২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সোমবার সকালে ওয়াল স্ট্রিটের ১৫৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিনিয়োগ ব্যাংক লেম্যান ব্রাদার্স ৬১৩ বিলিয়ন ডলারের দেনা মাথায় নিয়ে দেউলিয়াত্বের আবেদন করে। এটি ছিল মানব ইতিহাসের সর্ববৃহৎ প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্ব। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বব্যাপী ট্রিলিয়ন ডলারের স্বল্পমেয়াদী পাইকারি রেপো বাজার পুরোপুরি জমে বরফ হয়ে যায়, এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ইঞ্জিন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা (2008 Global Financial Crisis) উন্মোচিত করে আধুনিক ফিন্যান্সিয়াল সিকিউরিটাইজেশনের বিষাক্ত রসায়ন, ধূলিসাৎ করে প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করে শূন্য সুদের হার ও বহু ট্রিলিয়ন ডলারের কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (Quantitative Easing – QE)-এর যুগে প্রবেশ করতে।
সিকিউরিটাইজেশনের মায়াজাল: এমবিএস, সিডিও ও সিডিএস
২০০৮ সালের মহা বিপর্যয়ের বীজ নিহিত ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি মৌলিক পরিবর্তনের মধ্যে। চিরায়ত ব্যাংকিংয়ে ঋণদাতা ব্যাংক নিজে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে ঋণ দিত এবং সেই ঋণের ঝুঁকি ব্যাংকের নিজের ব্যালেন্স শিটেই থাকত (Originate-to-Hold)। কিন্তু ২০০০-এর দশকে নিয়ন্ত্রণহীনতা ও আর্থিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফলে উদ্ভাবিত হয় “ঋণ সৃষ্টি করে অন্যকে গছিয়ে দেওয়া” (Originate-to-Distribute) মডেল।
মর্টগেজ ব্রোকাররা কোনো যাচাই-বাছাই, আয় বা ডাউনপেমেন্ট ছাড়াই দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহকদের মাঝে কোটি কোটি ডলারের ‘সাবপ্রাইম’ গৃহঋণ বিতরণ করে। ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো এই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগুলোকে পাইকারি হারে কিনে একসাথে পুঞ্জীভূত করে তৈরি করে মর্টগেজ-ব্যাকড সিকিউরিটিজ (MBS)। এরপর এগুলোকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে তৈরি করা হয় কোল্যাটারলাইজড ডেট অবলিগেশনস (CDO):
মুডি’স, এসঅ্যান্ডপি-র মতো ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে বিপুল ফি নিয়ে এই বিষাক্ত ঋণের বান্ডিলগুলোকে সর্বোচ্চ নিরাপদ বা ‘AAA’ রেটিং দেয়। ঝুঁকির ওপর আরেক দফা বাজি ধরতে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ (AIG)-এর মতো দানবীয় বীমা কোম্পানিগুলো ইস্যু করে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপ (CDS), যা কার্যত বন্ড দেউলিয়া হওয়ার বিরুদ্ধে অপরিশোধিত জুয়ার বীমা হিসেবে কাজ করেছিল।
শ্যাডো ব্যাংকিং এবং রাতারাতি তারল্য বরফ হওয়া
আধুনিক ঋণ ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র আর প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ছিল না; তা স্থানান্তরিত হয়েছিল নিয়ন্ত্রণহীন শ্যাডো ব্যাংকিং সিস্টেমে (Shadow Banking System)। লেম্যান ব্রাদার্স ও বেয়ার স্টার্নসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতের বদলে রাতারাতি রেপো মার্কেটের স্বল্পমেয়াদী ঋণের ওপর নির্ভর করত এবং তাদের লিভারেজ অনুপাত পৌঁছেছিল ৩৫:১-এ:
৩৫:১ লিভারেজের অর্থ হলো, সম্পদের মূল্য মাত্র ৩% কমে গেলেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মূলধন সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে প্রতিষ্ঠানটি তৎক্ষণাৎ দেউলিয়া হয়ে যাবে। ২০০৬ সালে মার্কিন আবাসন বাজার শিখরে পৌঁছে নামতে শুরু করলে এবং সাবপ্রাইম গ্রাহকরা কিস্তি খেলাপ করতে থাকলে সিডিও-গুলোর মূল্য ধূলিসাৎ হয়। ওয়াল স্ট্রিটে কেউ আর জানত না কার ভল্টে কত পরিমাণ বিষাক্ত আবর্জনা জমে আছে। ফলে ব্যাংকগুলো একে অপরকে ঋণ দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
২০০৮ সালের মার্চে বেয়ার স্টার্নস পতনের পর জেপি মরগানের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন অর্থমন্ত্রী হেনরি পলসন ও ফেড প্রধান বেন বার্ন্যাঙ্কি লেম্যান ব্রাদার্সকে না বাঁচিয়ে পতনের মুখে ঠেলে দেন। তারা ভেবেছিলেন বাজার নিজেই এটি সামলে নেবে। কিন্তু ফল হয় বিপরীত—মানি মার্কেট ফান্ডগুলো ধসে পড়ে, বৈশ্বিক ক্রেডিট প্রবাহ স্তব্ধ হয়ে যায় এবং বিশ্বের বৃহত্তম কর্পোরেশনগুলো দৈনন্দিন মজুরি দেওয়ার নগদ টাকা জোগাড়ে ব্যর্থ হতে থাকে।
টার্প বেলআউট ও কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের প্লাবন
১৯২৯ সালের গ্রেট ডিপ্রেশনের মতো আরেকটি মহামন্দা ঠেকাতে মার্কিন কংগ্রেস ৭০০ বিলিয়ন ডলারের টার্প (TARP) তহবিল অনুমোদন করে বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর মূলধন জোগান দেয়। বিশ্বজুড়ে আর্থিক চেইন রিঅ্যাকশন ঠেকাতে এআইজি-কে দেওয়া হয় ১৮২ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় অনুদান।
সুদের হার একলাফে শূন্য শতাংশে (ZIRP) নামিয়ে আনার পরও বাজার চাঙ্গা না হওয়ায় ফেড চেয়ারম্যান বেন বার্ন্যাঙ্কি এক অভূতপূর্ব অস্ত্র প্রয়োগ করেন, যার নাম কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (QE)। এই প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি ডিজিটাল উপায়ে নতুন রিজার্ভ মুদ্রা সৃষ্টি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও মর্টগেজ বন্ড কিনে নেয়:
দশকের পর দশক ধরে ফেডের ব্যালেন্স শিট ৮০০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু QE1, QE2 ও QE3-এর মাধ্যমে তা একলাফে ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। একই পথ অনুসরণ করে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক ও ব্যাংক অব জাপান, যা গোটা বিশ্বে সৃষ্টি করে সস্তা ফিয়াট তারল্যের এক নজিরবিহীন প্লাবন।
| প্রতিষ্ঠান | ধরণ | বিপদাপন্ন সম্পদের পরিমাণ | উদ্ধার প্রক্রিয়া | আর্থিক প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| বেয়ার স্টার্নস (মার্চ ২০০৮) | বিনিয়োগ ব্যাংক | $৩৯৫ বিলিয়ন | ফেডের ২৯ বিলিয়ন গ্যারান্টিতে জেপি মরগানের অধিগ্রহণ | ওয়াল স্ট্রিটে পতনের প্রথম সংকেত |
| ফ্যানি মে ও ফ্রেডি ম্যাক (সেপ্টেম্বর ২০০৮) | আধা-সরকারি গৃহঋণ দানব | $৫.৪ ট্রিলিয়ন গৃহঋণ | যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক জাতীয়করণ | আমেরিকান মর্টগেজ বাজারের ৯৫% রাষ্ট্রীয়করণ |
| লেম্যান ব্রাদার্স (১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮) | বিনিয়োগ ব্যাংক | $৬৩৯ বিলিয়ন | দেউলিয়াত্ব (Chapter 11 Liquidation) | বৈশ্বিক পাইকারি ঋণ বাজারে সর্বাত্মক তালা |
| এআইজি (১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৮) | বহুজাতিক বীমা কোম্পানি | $১.০ ট্রিলিয়ন | ফেড ও সরকারের ১৮২ বিলিয়ন ডলার উদ্ধার প্যাকেজ | ওয়াল স্ট্রিটের সমস্ত ব্যাংকের সিডিএস বাজি রক্ষা |
রাজনৈতিক অর্থনীতির যুগান্তকারী পরিবর্তন
২০০৮ সালের সংকট বিশ্ববাসীর কাছে অর্থনৈতিক এলিট এবং কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাসে চির ধরিয়ে দেয়। সাধারণ করদাতারা যখন চাকরি, বাড়ি ও সঞ্চয় হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছিল, তখন এই সংকটের মূল হোতাদের করের টাকায় বোনাস দিয়ে বাঁচানো হয় “টু বিগ টু ফেল” (Too Big to Fail) নীতির দোহাই দিয়ে।
এই নৈতিক অবক্ষয় জন্ম দেয় তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ: বামে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ এবং ডানে ‘টি পার্টি’ আন্দোলন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থার ছাই থেকেই ২০০৮ সালের ৩১ অক্টোবর সাতোশি নাকামোতো নামক এক অজ্ঞাতনামা ক্রিপ্টোগ্রাফার প্রকাশ করেন নয় পৃষ্ঠার এক ইশতেহার: পিয়ার-টু-পিয়ার ইলেকট্রনিক ক্যাশ সিস্টেম, বিটকয়েন।