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যায় এবং জাপানি ও চীনা পণ্যের কাছে তাদের রপ্তানি মার খেতে থাকে। দেশগুলোর চলতি হিসাবের ঘাটতি (Current Account Deficit) বিপজ্জনক রূপ নেয়।

জর্জ সোরোসের কোয়ান্টাম ফান্ড এবং অন্যান্য গ্লোবাল ম্যাক্রো হেজ ফান্ডগুলো বুঝতে পারে যে থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলারের বিপরীতে ২৫ বাতের পেগ ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত আসল রিজার্ভ নেই। তারা ব্যাংক থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন বাত ঋণ নিয়ে তা ফিউচার মার্কেটে ডলারের বিপরীতে বিক্রি (Short Sell) করতে শুরু করে:

[text{Speculative Profit} = Delta text{FX} cdot V_{text{short}} – text{Carry Costs}]

বিনিময় হার রক্ষা করতে থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভল্টের প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার পুড়িয়ে ফেলে। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ জুলাই তাদের রিজার্ভ নিঃশেষ হয়ে গেলে তারা বাতকে বাজারে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হয়। বাত এক রাতের মধ্যে ৫০%-এর বেশি অবমূল্যায়িত হয়। আতঙ্কিত বিদেশি ঋণদাতারা স্বল্পমেয়াদী ঋণ নবায়ন বন্ধ করে দিলে গোটা অঞ্চলে দেউলিয়াত্বের মহোৎসব শুরু হয়।

আইএমএফের তিক্ত প্রেসক্রিপশন ও সামাজিক বিস্ফোরণ

সার্বভৌম দেউলিয়াত্ব এড়াতে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছ থেকে ১১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরুরি ঋণ গ্রহণ করে। কিন্তু আইএমএফ এর বিনিময়ে যে কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেয়, তা ছিল মারাত্মক সংকোচনমূলক:

  • বিনিময় হার রক্ষা করার নামে সুদের হার একলাফে ৩০%-এর উপরে তুলে দেওয়া।
  • সরকারি ব্যয় ও কল্যাণমূলক খাতে চরম কাটছাঁট এবং খাদ্য ও জ্বালানি ভর্তুকি বাতিল।
  • স্থানীয় ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া এবং দেউলিয়া স্থানীয় সম্পদ বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির কাছে পানির দরে বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া।

এই শর্তগুলো সংকট কমানোর বদলে সুস্থ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও দেউলিয়া করে দেয়। ইন্দোনেশিয়ায় রুপিয়ার মান ৮৫% ধসে পড়ে, যার ফলে দেশজুড়ে খাদ্য দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ ৩২ বছরের স্বৈরশাসক জেনারেল সুহার্তোর পতন ঘটে। দক্ষিণ কোরিয়ায় সাধারণ নাগরিকরা রাস্তায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের গলার সোনার চেইন ও বিয়ের আংটি সরকারের ভল্টে জমা দেন জাতীয় ঋণ পরিশোধের জন্য।

সংকটের শিক্ষা: রিজার্ভের দুর্গ ও কারেন্সি সোয়াপ লাইন

১৯৯৭ সালের অভিজ্ঞতা বিশ্ব অর্থনৈতিক ভূরাজনীতিকে চিরতরে বদলে দেয়। আইএমএফের অপমানজনক হস্তক্ষেপের তিক্ত স্বাদ পাওয়ার পর এশিয়ার প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিজ্ঞা করে যে তারা আর কখনোই ডলার সংকটে পড়বে না। এরপরের দশকে এশিয়ার দেশগুলো আক্রমণাত্মক বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করে নিজেদের মুদ্রাকে কিছুটা অবমূল্যায়িত রেখে পণ্য রপ্তানি করে ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক রিজার্ভ গড়ে তোলে, যার সিংহভাগ বিনিয়োগ করা হয় মার্কিন সরকারি ট্রেজারি বন্ডে।

পাশাপাশি গড়ে তোলা হয় নিজস্ব আর্থিক প্রতিরক্ষা বলয়। ২০০০ সালের মে মাসে আসিয়ান দেশগুলো এবং চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলে স্বাক্ষর করে ঐতিহাসিক চিয়াং মাই ইনিশিয়েটিভ (Chiang Mai Initiative)। এর অধীনে তৈরি হয় বহুপাক্ষিক কারেন্সি সোয়াপ নেটওয়ার্ক, যাতে যেকোনো সংকটকালে সদস্য দেশগুলো পশ্চিমাদের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যে স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় করে তারল্য সংকট মোকাবেলা করতে পারে।

দেশ সংকট-পূর্ব বিনিময় হার সর্বোচ্চ মুদ্রা পতন আইএমএফ বেইলআউট সংকট-উত্তর রূপান্তর
থাইল্যান্ড ~২৫ বাত / ডলার -৫৪% (৫৬ বাত / ডলার) $১৭.২ বিলিয়ন ভাসমান বিনিময় হার, বিশাল রিজার্ভ সঞ্চয়
ইন্দোনেশিয়া ~২,৪০০ রুপিয়া / ডলার -৮৫% (১৬,০০০ রুপিয়া / ডলার) $৪২.৩ বিলিয়ন রাজনৈতিক বিপ্লব, সুহার্তো পতন, ব্যাংকিং সংস্কার
দক্ষিণ কোরিয়া ~৮৫০ ওন / ডলার -৫২% (১,৯৬০ ওন / ডলার) $৫৮.৪ বিলিয়ন চেবল সংস্কার, নাগরিকদের স্বর্ণদান অভিযান
মালয়েশিয়া ~২.৫ রিঙ্গিত / ডলার -৫০% (৪.৮ রিঙ্গিত / ডলার) প্রত্যাখ্যাত ($০) ক্যাপিটাল কন্ট্রোল আরোপ (মাহাথির মোহাম্মদ)

১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট প্রমাণ করে যে অনিয়ন্ত্রিত ফিয়াট মুদ্রার বিশ্বে ক্ষণিকের আস্থার অভাবে কয়েক দশকের তিল তিল করে গড়া সমৃদ্ধি মুহূর্তের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে যেতে পারে। এটি জন্ম দিয়েছিল বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষাকবচ: জাতীয় রিজার্ভ প্রাচীর।