১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লবের (Glorious Revolution) পর যখন ডাচ শাসক উইলিয়াম অব অরেঞ্জ এবং তাঁর স্ত্রী মেরি ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন, তখন ইংল্যান্ড ফ্রান্সের পরাক্রমশালী রাজা চতুর্দশ লুইয়ের বিরুদ্ধে এক ব্যয়বহুল দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইংরেজ রাজকোষ ছিল সম্পূর্ণ শূন্য। পূর্বে রাজারা যেভাবে জোরপূর্বক ঋণ নিয়ে বা জমি বন্ধক রেখে যুদ্ধ চালাতেন, সেই প্রথা ভেঙে পড়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে ইংরেজ রাজাদের ঋণের信用 এতই বাজে ছিল যে লন্ডনের স্বর্ণকার ও বিদেশি ব্যাংকাররা ১২% থেকে ১৪% সুদের নিচে রাজাকে এক পয়সাও ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল।
১৬৯৪ সালে স্কটিশ বণিক উইলিয়াম প্যাটারসন এবং চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার চার্লস মন্টাগু রাষ্ট্রের সাথে ধনী ব্যবসায়ীদের এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অংশীদারিত্বের প্রস্তাব করেন। সেই চুক্তির মাধ্যমেই জন্ম নেয় ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড (Bank of England)। থ্রেডনিডল স্ট্রিটের এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর অর্থায়নই করেনি; তা জন্ম দিয়েছিল ইউরোপের আর্থিক বিপ্লবের (Financial Revolution)—যার মাধ্যমে আবির্ভূত হয়েছিল সংসদীয় জাতীয় ঋণ (National Debt) এবং আধুনিক কাগজের ব্যাংকনোট ব্যবস্থা।
১৬৯৪ সালের মহাচুক্তি: ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের প্রতিষ্ঠা
ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের প্রতিষ্ঠা ছিল মূলত ঋণকে ইকুইটিতে রূপান্তরের এক অভূতপূর্ব মডেল। লন্ডনের একদল ধনী ব্যবসায়ী মাত্র দশ দিনের মধ্যে ১২ লক্ষ পাউন্ড নগদ সোনা ও রূপা সংগ্রহ করে রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের সরকারের হাতে তুলে দেন। এর বিপরীতে সরকার তাদের বাৎসরিক ৮% হারে নিশ্চিত সুদ (বছরে ৯৬,০০০ পাউন্ড) এবং বার্ষিক ৪,০০০ পাউন্ড পরিচালনা ফি দেওয়ার অঙ্গীকার করে।
এই মহামূল্যবান ঋণের বিনিময়ে ব্রিটিশ রাজমুকুট এই বণিক সংস্থাকে অদ্বিতীয় কিছু সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার প্রদান করে:
- যৌথ মূলধনী সনদ: ঋণদাতারা আইনগতভাবে দ্য গভর্নর অ্যান্ড কোম্পানি অব দ্য ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড নামে চিরস্থায়ী যৌথ মূলধনী ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
- ব্যাংকনোট ইস্যুর একচ্ছত্র অধিকার: ইংল্যান্ডের একমাত্র ব্যাংক হিসেবে তাদের কাগজের ব্যাংকনোট ছাপানোর অধিকার দেওয়া হয়, যা বাজারে আনুষ্ঠানিক অর্থ হিসেবে গৃহীত হতে শুরু করে।
- রাষ্ট্রের একক ব্যাংকার: সরকারের সমস্ত রাজস্ব জমা রাখা এবং জাতীয় ঋণের কিস্তি পরিশোধের একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হয়ে ওঠে এই ব্যাংক।
এটি ছিল আধুনিক অর্থায়িত জাতীয় ঋণের (Funded National Debt) জন্ম। ১৬৯৪ সালের আগে রাজাদের ঋণ ছিল রাজার ব্যক্তিগত দেনা; রাজা মারা গেলে বা সিংহাসনচ্যুত হলে সেই ঋণ তামাদি হয়ে যেত। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় ঋণ হয়ে দাঁড়াল সমগ্র রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা—যার নিশ্চয়তা দিত ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং যার সুদ পরিশোধের জন্য মদ, লবণ ও আমদানিকৃত পণ্যের ওপর স্থায়ী রাষ্ট্রীয় শুল্ক ধার্য করা হতো। পার্লামেন্টের এই আইনসম্মত গ্যারান্টির কারণে ব্রিটেনের সার্বভৌম বন্ড (যা পরবর্তীতে কনসোলস [Consols] নামে পরিচিত হয়) অত্যন্ত বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে এবং ব্রিটেন মাত্র ৩% থেকে ৪% স্বল্প সুদে বিশ্ববাজার থেকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধঋণ সংগ্রহের ক্ষমতা অর্জন করে—যা পরম পরাক্রমশালী ফ্রান্সের রাজারাও কল্পনা করতে পারত না।
সাউথ সি কোম্পানি ও ঋণের শেয়ার রূপান্তর (১৭১৯–১৭২০)
১৭১৯ সাল নাগাদ স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধের কারণে ব্রিটেনের জাতীয় ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি পাউন্ডে। এই ঋণের একটি বড় অংশ ছিল ৯৯ বছর মেয়াদী অ্যানুইটি ঋণ—যা চাইলেও সরকার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এককালীন শোধ করতে পারত না এবং সরকারকে প্রতি বছর চড়া সুদ গুনতে হচ্ছিল।
এই সংকট কাটাতে দৃশ্যপটে হাজির হয় ১৭১১ সালে প্রতিষ্ঠিত সাউথ সি কোম্পানি (South Sea Company)। কাগজে-কলমে এই কোম্পানিটি দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশ উপনিবেশে বাণিজ্য ও দাস ব্যবসার একচ্ছত্র অধিকারপ্রাপ্ত ছিল; কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি ছায়া আর্থিক প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান। ১৭১৯ সালের শেষের দিকে কোম্পানির চতুর পরিচালক জন ব্লান্ট এক দুঃসাহসিক প্রস্তাব দেন: সাউথ সি কোম্পানি ব্রিটিশ সরকারের ৩ কোটি ১০ লক্ষ পাউন্ডের জাতীয় ঋণ নিজের কাঁধে তুলে নেবে—এবং সেই ঋণের বন্ডহোল্ডারদের সরকারের ঋণের কাগজের বদলে সাউথ সি কোম্পানির স্টক শেয়ার দিয়ে দেবে।
এই ফন্দির পেছনে কাজ করছিল এক মারাত্মক পঞ্জি স্কিমের মতো চাতুর্য:
- কোম্পানি বন্ডহোল্ডারদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো শেয়ারের সংখ্যা বেঁধে দেয়নি; বরং বলা হয়েছিল, বাজারে সাউথ সি শেয়ারের দাম যখন যা থাকবে, সেই অনুযায়ী সরকারি বন্ডের সমমূল্যের শেয়ার দেওয়া হবে।
- অতএব, বাজারে সাউথ সি শেয়ারের দাম যত বেশি উঠবে, সরকারি ঋণ শোধ করতে কোম্পানিকে তত কম শেয়ার ছাড়তে হবে।
- আর বাকি অতিরিক্ত শেয়ার বাজারে সাধারণ মানুষের কাছে আকাশচুম্বী দামে বিক্রি করে পরিচালকরা হাজার হাজার কোটি পাউন্ড নগদ মুনাফা হাতিয়ে নিতে পারবেন!
| তারিখ ও সময়কাল (১৭২০) | সাউথ সি শেয়ারের বাজারমূল্য | ফাটকাবাজির ঘটনাপ্রবাহ ও অনুঘটক |
|---|---|---|
| জানুয়ারি ১৭২০ | ১২৮ পাউন্ড | পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন; এমপি ও মন্ত্রীদের লাখ লাখ টাকার গোপন শেয়ার ঘুষ। |
| এপ্রিল ১৭২০ | ৩৩০ পাউন্ড | সাউথ সি আইন পাস; মাত্র ২০% ডাউনপেমেন্টে কিস্তিতে শেয়ার কেনার সুযোগ। |
| মে ১৭২০ | ৫৫০ পাউন্ড | রাজা প্রথম জর্জ ও রাজদরবারের বিনিয়োগ; কফি হাউসে উন্মাদনার বিস্তার। |
| জুন ১৭২০ | ৮৯০ পাউন্ড | প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি বন্ধ করতে পার্লামেন্টে কঠোর বাবল অ্যাক্ট পাস। |
| আগস্ট ১৭২০ | ১,০০০ পাউন্ড | উন্মাদনার চূড়ান্ত শিখর; ভেতরের পরিচালকরা গোপনে নিজেদের শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। |
| সেপ্টেম্বর ১৭২০ | ৪০০ পাউন্ড | তারল্য সংকট; বাজারে ক্রেতার অভাব; এক্সচেঞ্জ অ্যালিতে তীব্র আতঙ্ক ও ধস। |
| ডিসেম্বর ১৭২০ | ১২৪ পাউন্ড | সম্পূর্ণ বাজার ধস; সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠন; পরিচালকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। |
গণউন্মাদনা: এক্সচেঞ্জ অ্যালি ও কাল্পনিক বাবল কোম্পানি
১৭২০ সালের বসন্ত ও গ্রীষ্মে লন্ডনের এক্সচেঞ্জ অ্যালির কফি হাউসগুলোতে (যেমন গ্যারাওয়েজ ও জোনাথানস) এক নজিরবিহীন ফাটকাবাজির উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। লর্ড, বিশপ, সাধারণ গৃহপরিচারিকা, কবি ও সরকারি মন্ত্রীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাগলের মতো সাউথ সি শেয়ার কিনতে থাকেন।
সাউথ সি শেয়ারের দামের পাগলা ঘোড়ায় চড়ে রাতারাতি গজিয়ে ওঠে শত শত ভূঁইফোড় “বাবল কোম্পানি”। স্পেন থেকে গাধা আমদানি করা, ভাসমান প্রাসাদ নির্মাণ, পারদকে নরম সোনায় রূপান্তর থেকে শুরু করে ব্যঙ্গাত্মক এক লিফলেটে ঘোষিত হয়: “এমন এক কোম্পানি যার উদ্দেশ্য অত্যন্ত লাভজনক, কিন্তু তা কী তা কাউকে জানানো হবে না!”—যার প্রবর্তক এক সকালে পাঁচ হাজার পাউন্ড জমা নিয়ে সেদিন দুপুরেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান!
এমনকি মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনও এই লোভের ঘূর্ণাবর্তে পা দিয়েছিলেন। রয়্যাল মিন্টের প্রধান হিসেবে নিউটন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ১৭২০ সালের এপ্রিলে সাউথ সি শেয়ার বিক্রি করে ৭,০০০ পাউন্ডের এক চমৎকার মুনাফা ঘরে তুলেছিলেন। কিন্তু গ্রীষ্মকালে যখন দেখলেন তাঁর চোখের সামনে মূর্খ প্রতিবেশীরা রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছে, তখন তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না (FOMO – Fear of Missing Out)। আগস্ট মাসে শেয়ারের দাম যখন ১,০০০ পাউন্ডের চূড়ায়, তখন নিউটন জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে আবার শেয়ার কেনেন। কয়েক সপ্তাহ পর বাজার যখন ধসে পড়ল, নিউটন হারালেন ২০,০০০ পাউন্ড (আজকের মূল্যে যা প্রায় কয়েক কোটি পাউন্ডের সমান)। সর্বস্বান্ত হয়ে ক্ষোভে-দুঃখে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন সেই অমর বাণী:
“আমি গ্রহ-নক্ষত্রের মহাজাগতিক গতি নির্ভুলভাবে গণনা করতে পারি, কিন্তু মানুষের উন্মাদনা গণনা করার ক্ষমতা আমার নেই।”
— সাউথ সি বাবল ধস নিয়ে স্যার আইজ্যাক নিউটনের খেদোক্তি (১৭২০)
ধ্বংসের পরবর্তী পরিণতি: বাবল অ্যাক্ট ও রবার্ট ওয়ালপোলের উত্থান
১৭২০ সালের আগস্টের শেষে এসে এই কৃত্রিম পিরামিড স্কিমের আসল রূপ বেরিয়ে পড়ল। আমস্টারডাম ও প্যারিসের বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে শুরু করলেন। কোম্পানি যখন চতুর্থ কিস্তির টাকা দাবি করল, তখন দেখা গেল বাজারে শেয়ার কেনার মতো কোনো নগদ অর্থ অবশিষ্ট নেই। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো বিক্রির মহাহুলুস্থুল। মাত্র চার মাসের মধ্যে ১,০০০ পাউন্ডের শেয়ার আছড়ে পড়ে ১২৪ পাউন্ডে নেমে এল।
এই ধস ব্রিটিশ সরকারকে কাঁপিয়ে দিল। পার্লামেন্টের গোপন তদন্তে বেরিয়ে এল যে খোদ চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার জন আইসলাবি এবং স্বয়ং রাজা প্রথম জর্জের রক্ষিতাদের লাখ লাখ টাকার ভুয়া শেয়ার ঘুষ দিয়ে এই আইন পাস করানো হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী আইসলাবিকে বরখাস্ত করে লন্ডনের টাওয়ারে বন্দি করা হলো এবং পরিচালকদের সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মাঝে বিতরণ করা হলো।
এই চরম রাজনৈতিক সংকট থেকে ব্রিটেনকে উদ্ধার করেন বিচক্ষণ রাজনীতিক রবার্ট ওয়ালপোল। তিনি সাউথ সি কোম্পানির ঋণের বোঝা ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে ভাগ করে দিয়ে অর্থনীতিকে রক্ষা করেন। এই সাফল্যের ফলেই ওয়ালপোল ব্রিটেনের প্রথম প্রকৃত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় পার্লামেন্টের একচ্ছত্র প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ভবিষ্যতে এই ধরনের ফাটকাবাজি ঠেকাতে পার্লামেন্ট বাবল অ্যাক্ট (১৭২০) পাস করে, যার মাধ্যমে রাজকীয় সনদ ছাড়া যে কোনো যৌথ মূলধনী কোম্পানি গঠন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়—যা পরবর্তী এক শতাব্দীরও বেশি সময় (১৮২৫ সাল পর্যন্ত) কার্যকর ছিল।
উপসংহার: আধুনিক ঋণের ভিত্তিপ্রস্তর
সাউথ সি বাবল ছিল আধুনিক পুঁজিবাদের এক বেদনাদায়ক শৈশব। এটি বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে অনিয়ন্ত্রিত যৌথ মূলধনী শেয়ার এবং চতুর ফাটকাবাজির সাথে রাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ জড়িয়ে ফেললে তা কী ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কিন্তু সাউথ সি কোম্পানি ধ্বংস হলেও ১৬৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড এবং সংসদীয় জাতীয় ঋণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অক্ষত থেকে যায়। আর এই স্বল্প সুদের নির্ভরযোগ্য জাতীয় ঋণ ব্যবস্থার শক্তিতেই পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে ব্রিটেন নেপোলিয়নকে পরাজিত করেছিল এবং গোটা বিশ্বে শিল্প বিপ্লবের বিস্তার ঘটিয়েছিল।