১৬৫৬ সালের ২৭ জুলাই আমস্টারডামের পর্তুগিজ ইহুদি সমাজ মন্দিরে সমবেত হয়ে তেইশ বছর বয়সী তরুণ পণ্ডিত বারুখ স্পিনোজার বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম কঠোর বহিষ্কারাদেশ (হেরেমে) পাঠ করল। ধর্মগ্রন্থের সমস্ত অভিশাপ তাঁর ওপর বর্ষণ করা হলো: জাতির সমাজ থেকে তাঁকে চিরতরে বিতাড়িত করা হলো, পরিবারের সাথে কথা বলা নিষিদ্ধ হলো এবং তাঁকে এক অচ্ছুৎ ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করা হলো। স্পিনোজা তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন বেনেডিক্টাস (ল্যাটিন ভাষায় যার অর্থ “আশীর্বাদপ্রাপ্ত”)। তিনি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের লোভনীয় অধ্যাপকের পদ ফিরিয়ে দিলেন এবং দূরবীন ও অণুবীক্ষণ যন্ত্রের অপটিক্যাল কাঁচ বা লেন্স ঘষে অত্যন্ত সাদাসিধে দারিদ্র্যে জীবন কাটালেন। সেই কাঁচের বিষাক্ত গুঁড়ো ফুসফুসে টেনে মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার আগে তিনি রচনা করলেন যুক্তিবাদী দর্শনের সর্বশ্রেষ্ঠ গাণিতিক মহাকাব্য: এথিক্স (জ্যামিতিক পদ্ধতিতে প্রমাণিত নীতিশাস্ত্র)।

সার্বিক একত্ববাদ: দেউস সিভে নাতুরা

দেকার্তের দ্বৈতবাদের ভেতরের মারাত্মক দুর্বলতাটি স্পিনোজা এক পলকেই ধরে ফেলেছিলেন: মন এবং জড়বস্তু যদি দুটি সম্পূর্ণ আলাদা পদার্থ হয়, তবে তাদের মধ্যে কোনো দিনই সংযোগ ঘটা সম্ভব নয়। দেকার্ত মূলত পদার্থের নিজের সংজ্ঞাকেই লঙ্ঘন করেছিলেন — যেখানে পদার্থ হলো এমন এক সত্তা যা টিকে থাকার জন্য অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়। স্পিনোজা ইউক্লিডীয় জ্যামিতির নির্ভুল যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করলেন: সংজ্ঞাগতভাবেই পরম সত্তা বা পদার্থকে হতে হবে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অসীম। যদি মহাবিশ্বে দুটি আলাদা পদার্থ থাকত, তবে একটি অন্যটির সীমানা নির্ধারণ করে দিত — ফলে তাদের কেউই আর অসীম থাকত না। অতএব সমগ্র মহাবিশ্বে কেবল একটিমাত্র অসীম পদার্থ বিদ্যমান:

“দেউস সিভে নাতুরা” (Deus sive Natura) — ঈশ্বর বা প্রকৃতি।

ঈশ্বর এবং প্রকৃতি মূলত এক ও অভিন্ন। ঈশ্বর কোনো সিংহাসনে বসে থাকা রাজা নন যিনি শূন্য থেকে বিশ্ব সৃষ্টি করে হঠাৎ হঠাৎ অলৌকিক হস্তক্ষেপ করেন। ঈশ্বর স্বয়ং সমগ্র মহাবিশ্ব — অস্তিত্বের শাশ্বত, অসীম ও আত্মসৃষ্ট রূপ (কজা সুই)। প্রকৃতি যখন স্বয়ং সৃষ্টির ক্রিয়াশীল রূপ, তখন তা নাতুরা নাতুরানস; আর প্রকৃতি যখন দৃশ্যমান সৃষ্টি ও প্রভাবের সমষ্টি, তখন তা নাতুরা নাতুরাতা।

স্পিনোজার একত্ববাদের ত্রয়ী রূপরেখা

  • পরম পদার্থ (ঈশ্বর / প্রকৃতি): অখণ্ড, অসীম বাস্তবতা যা নিজের মাধ্যমেই বিদ্যমান এবং নিজের সত্তার মাধ্যমেই যার বোধদয় ঘটে।
  • গুণাবলি (অ্যাট্রিবিউটস): ঈশ্বরের অসীম সংখ্যক গুণ আছে, কিন্তু মানুষ কেবল দুটি উপলব্ধি করতে পারে: চেতনা বা চিন্তা (মন) এবং স্থানব্যাপ্তি (জড়বস্তু)।
  • রূপরীতি (মোডস): সেই অসীম পদার্থের মহাসাগরের বুকে ক্ষণিকের ঢেউ। প্রতিটি মানুষের শরীর হলো স্থানব্যাপ্তির একটি রূপ, আর প্রতিটি মানুষের মন হলো চিন্তার একটি রূপ।

মন-দেহের সমান্তরালবাদ (প্যারালেলিজম)

স্পিনোজা অতি সহজে দেকার্তের সেই মন-দেহের জটিল ধাঁধাকে সমাধান করলেন তাঁর মনোশারীরিক সমান্তরালবাদ-এর মাধ্যমে। মন এবং শরীর কোনো দুটি আলাদা সত্তা নয় যা মস্তিষ্কে কুস্তি লড়ছে; তারা মূলত একই পরম বাস্তবতার দুটি ভিন্ন দিক। মন হলো শরীরের ভেতরের সচেতন অভিজ্ঞতা; আর শরীর হলো মনের বাইরের বাস্তব প্রকাশ।

“ধারণাগুলোর যে কার্যকারণ শৃঙ্খলা, বাস্তব জগতের ঘটনাগুলোর কার্যকারণ শৃঙ্খলাও ঠিক হুবহু একই।” — বারুখ স্পিনোজা, এথিক্স

আপনি যখন প্রচণ্ড ক্রোধ অনুভব করেন, মনের সেই ক্রোধের মানসিক অবস্থার সমান্তরালে শরীরে রক্তচাপ ও অ্যাড্রেনালিনের বৃদ্ধি ঘটে। এদের মধ্যে কোনো রহস্যময় সেতু পারাপার হতে হয় না; কারণ একই পরম সত্তা যুগপৎভাবে মন ও শরীরের পর্দায় প্রতিফলিত হচ্ছে।

ভাগ্য, স্বাধীনতা ও ঈশ্বরের প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেম

স্পিনোজার মহাবিশ্ব গাণিতিক শৃঙ্খলার কঠোর নিয়মে বাঁধা। প্রতিটি চিন্তা, ঘটনা ও ইচ্ছা পেছনের কারণ দ্বারা পূর্বনির্ধারিত; ইচ্ছার তথাকথিত স্বাধীন ইচ্ছা মূলত পেছনের কারণ সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতার এক শিশুতোষ বিভ্রান্তি। বাতাসে নিক্ষিপ্ত একটি পাথরের যদি চেতনা থাকত, তবে সেও ভাবত যে সে নিজের স্বাধীন ইচ্ছাতেই উড়ে চলেছে!

তবুও স্পিনোজা কোনো হতাশার কথা বলেননি। তাঁর মতে প্রকৃত স্বাধীনতা মানে অন্ধ স্বেচ্ছাচারিতা নয়; স্বাধীনতা হলো মহাবিশ্বের অনিবার্য প্রাকৃতিক নিয়মকে বুঝতে পারা। যতদিন আমরা ঈর্ষা, ভয়, লোভ ও অন্ধ ধর্মীয় কুসংস্কারের অধীন থাকি, ততদিন আমরা বাহ্যিক শক্তির ক্রীড়ানক দাস। কিন্তু যখন আমরা প্রজ্ঞার চোখে জগতকে অনন্তের প্রেক্ষাপটে (Sub specie aeternitatis) দেখতে শিখি, তখন আমাদের মন এক অনাবিল শান্তিতে ভরে ওঠে।

এই পরম প্রজ্ঞাই হলো আমোর দেই ইন্টেলেকচুয়ালিস (ঈশ্বরের প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেম): প্রকৃতির মহাজাগতিক গাণিতিক ঐকতানকে গভীরভাবে ভালোবেসে তার সাথে নিজের অহংকে বিলীন করে দেওয়া। বহু শতাব্দী পর আলবার্ট আইনস্টাইন এই সত্য স্বীকার করে লিখেছিলেন: “আমি বিশ্বাস করি স্পিনোজার সেই ঈশ্বরে, যিনি মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খল ঐকতানের মাঝে নিজেকে প্রকাশ করেন; কোনো মানুষের ব্যক্তিগত পাপ-পুণ্যের বিচারক ঈশ্বরে আমি বিশ্বাস করি না।”