১৯৫০ সালে সান্তা মনিকার র‍্যান্ড কর্পোরেশনে দুই গণিতবিদ মেরিল ফ্লাড এবং মেলভিন ড্রেশার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে মডেল করতে সহজ ২×২ পে-অফ ম্যাট্রিক্স নিয়ে গবেষণা করছিলেন। পরবর্তীকালে যখন অ্যালবার্ট টাকার দুই বন্দীর জবানবন্দির গল্পের মাধ্যমে এই সংকটটি প্রকাশ করেন, তখন এটি ইতিহাসে বন্দীর উভয়সংকট (The Prisoner’s Dilemma) নামে খ্যাত হয়। এটি মানব ইতিহাসের সর্বাধিক বিশ্লেষিত কৌশলগত সমস্যা: একটি অকাট্য গাণিতিক প্রমাণ যে ব্যক্তি যখন নিজের স্বার্থে সর্বোচ্চ যৌক্তিক আচরণ করে, তখন তার সম্মিলিত পরিণতি হতে পারে সমাজের চরম সর্বনাশ।

সংকটের রূপরেখা ও পে-অফ ম্যাট্রিক্স

দুইজন সন্দেহভাজন অপরাধীকে আলাদা সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগের সুযোগ নেই। তদন্তকারী কর্মকর্তা উভয়কে একই প্রস্তাব দিলেন:

  • যদি ১ম বন্দী বিশ্বাসঘাতকতা করে ($D$) এবং ২য় বন্দী চুপ থাকে ($C$), তবে ১ম বন্দী মুক্তি পাবে ($০$ বছর কারাদণ্ড), আর ২য় বন্দী পাবে ৫ বছরের কঠোর শাস্তি।
  • উভয়েই যদি নীরব থাকে বা সহযোগিতা করে ($C$), তবে প্রমাণের অভাবে উভয়কে মাত্র ১ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে।
  • উভয়েই যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় বা বিশ্বাসঘাতকতা করে ($D$), তবে উভয়েই ৩ বছর করে সাজা পাবে।

প্রভাবশালী কৌশল ও ন্যাশ ফাঁদ

১ম বন্দীর দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্তটি বিবেচনা করা যাক:

  • যদি ২য় বন্দী চুপ থাকে ($C$), তবে ১ম বন্দী $-১$ (সহযোগিতা) বনাম $০$ (বিশ্বাসঘাতকতা)-এর মধ্যে তুলনা করবে। বিশ্বাসঘাতকতা করলেই মুক্তি ($০ > -১$)।
  • যদি ২য় বন্দী বিশ্বাসঘাতকতা করে ($D$), তবে ১ম বন্দী $-৫$ বনাম $-৩$-এর মধ্যে তুলনা করবে। এখানেও বিশ্বাসঘাতকতা তাকে ২ বছরের জেল থেকে বাঁচাবে ($-৩ > -৫$)।

প্রতিপক্ষ যা-ই করুক না কেন, বিশ্বাসঘাতকতা হলো একটি কঠোর প্রভাবশালী কৌশল (Strictly Dominant Strategy)। একই যুক্তিতে ২য় বন্দীর জন্যও বিশ্বাসঘাতকতা একমাত্র প্রভাবশালী কৌশল। ফলে এই খেলার একমাত্র ন্যাশ সাম্যাবস্থা হলো $(D, D)$, যার ফলাফল $(-৩, -৩)$। অথচ উভয়ে সহযোগিতা করলে ফল হতো $(-১, -১)$, যা উভয় বন্দীর জন্যই শ্রেয় ছিল।

সামাজিক ট্র্যাজেডি ও ট্র্যাজেডি অব দ্য কমন্স

প্রিজনার্স ডিলেমা কেবল কোনো কৌতূহলোদ্দীপক ধাঁধা নয়; এটি মানব সমাজের প্রায় সমস্ত কাঠামোগত ব্যর্থতার মূল বীজ। গ্যারেট হার্ডিনের ১৯৬৮ সালের ট্র্যাজেডি অব দ্য কমন্স এর প্রত্যক্ষ বিস্তার:

  • মৎস্য শিকার ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: অতিরিক্ত মাছ ধরলে একক জেলের তাৎক্ষণিক লাভ হয়, কিন্তু সাগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ক্ষতি বহন করে পুরো বিশ্ব। ফলে সবার প্রভাবশালী কৌশল হলো অতিরিক্ত মাছ শিকার করে প্রজাতি বিলুপ্ত করা।
  • জলবায়ু পরিবর্তন: জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে শিল্পোন্নত দেশগুলোর তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়, কিন্তু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ভয়াবহ ক্ষতি সারা বিশ্বকে ভোগ করতে হয়।
  • পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা: প্রতিপক্ষের আক্রমণের ভয়ে অস্ত্র তৈরি করাই প্রভাবশালী কৌশল, যার ফলে উভয় দেশ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে সমপরিমাণ অনিরাপদ অবস্থায় পতিত হয়।
সংকট থেকে মুক্তির পথ

একটি ওয়ান-শট প্রিজনার্স ডিলেমাতে কোনো যুক্তিযুক্ত এজেন্টের পক্ষে সহযোগিতা করা অসম্ভব। এই সংকট দূর করতে হলে খেলার কাঠামো বদলাতে হয়—আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ (হবসীয় লেভিয়াথান), ক্রিপ্টোগ্রাফিক স্মার্ট চুক্তি অথবা বারবার খেলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশোধের ভয় তৈরি করা।