১৮৭০-এর দশকে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় “মেটাফিজিক্যাল ক্লাব” নামে বন্ধুদের এক ঘরোয়া আড্ডায় জন্ম নিয়েছিল আমেরিকার ইতিহাসের প্রথম মৌলিক দার্শনিক আন্দোলন: প্রয়োগবাদ (Pragmatism)। গণিতবিদ চার্লস স্যান্ডার্স পিয়ার্স ও মনস্তত্ত্ববিদ উইলিয়াম জেমসের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দলটি ইউরোপের শত শত বছরের জটিল, তাত্ত্বিক ও বিমূর্ত দার্শনিক তর্ক-বিতর্কের প্রতি চরম বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। সহস্রাব্দ ধরে পণ্ডিতেরা লাইব্রেরিতে বসে বিতর্ক করেছেন মহাবিশ্ব এক না বহু, চেতনা বস্তুর চেয়ে আলাদা কি না, আর সত্যের অবিনশ্বর রূপ কী। আমেরিকান প্রায়োগিক জীবনের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্র্যাগমেটিস্টরা এই সমস্ত কথার ফুলঝুরিকে উড়িয়ে দিয়ে এক বৈপ্লবিক প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন: একটি দার্শনিক তত্ত্ব যদি সত্যও হয়, তবে মানুষের দৈনন্দিন বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে তার কী সুনির্দিষ্ট পার্থক্য সৃষ্টি হয়?
পিয়ার্সের প্রায়োগিক সূত্র: কর্মই অর্থের মানদণ্ড
চার্লস স্যান্ডার্স পিয়ার্স (১৮৩৯–১৯১৪) — যাঁকে আধুনিক সংকেতবিজ্ঞান বা সেমিওটিক্সের জনক বলা হয় — ১৮৭৮ সালে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “হাউ টু মেক আওয়ার আইডিয়াস ক্লিয়ার”-এ প্রায়োগিক দর্শনের মূল ভিত্তি তুলে ধরলেন। পিয়ার্স দেখলেন কোনো বিষয়ে মানুষের বিশ্বাস কোনো নিষ্ক্রিয় মানসিক ছবি নয়; বিশ্বাস হলো মানুষের ভেতরে তৈরি হওয়া এক অভ্যাস যা তার বাস্তব কাজকে পরিচালনা করে। অতএব কোনো তত্ত্ব বা ধারণাকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হলে দেখতে হবে তার বাস্তব ফলাফল কী:
“যেকোনো বিষয় সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পরিষ্কার করার একমাত্র উপায় হলো: বাস্তব জীবনে সেই বিষয়টি কী ধরনের পর্যবেক্ষণযোগ্য পার্থক্য তৈরি করতে পারে তা বিবেচনা করা। এই বাস্তব ফলাফলের ধারণাই হলো সেই বিষয়টির সম্পূর্ণ অর্থ।” — চার্লস স্যান্ডার্স পিয়ার্স
যদি দুটি পরস্পরবিরোধী দার্শনিক মতবাদের সমস্ত অনুসিদ্ধান্ত বাস্তব জীবনের ক্ষেত্রে একদম হুবহু একই ফল দেয়, তবে তাদের বিতর্ক কোনো গভীর রহস্য নয়; তা নিছক অর্থহীন শব্দের মারপ্যাঁচ।
আমেরিকান প্রয়োগবাদের ত্রিমূর্তি
- চার্লস স্যান্ডার্স পিয়ার্স: বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক প্রয়োগবাদ; অর্থ ও সত্য নির্ধারিত হয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও গবেষক সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদী ঐক্যমতের ভিত্তিতে।
- উইলিয়াম জেমস: মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক প্রয়োগবাদ; সত্য নির্ধারিত হয় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা, মানসিক শক্তি ও আধ্যাত্মিক বিকাশের কার্যকারিতার নিরিখে।
- জন ডিউই: উপকরণবাদ (ইনস্ট্রুমেন্টালিজম); দর্শন হলো সমাজ সংস্কার, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও গণতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের এক ব্যবহারিক হাতিয়ার।
উইলিয়াম জেমস: সত্যের নগদ মূল্য (Cash-Value of Truth)
পিয়ার্স যেখানে ছিলেন কঠিন গণিতবিদ, উইলিয়াম জেমস (১৮৪২–১৯১০) সেখানে প্রয়োগবাদকে সাধারণ মানুষের জীবনের এক প্রাণবন্ত, উষ্ণ দর্শনে রূপ দিলেন। ১৯০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ প্র্যাগমেটিজম-এ জেমস এক চমকপ্রদ দাবি করলেন: সত্য কোনো আকাশের ওপারে বসে থাকা অপরিবর্তনশীল মূর্তি নয় যার সাথে মনের মিল হতে হবে। সত্য হলো একটি ঘটনা — একটি ধারণা তখনই সত্য হয়ে ওঠে, যখন তা বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে মানুষকে সফলভাবে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারে:
“সত্য কোনো স্থির বস্তু নয়। সত্য হলো এমন কিছু যা কোনো ধারণার জীবনে ঘটে। কোনো ধারণা যখন কাজে সফল প্রমাণিত হয়, তখনই তা সত্য হয়ে ওঠে।”
জেমস ব্যবহার করলেন তাঁর বিখ্যাত রূপক — সত্যের নগদ মূল্য (Cash-Value): আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে এই মহাবিশ্বের পেছনে এক শুভ কল্যাণময় শক্তি আছে, আর আপনার বন্ধু যদি দাবি করে মহাবিশ্ব কেবল অন্ধ জড়বস্তু — তবে এই দুই বিশ্বাসের মধ্যে আপনার সকালের ঘুম থেকে ওঠা, বিপদ-আপদ সহ্য করা এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে কী বাস্তব পার্থক্য ঘটছে? যদি একটি বিশ্বাস আপনার মনে নৈতিক সাহস, মানসিক প্রশান্তি এবং কর্মের প্রেরণা জোগায়, তবে প্রায়োগিক বিচারে সেই বিশ্বাসটি আপনার জীবনের জন্য পরম সত্য।
বিশ্বাসের অধিকার ও বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতা
১৮৯৬ সালের বিখ্যাত বক্তৃতা দ্য উইল টু বিলিভ-এ জেমস প্রমাণ করলেন যে জীবনের অনেক সংকটময় মুহূর্তে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়ার আগেই বিশ্বাস স্থাপন করা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত। যেমন বন্ধুত্ব, বিবাহ বা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ — আগে থেকে সন্দেহাতীত প্রমাণ খোঁজা মানেই সেই উদ্যোগকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা। প্রায়শই কোনো বিষয়ে মানুষের আগাম বিশ্বাসই সেই ঘটনাটিকে বাস্তবে সত্যি হতে সাহায্য করে। একজন দৌড়বিদের জয়ের বিশ্বাসই তাকে বিজয়ী বানায়; নাগরিকদের যৌথ বিশ্বাসই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে।
জেমসের হাত ধরে দর্শন কোনো প্রাচীন পুঁথির মৃত কঙ্কাল থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের সক্রিয় কর্ম, সৃষ্টিশীল সাহস এবং এক উন্মুক্ত সম্ভাবনাময় মহাবিশ্বের জীবন্ত পথপ্রদর্শক হয়ে উঠল।