১৯১০ সালের শেষ শরতে নিউ জার্সির হোবোকেন ট্রেন স্টেশন থেকে পর্দা নামানো একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত রেলওয়ে কার নিঃশব্দে দক্ষিণের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ট্রেনের ছয়জন যাত্রীকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল: তারা কখনো একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসবেন না, জানালার পর্দা সরাবেন না এবং একে অপরকে পদবী ছাড়া কেবল ছদ্মনামে বা প্রথম নামে ডাকবেন: নেলসন, পল, ফ্র্যাঙ্ক, পিয়াট, হেনরি এবং বেঞ্জামিন। তাদের গোপন গন্তব্য ছিল জর্জিয়া উপকূলের নির্জন ও সুরক্ষিত জেকিল আইল্যান্ড ক্লাব (Jekyll Island Club)—যেখানে শীতকালে আমেরিকার শীর্ষ ধনকুবের ভ্যান্ডারবিল্ট, মর্গান, রকফেলার ও অ্যাস্টররা অবকাশ যাপন করতেন। সেই ক্লাবের নিভৃত ফায়ারপ্লেসের চারপাশে সমবেত হওয়া এই ছয়জন ব্যক্তি সমগ্র পৃথিবীর মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের নিয়ন্ত্রণ করতেন।

টানা নয় দিন ধরে চলা চরম গোপন সেই শলাপরামর্শেই রচিত হয়েছিল আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল নকশা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম (Federal Reserve System)। তিন বছর পর, ১৯১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন যখন এই ফেডারেল রিজার্ভ আইনে স্বাক্ষর করেন, তখন সমাপ্তি ঘটেছিল প্রায় আট দশকের এমন এক বিশৃঙ্খল যুগের—যে সময়টিতে পৃথিবীর উদীয়মান শীর্ষ শিল্প পরাশক্তি আমেরিকা কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়াই একটি অচল ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থব্যবস্থা নিয়ে টিকে ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি আমেরিকার ঐতিহাসিক ঘৃণা

কেন ফেডারেল রিজার্ভ তৈরির পরিকল্পনা এত নাটকীয় গোপনীয়তায় করতে হয়েছিল, তা বুঝতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর ও ঐতিহাসিক ক্ষোভ বোঝা প্রয়োজন। আমেরিকান বিপ্লবের শুরু থেকেই দেশটি দুটি বিপরীতমুখী দর্শনে বিভক্ত ছিল:

  • আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের কেন্দ্রীয় দর্শন: হ্যামিল্টন একটি শক্তিশালী জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (প্রথম ব্যাংক অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, ১৭৯১) পক্ষে ছিলেন, যা কর আদায় ও বাণিজ্য প্রসারে সহায়তা করবে।
  • টমাস জেফারসনের কৃষিভিত্তিক দর্শন: জেফারসন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলো পুঁজিপতি ও ব্রিটিশ ব্যাংকারদের স্বার্থরক্ষার এক অসাংবিধানিক দানব, যা সাধারণ কৃষককে ঋণের দাসে পরিণত করবে। তিনি বলেছিলেন: “একটি জাতীয় ব্যাংক শত্রুর দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনীর চেয়েও বিপজ্জনক।”

১৮৩২ সালে জনপ্রিয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসন তাঁর বিখ্যাত “ব্যাংক যুদ্ধ” শুরু করেন। তিনি দ্বিতীয় ব্যাংক অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের মেয়াদ নবায়ন সংক্রান্ত বিলে ভেটো দেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিরতরে ধ্বংস করে মৃত্যুশয্যায় গর্ব করে বলেছিলেন: “আমি ওই ব্যাংকটাকে হত্যা করেছি।” ফলস্বরূপ, পরবর্তী পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা ছিল পৃথিবীর একমাত্র শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশ যার কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল না।

এর পরিণতি ছিল ইতিহাসের কুখ্যাত ওয়াইল্ডক্যাট ব্যাংকিং যুগ (Wildcat Banking Era)। দেশের আট হাজারেরও বেশি বেসরকারি ব্যাংক নিজেদের ইচ্ছেমতো কাগজের নোট ছাপাত; জাল টাকায় বাজার সয়লাব ছিল; এবং সবচেয়ে বড় সংকট ছিল মুদ্রার স্থিতিস্থাপকতার অভাব (Inelasticity of Currency)। প্রতি বছর হেমন্তকালে যখন গম ও ভুট্টা তোলার জন্য মধ্য-পশ্চিমের কৃষকদের কোটি কোটি নগদ টাকার প্রয়োজন হতো, তখন নিউ ইয়র্কের ব্যাংকগুলো থেকে টাকা উধাও হয়ে যেত, সুদের হার আকাশচুম্বী হতো এবং দেশজুড়ে একের পর এক ব্যাংক ধস নামত।

চূড়ান্ত অনুঘটক: ১৯০৭ সালের মহামন্দা ও জে.পি. মর্গান

এই অসহনীয় ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৯০৭ সালের অক্টোবরে। দুই তামার ব্যবসায়ীর শেয়ার ফাটকাবাজি ব্যর্থ হওয়ার পর নিউ ইয়র্কের তৃতীয় বৃহত্তম ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠান নিকারবকার ট্রাস্ট কোম্পানি (Knickerbocker Trust)-র ওপর বিধ্বংসী ব্যাংক রান শুরু হয়। ২২ অক্টোবর যখন নিকারবকার তাদের দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন ওয়াল স্ট্রিট জুড়ে অন্ধ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শেয়ার বাজারে ঋণের সুদের হার এক রাতের মধ্যে লাফিয়ে ১২৫%-এ পৌঁছায় এবং ডজন ডজন আঞ্চলিক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়।

সে সময় কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক না থাকায় সমগ্র আমেরিকান অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন একজন সত্তর বছর বয়সী বেসরকারি বৃদ্ধ: জন পিয়ারপন্ট মর্গান (J.P. Morgan)।

ম্যাডিসন অ্যাভিনিউতে অবস্থিত তাঁর ব্যক্তিগত রাজকীয় লাইব্রেরিতে বসে জে.পি. মর্গান একা এক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিউ ইয়র্কের শীর্ষ সমস্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধানদের ডেকে এনে লাইব্রেরির দরজায় তালা মারেন এবং পকেটে চাবি পুরে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে সম্মিলিতভাবে ২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলারের জরুরি তহবিল ছাড়তে রাজি না হবেন, ততক্ষণ কাউকে বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। মর্গান তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে নিউ ইয়র্ক নগরীকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন।

জে.পি. মর্গানের এই বীরোচিত উদ্ধার অভিযান দেশকে বাঁচালেও গোটা আমেরিকার রাজনৈতিক মহল এক মারাত্মক সত্য উপলব্ধি করল: নয় কোটি মানুষের একটি পরাশক্তি দেশ তার অর্থনীতির বেঁচে থাকার জন্য একজন বয়োবৃদ্ধ বেসরকারি পুঁজিপতির ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পারে না। সংস্কার তখন আর বিলাসিতা ছিল না; তা ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন।

জেকিল আইল্যান্ডের গোপন সভা (নভেম্বর ১৯১০)

১৯০৮ সালে কংগ্রেসের সিনেটর নেলসন ডব্লিউ অলড্রিচ (যাঁর মেয়ের সাথে জন ডি. রকফেলার জুনিয়রের বিয়ে হয়েছিল)-এর নেতৃত্বে জাতীয় মুদ্রা কমিশন গঠন করা হয়। ইউরোপের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পরিদর্শন করার পর অলড্রিচ ১৯১০ সালের নভেম্বরে জেকিল আইল্যান্ডের সেই ঐতিহাসিক গোপন বৈঠকের আয়োজন করেন।

জেকিল আইল্যান্ডের অংশগ্রহণকারী প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও পটভূমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নকশায় প্রধান অবদান
নেলসন ডব্লিউ অলড্রিচ মার্কিন সিনেটর; মুদ্রা কমিশনের চেয়ারম্যান রাজনৈতিক স্থপতি; ক্যাপিটল হিল ও ওয়াল স্ট্রিটের মধ্যকার সেতুবন্ধন।
পল এম. ওয়ারবার্গ কুহন, লোয়েব অ্যান্ড কোং-এর অংশীদার; জার্মান বংশোদ্ভূত ব্যাংকার তাত্ত্বিক স্থপতি; ইউরোপীয় ধাঁচের ডিসকাউন্টিং ব্যবস্থার রূপকার।
ফ্র্যাঙ্ক এ. ভ্যান্ডারলিপ ন্যাশনাল সিটি ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কের প্রেসিডেন্ট (রকফেলার গোষ্ঠী) বাণিজ্যিক ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা; কমার্শিয়াল পেপার ছাড়ার মানদণ্ড তৈরি।
হেনরি পি. ডেভিসন জে.পি. মর্গান অ্যান্ড কোম্পানির সিনিয়র পার্টনার মর্গান সাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষা ও ক্লিয়ারিং হাউস অবকাঠামোর সমন্বয়।
বেঞ্জামিন স্ট্রং জুনিয়র ব্যাংকার্স ট্রাস্ট কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট পরিচালন প্রতিভা; পরবর্তীতে নিউ ইয়র্ক ফেডের প্রথম প্রভাবশালী গভর্নর।
এ. পিয়াট অ্যান্ড্রু মার্কিন অর্থ দপ্তরের সহকারী সচিব; হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ সরকারি যোগাযোগ; বাজেট নীতির সাথে মুদ্রানীতির সমন্বয়।

ওয়ারবার্গ ও অলড্রিচের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। সাধারণ আমেরিকান জনতা এবং উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ানের মতো কৃষকপন্থী রাজনীতিকরা কখনোই ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিট নিয়ন্ত্রিত একটিমাত্র একক “কেন্দ্রীয় ব্যাংক”-এর প্রস্তাব মেনে নেবে না। তাই ওয়ারবার্গ এক চতুর কৌশল উদ্ভাবন করলেন: তিনি একক ব্যাংকের বদলে একটি বিকেন্দ্রীভূত আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যবস্থার প্রস্তাব করলেন।

উড্রো উইলসন এবং ১৯১৩ সালের আপস

১৯১২ সালে ডেমোক্র্যাট নেতা উড্রো উইলসন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অলড্রিচ প্ল্যানকে কংগ্রেসের কার্টার গ্লাস এবং রবার্ট ওয়েন কিছুটা পরিমার্জন করেন। উইলসন একটি মৌলিক সাংবিধানিক শর্ত জুড়ে দেন: কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদ কোনো বেসরকারি ব্যাংকারদের সমিতি হতে পারবে না; তা হতে হবে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত এবং সিনেট কর্তৃক অনুমোদিত শতভাগ সরকারি সংস্থা।

১৯১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর তীব্র বিতর্কের পর কংগ্রেসের উভয় কক্ষে পাস হয়ে প্রেসিডেন্ট উইলসনের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হয় ফেডারেল রিজার্ভ আইন। এই আইনের মাধ্যমে এক অনন্য ত্রিপক্ষীয় আপস প্রতিষ্ঠিত হয়:

  1. ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড: ওয়াশিংটনে অবস্থিত একটি সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ামক সংস্থা, যা রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক তদারকি নিশ্চিত করে।
  2. ১২টি আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যাংক: দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বোস্টন, নিউ ইয়র্ক, শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকোসহ ১২টি শহরে স্বাধীন রিজার্ভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়।
  3. স্থিতিস্থাপক মুদ্রা (ফেডারেল রিজার্ভ নোট): ঋণের কাগজ ডিসকাউন্ট করার মাধ্যমে বাজারের চাহিদামাফিক টাকার সরবরাহ বাড়ানো ও কমানোর স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা তৈরি করা হয়:
    $$text{অর্থের জোগান } M_t = f(text{বাণিজ্যিক ঋণের চাহিদা}_t)$$

উপসংহার: আমেরিকান শতাব্দীর আর্থিক ইঞ্জিন

১৯১৩ সালে ফেডারেল রিজার্ভের জন্ম ছিল পরবর্তী আমেরিকান শতাব্দীর বিশ্বজয়ী ভিত্তিপ্রস্তর। আর এর সময়টি ছিল অত্যন্ত মোক্ষম: ফেড প্রতিষ্ঠার মাত্র আট মাসের মাথায় ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। একটি স্থিতিস্থাপক আধুনিক মুদ্রাব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য অন্তিম ঋণদাতার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমেরিকান ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইউরোপের মিত্রবাহিনীকে কোটি কোটি ডলার অর্থায়ন করেছিল, ইউরোপের পাহাড়প্রমাণ সোনা আকর্ষণ করেছিল এবং আমেরিকার মতো একটি ঋণগ্রস্ত দেশকে রাতারাতি পৃথিবীর শীর্ষ ঋণদাতা পরাশক্তিতে রূপান্তর করেছিল।