একাদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সিচুয়ান অববাহিকার বাণিজ্যিক নগরী চেংদুতে এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিল: অর্থের শারীরিক ওজনের চাপ। সদ্য প্রতিষ্ঠিত সং রাজবংশের (৯৬০–১২৭৯ খ্রি.) কঠোর মুদ্রা আইনের কারণে সিচুয়ান অঞ্চলে তামার বদলে কেবল ভারী লোহার মুদ্রার প্রচলন বাধ্যতামূলক ছিল। লোহার মূল্য তামার চেয়ে অনেক কম হওয়ায় বাজারে এক থান রেশমি কাপড় কিনতে প্রায় বিশ হাজার লোহার মুদ্রা লাগত, যার ওজন ছিল একশত ত্রিশ পাউন্ডেরও বেশি। বড় কোনো পাইকারি লেনদেন করতে হলে কিংবা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে বাণিজ্য করতে হলে ব্যবসায়ীদের গরুর গাড়ি বা ঠেলাগাড়িতে টন কে টন লোহার বাটখারা নিয়ে ছুটতে হতো।

এই অসহনীয় বাস্তবিক সংকট থেকেই মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আর্থিক উদ্ভাবনের জন্ম হয়: কাগজের মুদ্রা (Paper Money)। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড কর্তৃক আধুনিক কাগজের ব্যাংকনোট ইস্যু করার প্রায় সাত শত বছর পূর্বে এবং লন্ডনের স্বর্ণকারদের রসিদভিত্তিক লেনদেনের পাঁচ শতাব্দী আগেই মধ্যযুগীয় চীন ধাতব মুদ্রার শৃঙ্খল ভেঙে তুঁত গাছের বাকল থেকে তৈরি কাগজের পাতায় অর্থের বিমূর্ত রূপান্তর ঘটিয়েছিল।

আদি রূপ: তাং রাজবংশের “উড়ন্ত মুদ্রা” (Feiqian)

চীনের কাগজের মুদ্রার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল নবম শতাব্দীর শুরুতে তাং রাজবংশের (৬১৮–৯০৭ খ্রি.) শেষ ভাগে, যা ইতিহাসে ফেইচিয়ান (Feiqian বা Flying Money — উড়ন্ত মুদ্রা) নামে পরিচিত। সে সময় চা, লবণ ও রেশমের আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। কিন্তু রাজধানী চ্যাংআন থেকে প্রাদেশিক বন্দরগুলোতে ফিরে যাওয়ার সময় পাহাড়ের ডাকাতদের হাত থেকে টন কে টন তামার মুদ্রার থলি রক্ষা করা ছিল জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

এই নিরাপত্তা ঝুঁকি দূর করতে রাজকীয় কোষাগার ও প্রাদেশিক কার্যালয় মিলে এক অনন্য রেমিট্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলে:

  1. ব্যবসায়ীরা রাজধানীতে তাদের ভারী তামার মুদ্রা রাজকোষে জমা দিতেন।
  2. রাজকোষ তাদের দুই ভাগে বিভক্ত বিশেষ কাগজের প্রশংসাপত্র বা রসিদ ইস্যু করত—যার এক অংশ থাকত রাজধানীতে, অন্য অংশ পেতেন ব্যবসায়ী।
  3. নিজ প্রদেশে ফিরে গিয়ে ব্যবসায়ী সেই কাগজের অংশটি স্থানীয় সরকারি গুদামে জমা দিলে তার ছেঁড়া অংশ মিলিয়ে শত শত মাইল দূরের সেই মূলধন স্থানীয় তামার মুদ্রা বা লবণের ভাউচারে ফেরত পেতেন।

ফেইচিয়ান সাধারণ বাজারে হাতবদলের কোনো মুদ্রা ছিল না; এটি ছিল প্রাচীন কালের ট্রাভেলার্স চেক বা আধুনিক ব্যাংক ড্রাফটের আদিরূপ। কিন্তু এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ধারণাকে বদলে দিয়েছিল: মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে একটি সিলমোহরযুক্ত কাগজের টুকরো কোটি কোটি টাকার ধাতব সম্পদের প্রতীক হতে পারে।

চেংদুতে জিয়াওজির জন্ম (১০২৪ খ্রি.)

সিচুয়ানের লোহার মুদ্রার ওজন সংকট এই ব্যাংক ড্রাফটকে বাজারে চলমান প্রকৃত কাগজের মুদ্রায় রূপান্তর করতে বাধ্য করে। আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টাব্দে চেংদু নগরীর ১৬টি শীর্ষস্থানীয় ধনী বণিক পরিবার একত্রিত হয়ে একটি আর্থিক সিন্ডিকেট গঠন করে। তারা আমানতের দোকান (*জিয়াওজি হু*) খোলে, যেখানে মানুষ তাদের ভারী লোহার কয়েন জমা রাখত এবং তার বিপরীতে তারা রঙিন তুঁত কাগজের রসিদ দিত, যার নাম ছিল জিয়াওজি (Jiaozi)।

প্রথমদিকে জিয়াওজি ছিল সাধারণ জমার রসিদ—যাতে লেখা থাকত: “বাহক এখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক লোহার মুদ্রা জমা রেখেছেন।” কিন্তু ব্যবসায়ীরা দ্রুত বুঝতে পারলেন, প্রতিবার কেনাবেচায় গুদাম থেকে ভারী লোহা তোলার চেয়ে কাগজের রসিদটির পেছনে স্বাক্ষর করে অন্যকে দিয়ে দেওয়াই বহুগুণ সহজ। এভাবেই জিয়াওজি সরাসরি বাজারে কেনাবেচার চলতি কাগজের মুদ্রায় পরিণত হয়।

চীনা কাগজের মুদ্রার পর্যায় ঐতিহাসিক সময়কাল প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য ও মজুদের অনুপাত
ফেইচিয়ান (উড়ন্ত মুদ্রা) তাং রাজবংশ (আনুমানিক ৮১০ খ্রি.) আন্তঃপ্রাদেশিক ব্যাংক ড্রাফট; বাজারে সরাসরি হাতবদল হতো না।
বেসরকারি জিয়াওজি সিন্ডিকেট উত্তর সং যুগ (আনুমানিক ১০০০ খ্রি.) চেংদুর ১৬টি বণিক বাড়ি; আংশিক ধাতব মজুদের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
সরকারি জিয়াওজি সং রাজবংশ (১০২৪ খ্রি.) বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রীয় কাগজের মুদ্রা; নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক (*জিয়ে*)।
হুইজি (Huizi) দক্ষিণ সং যুগ (১১৬০ খ্রি.) সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে চালু হওয়া জাতীয় মুদ্রা; যুদ্ধ ব্যয়ের প্রধান উৎস।
চাও (Chao) মঙ্গল ইউয়ান রাজবংশ (১২৬০ খ্রি.) বিশ্বের প্রথম বাধ্যতামূলক ফিয়াট মুদ্রা; সোনা-রূপার ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল।

১০২৩ খ্রিস্টাব্দে কয়েকটি বেসরকারি বণিক পরিবার তাদের লোহার মজুদের চেয়ে অতিরিক্ত কাগজ ছাপিয়ে ফেলে দেউলিয়া হয়ে যায়, যার ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। তখন সং রাজবংশের সম্রাট রেনজং কঠোর পদক্ষেপ নেন। ১০২৪ খ্রিস্টাব্দে সরকার সমস্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে চেংদুতে রাষ্ট্রীয় জিয়াওজি ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করে। কাগজের মুদ্রা ব্যক্তিগত খাতের হাত থেকে গিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌম একচ্ছত্র অধিকারে পরিণত হয়।

সং মুদ্রার প্রকৌশল: রিজার্ভ অনুপাত ও মেয়াদ চক্র

সং রাজবংশের সরকারি জিয়াওজি ছিল মধ্যযুগীয় প্রযুক্তির এক পরম বিস্ময়। জাল রোধ করতে উচ্চমানের তুঁত গাছের বাকলের কাগজ ব্যবহার করা হতো এবং বহু রঙের কাঠের ব্লকে খোদাই করে প্রাকৃতিক দৃশ্য, নৈতিক উপদেশ, রাজকীয় লাল-কালো সিলমোহর এবং কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর মুদ্রিত হতো। জিয়াওজি জাল করার একমাত্র শাস্তি ছিল শিরশ্ছেদ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতোই সং আমলারা আংশিক রিজার্ভ ব্যাংকিং (Fractional Reserve Banking)-এর নীতি নিখুঁতভাবে মেনে চলতেন। ১০২৪ সালের প্রথম সরকারি সংস্করণে:

  • মোট ইস্যুকৃত কাগজের মুদ্রার মান: ১২,৫৬,৩৪০ স্ট্রিং।
  • টাকশালে রক্ষিত আসল ধাতুর নগদ মজুদ: ৩,৬০,০০০ স্ট্রিং।
  • আইনসম্মত ধাতব রিজার্ভ অনুপাত ((R)):
    $$text{রিজার্ভ অনুপাত } R = frac{৩,৬০,০০০}{১২,৫৬,৩৪০} approx ২৮.৬৫%$$

কাগজ যাতে পুরোনো হয়ে নষ্ট না হয় এবং বাজারে যাতে অতিরিক্ত টাকার স্তূপ না জমে, সেজন্য তারা প্রতি তিন বছর অন্তর জিয়ে (Jie) বা মেয়াদের নিয়ম চালু করেছিলেন। তিন বছর পর পুরোনো নোট রাজকোষে জমা দিয়ে সামান্য ৩% ফি দিয়ে নতুন মেয়াদের টাটকা নোট নিতে হতো।

দক্ষিণ সং, হুইজি এবং অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপার ফাঁদ

১১২৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তরের যাযাবর জুরচেন জিন সাম্রাজ্য সং রাজধানী কাইফেং দখল করে সম্রাটকে বন্দি করে। সং রাজদরবার পালিয়ে এসে দক্ষিণের হাংঝৌ শহরে দক্ষিণ সং রাজবংশ (১১২৭–১২৭৯ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করে। উত্তরের সোনা ও রূপার খনি হারিয়ে এবং দক্ষিণ চীনের ইয়াংসি নদীর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে গানপাউডার ও নৌবহরের বিপুল সামরিক ব্যয় মেটাতে সং রাজারা কাগজের মুদ্রার ওপর সর্বশক্তি দিয়ে নির্ভর করতে শুরু করেন।

১১৬০ খ্রিস্টাব্দে তারা সমগ্র দেশে হুইজি (Huizi) নামক নতুন জাতীয় কাগজের মুদ্রা চালু করেন। প্রথমদিকে এর মান স্থিতিশীল ছিল; কিন্তু যুদ্ধ যত তীব্র হতে লাগল, রাজকোষের ঘাটতি মেটাতে সরকার ইতিহাসের চিরন্তন ফাঁদে পা দিল: কোনো ধাতব রিজার্ভ ছাড়াই লাগামহীন কাগজের মুদ্রা ছাপা।

১১৬৮ থেকে ১২৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাজারে হুইজির পরিমাণ ২ কোটি থেকে লাফিয়ে শত শত কোটিতে পৌঁছে যায়। রিজার্ভ অনুপাত শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলাফল ছিল অনিবার্য মুদ্রাস্ফীতি। ১২৭০-এর দশকে যখন কুবলাই খানের মঙ্গল বাহিনী সং সাম্রাজ্য অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল, তখন হাংঝৌর বাজারে ১,০০০ মূল্যের একটি হুইজি নোট দিয়ে মাত্র ১০ বা ২০টি তামার কয়েন পাওয়া যেত। কাগজের মুদ্রা সম্পূর্ণ মূল্যহীন জঞ্জালে পরিণত হয়েছিল।

মঙ্গলদের ফিয়াট মুদ্রার পরীক্ষা: কুবলাই খানের চাও (Chao)

১২৭১ খ্রিস্টাব্দে চীন জয় করে প্রতিষ্ঠিত মঙ্গল ইউয়ান রাজবংশে সম্রাট কুবলাই খান এক চরম অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটান: তিনি সমস্ত সোনা ও রূপার মুদ্রার ব্যবহার চিরতরে নিষিদ্ধ করে দেন এবং চাও (Chao) নামক বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ ফিয়াট ও পরিবর্তনহীন কাগজের মুদ্রা জারি করেন।

ব্যক্তিগতভাবে সোনা বা রূপা রাখা ছিল মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। বিদেশ থেকে যে বণিক আসত, তাকে তার সমস্ত সোনা-রূপা রাজকোষে জমা দিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে এই কাগজের মুদ্রা নিতে হতো। ভেনিস থেকে আসা পর্যটক মার্কো পোলো এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর ভ্রমণকাহিনীর একটি পূর্ণ অধ্যায় লিখেছিলেন কীভাবে চীনের মহান খান গাছের বাকলকে সোনায় রূপান্তর করার জাদুকরী ক্ষমতা অর্জন করেছেন:

“তুঁত গাছের বাকল দিয়ে তৈরি এই কাগজের টুকরোগুলো দিয়ে মহান খান তাঁর সমস্ত রাজকীয় ব্যয় পরিশোধ করেন; এবং তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র এটি আইনসম্মতভাবে চলে… যে কোনো দেশের বণিক যত সোনা, রূপা বা মণি-মুক্তাই আনুক না কেন, তা কেবল সম্রাটের কাছেই বিক্রি করতে বাধ্য… সম্রাট তাদের কাগজের টাকা দিয়ে দেন, এবং বণিকরা তা সানন্দে গ্রহণ করে কারণ তা দিয়ে সাম্রাজ্যের যে কোনো প্রান্তে যা ইচ্ছা তাই কেনা যায়।”

— মার্কো পোলো, দ্য ট্রাভেলস অব মার্কো পোলো (১৩০০ খ্রি.)

মার্কো পোলো যখন ভেনিসে ফিরে গিয়ে বলেছিলেন যে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী সাম্রাজ্য কোনো সোনা বা রূপা ছাড়া কেবল গাছের বাকল দিয়ে ব্যবসা চালায়, ইউরোপীয়রা তাকে একজন বদ্ধ উন্মাদ ও গল্পবাজ বলে উপহাস করেছিল। মধ্যযুগীয় ইউরোপের কাছে সোনা ও রূপাই ছিল একমাত্র অর্থ; কাগজের তৈরি বিমূর্ত ফিয়াট মূল্যের ধারণা তাদের বুদ্ধির সীমানার বাইরে ছিল।

উপসংহার: দুইধারী তরবারি

চীনের কাগজের মুদ্রা আবিষ্কার প্রমাণ করেছিল যে, অর্থের অস্তিত্ব কোনো জড় ধাতুর অন্তরে থাকে না; অর্থের মূল্য জন্মায় সামাজিক বিশ্বাস, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা থেকে। কিন্তু সং ও ইউয়ান রাজবংশের মুদ্রাস্ফীতি এই শিক্ষাও দিয়ে গেছে যে: অর্থকে যখন ধাতুর প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে কাগজের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক সংযম না থাকলে টাকশালের ছাপা মেশিন একসময় সেই অর্থনীতিকেই গিলে ফেলে যাকে সেবা করার জন্য তার জন্ম হয়েছিল।