চিন্তার রাসায়নিক সমীকরণ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরির বহু পূর্বে মানুষ এক মৌলিক অস্তিত্ববাদী প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল: আমাদের চেতনা, অনুভূতি আর ‘আমি’ সত্তার আসল বাসস্থান কোথায়? মাথার খুলির কঠিন অস্থিকাঠামোর ভেতরে, নাকি বুকের মাঝে স্পন্দিত উষ্ণ হৃদপিণ্ডের কুঠুরিতে? নিউরোসায়েন্সের ইতিহাস আধুনিক কোনো ল্যাবরেটরিতে শুরু হয়নি; এর সূচনা হয়েছিল নব্যপ্রস্তর যুগের গুহায় যেখানে চকমকি পাথরের ছুরি দিয়ে জীবন্ত মানুষের খুলিতে গোল ছিদ্র করা হতো, আর প্রাচীন মিশরের প্যাপিরাসে যেখানে মানব ইতিহাসের পাতায় প্রথমবারের মতো লিপিবদ্ধ হয়েছিল ‘মস্তিষ্ক’ শব্দটি।
নব্যপ্রস্তর যুগের ট্রিপ্যানিং: প্রাগৈতিহাসিক মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার
ফ্রান্স, পেরু এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে দশ থেকে চার হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের শত শত প্রাচীন মানুষের খুলি পাওয়া গেছে যাতে অত্যন্ত নিখুঁত বৃত্তাকার ছিদ্র রয়েছে—যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ট্রিপ্যানিং (Trepanation)। আধুনিক সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় দেখা গেছে সেই ছিদ্রগুলোর প্রান্তের হাড় পরবর্তীতে নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে—যা প্রমাণ করে প্রস্তর যুগের রোগীরা এই মারাত্মক অস্ত্রোপচারের পরও বছরের পর বছর জীবিত ছিলেন!
মাথায় তীব্র আঘাতের পর রক্তক্ষরণের চাপ কমানোর জন্যই হোক বা মৃগীরোগ ও অসহ্য মাথাব্যথার মতো ‘অশুভ আত্মাকে’ মুক্ত করার জন্যই হোক—ট্রিপ্যানিং হলো মানুষের প্রথম বাস্তব উপলব্ধি যে মস্তিষ্কের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে চেতনা ও জীবনের মূল চাবিকাঠি।
এডউইন স্মিথ প্যাপিরাস: মস্তিষ্কের প্রথম লিখিত রূপ
১৮৬২ সালে লুক্সরে আবিষ্কৃত প্রায় ৪.৬৮ মিটার দীর্ঘ হায়ারোটিক প্যাপিরাস—যা খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ অব্দের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি এবং ধারণা করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০ অব্দের বিখ্যাত মিশরীয় চিকিৎসক ইমহোটেপের রচনা থেকে অনুলিপিত—তাতে মানবদেহের ৪৮টি জটিল আঘাতের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে।
এর ষষ্ঠ কেসে একজন মাথার খুলি ফাটা রোগীর বিবরণে বলা হয়েছে:
“যদি তুমি মাথায় গভীর ক্ষতের এমন এক রোগীকে পরীক্ষা করো যার খুলি ভেঙে মস্তিষ্ক উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে… তবে সেখানে তুমি গলিত তামার মতো ভাঁজ দেখতে পাবে এবং শিশুর মাথার নরম অংশের মতো সেখানে তোমার আঙুলের নিচে কিছু একটা ধকধক করে স্পন্দিত হতে অনুভব করবে।”
এখানে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসক প্রথম পর্যবেক্ষণ করেছিলেন মস্তিষ্কের মেনিনজেস পর্দা, রক্তপ্রবাহের স্পন্দন এবং সেরিব্রাল কর্টেক্সের খাঁজকাটা ভাঁজ। তবে মিশরীয় সংস্কৃতি ছিল পুরোপুরি হৃদপিণ্ডকেন্দ্রিক: মমি বানানোর সময় পরকালে ন্যায়ের পাল্লায় পরিমাপ করার জন্য হৃদপিণ্ডকে সযত্নে বুকে রাখা হতো, আর নাক দিয়ে তামার হুক ঢুকিয়ে মস্তিষ্ককে তরল করে ফেলে দেওয়া হতো স্রেফ অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য হিসেবে!
গ্রিক দর্শনের বিতর্ক: হৃদপিণ্ড বনাম মস্তিষ্ক
প্রাচীন গ্রিসে আত্মার অবস্থান নিয়ে চিন্তাবিদদের মধ্যে শুরু হলো তুমুল বিতর্ক:
- অ্যালকমিয়ন (খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ): পশুর চোখের অপটিক স্নায়ু ব্যবচ্ছেদ করে ঘোষণা করলেন যে মস্তিষ্কই হলো অনুভূতি ও চিন্তার প্রধান সমন্বয়কারী কেন্দ্র।
- হিপোক্রেটিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০–৩৭০ অব্দ): মৃগীরোগের ওপর লিখিত গ্রন্থে অন্ধবিশ্বাস উড়িয়ে দিয়ে বললেন: “মানুষের জানা উচিত যে আনন্দ, উল্লাস, হাসি আর খেলাধুলা, তেমনি শোক, দুঃখ আর হতাশা—সবকিছু কেবল মস্তিষ্ক থেকেই উৎসারিত হয়… এই অঙ্গটির কারণেই আমরা উন্মাদ বা বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ি।”
- অ্যারিস্টটল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪–৩২২ অব্দ): হিপোক্রেটিসের বিরোধিতা করে অ্যারিস্টটল মন বা আত্মার (Psyche) আসন বসালেন উষ্ণ রক্তে ভরা হৃদপিণ্ডে! তাঁর মতে রক্তহীন শীতল মস্তিষ্ক ছিল দেহের একটি সাধারণ রেডিয়েটর—যার কাজ হৃদপিণ্ডের জ্বলন্ত চুল্লির তাপকে ঠান্ডা করা!
গ্যালেন এবং ভেন্ট্রিকুলার মতবাদ
খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের দরবারের বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেন (Galen of Pergamon) শারীরস্থান ব্যবচ্ছেদ করে অ্যারিস্টটলের মতবাদকে ভুল প্রমাণ করলেন। তিনি দেখালেন শূকরের গলার নির্দিষ্ট স্নায়ু কাটলে হৃদপিণ্ডে কোনো স্পর্শ না করেই তার চিৎকার বন্ধ হয়ে যায়, আর মস্তিষ্কে চাপ দিলে জন্তুটি তাৎক্ষণিক সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে।
গ্যালেন প্রস্তাব করলেন ভেন্ট্রিকুলার মতবাদ: হৃদপিণ্ড থেকে আসা জীবনীশক্তি মস্তিষ্কের তলদেশে পরিমার্জিত হয়ে সূক্ষ্ম অ্যানিম্যাল স্পিরিট বা মানসিক বাষ্পে পরিণত হয়। এই বাষ্প মস্তিষ্কের ভেতরের তরলপূর্ণ গহ্বরে (ভেন্ট্রিকল) জমা হয়ে ফাঁপা স্নায়ুর মধ্য দিয়ে পেশীতে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও তাঁর তত্ত্বের শারীরবৃত্তীয় রূপটি ভুল ছিল, তবুও গ্যালেন মানব ইতিহাসের জন্য চিরতরে প্রমাণ করে গেলেন: আমাদের চিন্তা, অনুভূতি ও সমস্ত চেতনার একমাত্র অধিপতি হলো মস্তিষ্ক।