প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উত্তাল বিশের দশকে (Roaring Twenties) আমেরিকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে মানবজাতি এক চিরস্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে। হেনরি ফোর্ডের গাড়ির গণউৎপাদন, ঘরে ঘরে বিদ্যুতায়ন, রেডিও ও আধুনিক গৃহস্থালি পণ্যের প্রসার এবং শেয়ার বাজারের অভাবনীয় উল্লম্ফন এক চরম উন্মাদনার জন্ম দিয়েছিল। ১৯২১ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে শিল্প উৎপাদন ৭৫% বৃদ্ধি পায় এবং নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে ওঠে রাতারাতি ধনী হওয়ার উপাসনালয়। নাপিত, জুতো পালিশওয়ালা থেকে শুরু করে স্কুলশিক্ষক পর্যন্ত প্রত্যেকে তাদের জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু ঢেলে শেয়ার কিনছিলেন। এমনকি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আরভিং ফিশার ১৯২৯ সালের শরতে ঘোষণা করেছিলেন যে শেয়ারের দাম “এক স্থায়ী উচ্চ মালভূমিতে পৌঁছে গেছে।”
এর ঠিক ছয় সপ্তাহ পর সেই উচ্চ মালভূমি এক অতল গহ্বরে আছড়ে পড়ে। ১৯২৯ সালের অক্টোবরে ওয়াল স্ট্রিটের ঐতিহাসিক ধস এবং পরবর্তী তিন বছরে নয় হাজারেরও বেশি আমেরিকান বাণিজ্যিক ব্যাংকের পতন ডেকে আনে মানব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বিধ্বংসী অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয়: দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন (The Great Depression) বা মহামন্দা। এই সংকট বৈশ্বিক পুঁজিবাদকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটিয়েছিল এবং মুদ্রাতত্ত্বকে চিরতরে পাল্টে দিয়ে জন্ম দিয়েছিল কেইনসীয় অর্থনীতি ও আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের।
ফাটকাবাজির লিভারেজ: ১০% মার্জিন ঋণের মরণফাঁদ
বিশ শতকের এই শেয়ার বাজারের পাগলা ঘোড়ার পেছনের মূল জ্বালানি ছিল মার্জিন ঋণ (Margin Debt)। বাজারে ১,০০০ ডলারের শেয়ার কেনার জন্য কোনো বিনিয়োগকারীকে নিজের পকেট থেকে ১,০০০ ডলার দিতে হতো না। এক্সচেঞ্জের শিথিল নিয়মে একজন ব্যক্তি মাত্র ১০% মার্জিন ক্যাশ (১০০ ডলার) জমা দিয়ে বাকি ৯০০ ডলার শেয়ার ব্রোকারের কাছ থেকে ধার নিতে পারত।
আর ব্রোকার সেই ৯০০ ডলার ধার নিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে রাতারাতি কল মানি বাজারে শেয়ারের জামানতে। ১৯২৯ সালের শেষভাগে ওয়াল স্ট্রিটে এই ব্রোকার ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৮৫০ কোটি ডলারে—যা তৎকালীন সমগ্র আমেরিকার বাজারে প্রচলিত মোট নগদ টাকার চেয়েও বেশি ছিল! এই লিভারেজ এক মারাত্মক আর্থিক ভঙ্গুরতা তৈরি করেছিল:
$$text{ইকুইটির ওপর মুনাফা (ROE)} = frac{Delta P}{E_0} = frac{Delta P}{P_0 cdot m}$$
যেখানে মার্জিন ছিল (m = ০.১০)। শেয়ারের দাম মাত্র ১০% বাড়লে বিনিয়োগকারীর আসল টাকা রাতারাতি দ্বিগুণ (১০০% লাভ) হয়ে যেত। কিন্তু লিভারেজের গণিত চরম নির্দয়: শেয়ারের দাম যদি মাত্র ১০% কমে যেত, তবে বিনিয়োগকারীর নিজের আসল টাকা মুহূর্তের মধ্যে শূন্য হয়ে যেত। দাম কমামাত্রই ব্রোকাররা তাৎক্ষণিক মার্জিন কল দিয়ে অতিরিক্ত নগদ টাকা দাবি করত। আর টাকা দিতে না পারলে ব্রোকার সাথে সাথে বাজারে শেয়ার বেঁচে দিত, যা শেয়ারের দাম আরও নামিয়ে দিয়ে এক অবিরাম পতনের শৃঙ্খল তৈরি করত।
কালো বৃহস্পতিবার ও কালো মঙ্গলবার: হিসাব চুকানোর দিন
১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বরেই বাজারে ফাটল দেখা দিতে শুরু করেছিল। এরপর এলো সেই ভয়াল দিন: ২৪ অক্টোবর ১৯২৯—কালো বৃহস্পতিবার (Black Thursday)। বাজার খোলামাত্রই তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাগলের মতো সবাই শেয়ার বিক্রি করতে থাকে; লেনদেনের চাপ এতটাই বেশি ছিল যে টিকার টেপ মেশিন কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে পড়ে। দুপুর হতে না হতেই শত শত কোটি ডলারের কাগজের সম্পদ বাতাসে মিলিয়ে যায়।
দুপুরে জে.পি. মর্গান অ্যান্ড কোম্পানির নেতৃত্বে ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ ব্যাংকাররা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে বাজার বাঁচাতে কোটি কোটি ডলার ঢালার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই বাঁধ দিয়ে সাগরের জোয়ার ঠেকানো গেল না।
চূড়ান্ত আঘাতটি এলো পাঁচ দিন পর: কালো মঙ্গলবার (Black Tuesday), ২৯ অক্টোবর ১৯২৯। এক দিনে ১ কোটি ৬০ লক্ষেরও বেশি শেয়ার বাজারে ডাম্প করা হলো। বিনিয়োগ ট্রাস্টগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল; মাত্র এক দিনেই ১,৪০০ কোটি ডলারের সম্পদ উধাও হয়ে গেল। ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৩২ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ডাও জোন্স সূচক ৩৮১ পয়েন্টের চূড়া থেকে আছড়ে পড়ে মাত্র ৪১ পয়েন্টে নেমে আসে—টানা ৮৯.২% মহাধস!
১৯৩০–১৯৩৩ সালের ব্যাংক ধস: মিল্টন ফ্রিডম্যানের অভিযোগ
শেয়ার বাজারের ধস একা হয়তো মহামন্দা তৈরি করতে পারত না; এটি অর্থনীতি সামলে নিতে পারত যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থা অটুট থাকত। কিন্তু আসল ট্র্যাজেডি শুরু হলো যখন দেশের সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো একের পর এক ধ্বংস হতে লাগল।
১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে আমেরিকা তিনটি বিধ্বংসী ব্যাংক রানের ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়:
| ব্যাংক ধসের পর্যায় | অনুঘটক ও সংকটের কেন্দ্রবিন্দু | আর্থিক ক্ষতি ও ব্যাংক বন্ধের সংখ্যা |
|---|---|---|
| প্রথম ঢেউ (১৯৩০-এর শেষভাগ): | টেনেসি রাজ্যের ক্যাল্ডওয়েল অ্যান্ড কোং এবং নিউ ইয়র্কের ব্যাংক অব ইউনাইটেড স্টেটস ধস। | দুই মাসে ৬০০-এর বেশি ব্যাংক বন্ধ; মধ্য-পশ্চিমের কৃষি অঞ্চলে ঋণের তীব্র সংকট। |
| দ্বিতীয় ঢেউ (১৯৩১-এর বসন্ত): | ইউরোপীয় আর্থিক ধস (অস্ট্রিয়ার ক্রেডিটনস্টাল্ট এবং জার্মানির প্রধান ব্যাংকগুলোর পতন)। | ১,০০০-এর বেশি ব্যাংক বন্ধ; ব্রিটেন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ত্যাগ করায় ফেড থেকে সোনা প্রত্যাহার। |
| তৃতীয় ঢেউ (১৯৩৩-এর শুরু): | রুজভেল্টের অভিষেকের প্রাক্কালে আস্থার চূড়ান্ত পতন; রাজ্যগুলোতে জরুরি ব্যাংক ছুটি। | ৪,০০০-এর বেশি ব্যাংক চিরতরে ধ্বংস; সমগ্র দেশের আর্থিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। |
১৯৬৩ সালে প্রকাশিত তাঁদের বিখ্যাত গবেষণাকর্মে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান এবং অ্যানা শোয়ার্টজ অকাট্য তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেন: এই সংকট “মহামন্দা”-য় রূপ নিয়েছিল কারণ খোদ ফেডারেল রিজার্ভ অন্তিম ঋণদাতা হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
অর্থমন্ত্রী অ্যান্ড্রু মেলনের ধ্বংসাত্মক নীতিতে বিভ্রান্ত হয়ে ফেড হাত গুটিয়ে বসে ছিল। মেলনের তত্ত্ব ছিল: “শ্রমিকদের মরতে দাও, শেয়ার বাজার ধসতে দাও, কৃষকদের দেউলিয়া হতে দাও… এতে ব্যবস্থার সমস্ত পচা আবর্জনা পরিষ্কার হয়ে যাবে।” এই নির্বুদ্ধিতার ফলে ফেডের নাকের ডগায় যখন নয় হাজার ব্যাংক দেউলিয়া হলো, তখন ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে আমেরিকার মোট অর্থের জোগান ((M_2)) অবিশ্বাস্যভাবে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩%) সংকুচিত হয়ে যায়।
বাজারে টাকার অভাব দেখা দেওয়ায় জিনিসপত্রের দাম ২৫% পড়ে যায়। এর ফলে ঋণগ্রহীতাদের ঋণের আসল বোঝা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতি চারজন আমেরিকান শ্রমিকের একজন (২৫%) কর্মহীন হয়ে রাস্তায় নামল; খাদ্যশস্যের দাম না পেয়ে কৃষকরা রাস্তায় দুধ ঢেলে দিল; এবং জাতীয় জিডিপি অর্ধেক হয়ে গেল।
এফডিআরের বিপ্লব: ব্যাংক হলিডে, সোনা বাজেয়াপ্ত ও গ্লাস-স্টিগাল অ্যাক্ট
১৯৩৩ সালের ৪ মার্চ যখন ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ মৃতপ্রায়, তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট (FDR)। শপথ নেওয়ার মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তিনি দেশজুড়ে চার দিনের জাতীয় ব্যাংক ছুটি (National Bank Holiday) ঘোষণা করে দেশের সমস্ত ব্যাংক বন্ধ করে দেন। সরকারি অডিটররা পরীক্ষা করে সচ্ছল ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করলেন এবং ফেডের জরুরি তারল্য দিয়ে কেবল বিশ্বস্ত ব্যাংকগুলোকে খোলার অনুমতি দেওয়া হলো। ১২ মার্চ তাঁর প্রথম “ফায়ারসাইড চ্যাট” রেডিও ভাষণে রুজভেল্ট সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বললেন: “তোষকের নিচে টাকা লুকিয়ে রাখার চেয়ে পুনরায় খোলা ব্যাংকে টাকা রাখা অনেক বেশি নিরাপদ।” মানুষ বিশ্বাস ফিরে পেল; ব্যাংকে টাকা জমা পড়া শুরু হলো।
পরবর্তী একশত দিনে রুজভেল্ট পুঁজিবাদের সবচেয়ে আমূল সংস্কার সাধন করেন:
- এক্সিকিউটিভ অর্ডার ৬১০২ (এপ্রিল ১৯৩৩): নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবে সোনার কয়েন, সোনার বার বা সোনার সার্টিফিকেট ঘরে রাখা বেআইনি ঘোষণা করা হয় এবং ২০.৬৭ ডলার দরে সমস্ত সোনা ফেডের কাছে জমা দিতে বাধ্য করা হয়। ১৯৩৪ সালে রুজভেল্ট ডলারের মান ৪১% অবমূল্যায়ন করে সোনার দাম নির্ধারণ করেন প্রতি আউন্স ৩৫.০০ ডলার।
- গ্লাস-স্টিগাল ব্যাংকিং আইন (১৯৩৩): সাধারণ মানুষের জমার বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার ব্যবসার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মাঝে এক দুর্ভেদ্য আইনি প্রাচীর তুলে দেওয়া হয়।
- এফডিআইসি (FDIC) প্রতিষ্ঠা: ফেডারেল ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষের ব্যাংক জমার ওপর সরকারের ১০০% গ্যারান্টি দেওয়া হয়। এর ফলে আমেরিকার ইতিহাস থেকে চিরতরে ব্যাংক রানের আতঙ্ক মুছে যায়।
- এসইসি (SEC) গঠন (১৯৩৪): সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠন করে শেয়ার বাজারে স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করা হয়, ইনসাইডার ট্রেডিং নিষিদ্ধ করা হয় এবং মার্জিন ঋণের সীমা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
উপসংহার: পুঁজিবাদের নবজন্ম
মহামন্দা মুক্তবাজার অর্থনীতির সেই আদিম বিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল যে আর্থিক বাজার নিজে নিজেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। এটি প্রমাণ করেছিল যে অনিয়ন্ত্রিত ফাটকাবাজি এবং ব্যাংকের পতন সমগ্র সভ্যতাকে অন্ধকারের খাদে ফেলে দিতে পারে। ১৯২৯ সালের ছাই থেকেই জন্ম নিয়েছিল রাষ্ট্র-নিশ্চিত আধুনিক পুঁজিবাদ—যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য, সরকারি আমানত বীমা এবং কঠোর আইনি নজরদারি পরবর্তী তিন প্রজন্ম ধরে পশ্চিমা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রেখেছিল।