ধ্রুপদী এথেন্সের স্বর্ণযুগে, যখন রাজনীতিকরা চটকদার বক্তৃতায় মেতে উঠতেন, ভাস্কররা পার্থেনন মন্দির নির্মাণ করতেন এবং সফিস্টরা টাকার বিনিময়ে বিতর্কের কৌশল বিক্রি করতেন — ঠিক তখন এক খালি পায়ের, আলুথালু পোশাকের মানুষ এথেন্সের অ্যাগোরায় ঘুরে বেড়াতেন এবং নগরের আত্মাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেন। সক্রেটিস জীবনে একটি শব্দও লিখে যাননি; তিনি কোনো রাজনৈতিক পদে বসেননি, কোনো আনুষ্ঠানিক একাডেমি খোলেননি এবং আলোচনার জন্য এক পয়সাও ফি নেননি। তবুও প্রাক-সক্রেটিক যুগের দূরবর্তী নক্ষত্র ও আদি উপাদানের গবেষণা থেকে দর্শনকে টেনে নামিয়ে মানব আত্মা, নীতি ও আত্মজিজ্ঞাসার আঙিনায় নিয়ে এসে তিনি বিশ্বচিন্তায় এক অমর বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন: “আত্মজিজ্ঞাসাহীন জীবন মানুষের বেঁচে থাকার যোগ্যই নয়।”
ডেলফির ভবিষ্যৎবাণী ও অজ্ঞতার স্বীকারোক্তি
প্লেটোর অ্যাপোলজি গ্রন্থে সক্রেটিস বর্ণনা করেন কীভাবে তাঁর দার্শনিক অভিযানের সূচনা হয়েছিল। তাঁর বন্ধু কাইরেফোন ডেলফির অ্যাপোলো মন্দিরে গিয়ে পুরোহিতের কাছে জানতে চেয়েছিলেন: সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী কোনো মানুষ কি পৃথিবীতে আছে? দৈববাণী এলো — পৃথিবীতে সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী আর কেউ নেই। সক্রেটিস স্তম্ভিত হয়ে গেলেন; কারণ তিনি জানতেন যে তিনি কিছুই জানেন না! এই রহস্য উন্মোচন করতে তিনি এথেন্সের তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কবি, রাজনীতিবিদ ও কারিগরদের সাথে বিতর্কে নামলেন। অচিরেই তিনি আবিষ্কার করলেন, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কিছুটা দক্ষতা রাখলেও, ন্যায়বিচার, সৌন্দর্য বা নৈতিকতার মতো মৌলিক বিষয়ে চরম অজ্ঞ — অথচ তারা নিজেদের মহাজ্ঞানী মনে করে অহংকারে মত্ত!
“আমি এই মানুষটির চেয়ে নিশ্চয়ই বেশি জ্ঞানী; কারণ আমরা কেউই হয়তো মহৎ বা ভালো কিছু জানি না, কিন্তু ও কিছুই না জেনেও মনে করে ও সব জানে! আর আমি অন্তত এটুকু নিশ্চিত জানি যে আমি কিছুই জানি না।” — সক্রেটিস
সক্রেটিস বুঝতে পারলেন ডেলফির দৈববাণীর আসল অর্থ: নশ্বর মানুষের তথাকথিত জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই; আর সেই মানুষই সবচেয়ে বড় জ্ঞানী, যে সক্রেটিসের মতো নিজের চরম অজ্ঞতা উপলব্ধি করতে পারে। তিনি নিজেকে তুলনা করলেন ঈশ্বরের পাঠানো এক ডাঁশ মাছির (মাইওপ্স) সাথে, যার কাজ হলো এথেন্সের মতো এক বিশাল, অলস কিন্তু অভিজাত ঘোড়াকে ক্রমাগত হুল ফুটিয়ে আত্মতুষ্টির ঘুম থেকে জাগিয়ে রাখা।
সক্রেটিক পদ্ধতির (এলেনকুস) চার স্তর
- সক্রেটিক ব্যঙ্গ (আইরনি): সক্রেটিস নিজেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ দাবি করে প্রতিপক্ষকে কোনো নৈতিক ধারণার পরম সংজ্ঞা দিতে অনুরোধ করতেন (যেমন: “ন্যায়বিচার কাকে বলে?”)।
- জেরা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব (এলেনকুস): ধারালো ও যৌক্তিক প্রশ্নের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ভেতরের পরস্পরবিরোধী বিশ্বাসগুলো প্রকাশ্যে টেনে আনতেন।
- অবরোধ বা বিভ্রান্তি (অ্যাপোরিয়া): প্রতিপক্ষ বুঝতে বাধ্য হতো যে তার এতদিনের বিশ্বাস সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ও অন্তঃসারশূন্য, যার ফলে তার মিথ্যা অহংকার চূর্ণ হয়ে যেত।
- জ্ঞান প্রসবের ধাত্রীবিদ্যা (মাইউটিক্স): সক্রেটিস কোনো তৈরি জ্ঞান চাপিয়ে দিতেন না; বরং ধাত্রীর মতো প্রতিপক্ষের ভেতর থেকেই সত্য উপলব্ধির প্রসবে সাহায্য করতেন।
জ্ঞানই পুণ্য (আরেতে ও এপিস্টেমে)
সক্রেটিসের নীতিদর্শন ছিল এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন কোনো মানুষ জেনে-বুঝে স্বেচ্ছায় পাপ কাজ করে না; অন্যায় ও অপরাধ মূলত অজ্ঞতার ফসল। একজন মানুষ যদি প্রকৃত অর্থে বোঝে কোনটি সত্য ও কল্যাণকর, তবে সে ন্যায়পরায়ণ হতে বাধ্য। অতএব, পুণ্য বা নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব কোনো বংশগত আভিজাত্য বা সামাজিক প্রথা নয়; পুণ্য হলো আত্মার যুক্তি ও সত্যের প্রতি সমর্পণ।
এছাড়া সক্রেটিস আরেকটি বিখ্যাত আপাতবিরোধী তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন: অন্যায় সহ্য করা, অন্যায় করার চেয়ে বহুগুণ শ্রেয়। কারণ অন্যায়ের শিকার হলে কেবল মানুষের শরীর বা সম্পদের ক্ষতি হয়, যা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু মানুষ নিজে যখন অন্যায় করে, তখন তার চিরন্তন আত্মা কলুষিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
হেমলকের পেয়ালা: দর্শনের প্রথম শহীদ
খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে পেলোপনেশীয় যুদ্ধের পরাজয় ও রাজনৈতিক আতঙ্কের মধ্যে এথেন্সের আদালত সক্রেটিসের বিরুদ্ধে যুবসমাজকে বিপথগামী করা এবং রাষ্ট্রের দেবতাদের অস্বীকার করার মিথ্যা অভিযোগ আনে। নির্বাসন, আপস কিংবা নীরব থাকার সুযোগ দেওয়া হলেও সক্রেটিস তাঁর দার্শনিক সত্য থেকে একচুলও সরে আসতে অস্বীকৃতি জানান। বিচারকদের দ্বারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে তিনি কারাগারে প্রশান্ত চিত্তে বিষাক্ত হেমলক পান করেন। তাঁর জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি বন্ধুদের আশ্বস্ত করে যান যে সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠ আত্মার বিনাশ কোনো পার্থিব বিষের পক্ষে সম্ভব নয়।