বিগ ব্যাং ছিল এক চরম রক্ষণশীল রসায়নবিদ: অস্তিত্বের প্রথম বিশ মিনিটে এটি কেবল সবচেয়ে সরল তিনটি মৌল তৈরি করেছিল—হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং সামান্য লিথিয়াম। মহাবিশ্ব যদি কেবল বিগ ব্যাংয়ের ওপর নির্ভর করত, তবে সমগ্র মহাশূন্য পাথর, পানি, মাটি কিংবা জীবনের অস্তিত্বহীন এক শীতল মরুভূমি হিসেবে থেকে যেত। একটি জীবন্ত মহাবিশ্ব গড়ে তুলতে প্রয়োজন ছিল মহাজাগতিক কিমিয়াবিদদের: দানবাকৃতির নক্ষত্রসমূহ, যা তাদের ফুটন্ত পারমাণবিক চুল্লিতে হালকা পরমাণুগুলোকে পিষে পর্যায় সারণীর রত্নভাণ্ডারে রূপ দিয়েছে, সুপারনোভার প্রলয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডে আত্মাহুতি দিয়েছে, এবং মৃত নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে মহাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে গ্রহ ও জীবনের বীজ।

Defying the Coulomb Barrier: Quantum Tunneling and the Gamow Peak
চিত্র ৫.১: কুলম্বের প্রাচীর অতিক্রম (কোয়ান্টাম টানেলিং এবং গ্যামো পিক)। সমধর্মী ধনাত্মক চার্জযুক্ত দুটি প্রোটনের মাঝে ১০ লাখ ইলেকট্রনভোল্টের কুলম্ব বিকর্ষণ প্রাচীর থাকে, যা চিরায়ত তাপীয় শক্তিতে অতিক্রম করা অসম্ভব। কিন্তু প্রোটনকে ডি ব্রগলি কণা-তরঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করলে কোয়ান্টাম টানেলিং সম্ভাব্যতা ও ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান তাপীয় লেজের সংযোগে একটি সংকীর্ণ শক্তি ক্ষেত্র তৈরি হয়—যাকে বলে গ্যামো পিক (১৫–২৫ keV)—যার কারণে শত কোটি বছর ধরে নক্ষত্র শান্তভাবে জ্বলতে পারে।

নাক্ষত্রিক ইঞ্জিন: নক্ষত্র কীভাবে কুলম্ব বিকর্ষণকে পরাস্ত করে

প্রতিটি পারমাণবিক নিউক্লিয়াস তার পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$)-এর সমান ধনাত্মক বৈদ্যুতিক চার্জ বহন করে। কুলম্বের সূত্রানুসারে সমধর্মী চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে; তাই দুটি নিউক্লিয়াস যত কাছে আসতে চায়, তাদের মধ্যবর্তী ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক বিকর্ষণ প্রাচীর তত রৈখিকভাবে বাড়তে থাকে:

$$U_C(r) = \frac{Z_1 Z_2 e^2}{4\pi \varepsilon_0 r}$$

চিরায়ত নিউটোনীয় পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে দুটি প্রোটনকে এই বাধা অতিক্রম করে একে অপরের সাথে মিশে যেতে হলে নক্ষত্রের ভেতরের তাপমাত্রা হতে হতো ১০০ কোটি কেলভিনেরও বেশি ($10^9\text{ K}$)—যেখানে আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রের কেন্দ্রের তাপমাত্রা মাত্র দেড় কোটি কেলভিন ($1.5 \times 10^7\text{ K}$)। তাহলে নক্ষত্র কীভাবে জ্বলে?

কোয়ান্টাম টানেলিং এবং গ্যামো উইন্ডো (জর্জ গ্যামো, ১৯২৮)

১৯২৮ সালে পদার্থবিদ জর্জ গ্যামো দেখান যে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় কণিকাসমূহ তরঙ্গের মতো আচরণ করে। একটি প্রোটনের কাছে কুলম্ব প্রাচীর টপকানোর মতো ক্লাসিক্যাল গতিশক্তি না থাকলেও, তার একটি নির্দিষ্ট সম্ভাবনা ($P \propto \exp[-2\pi \eta_G]$) থাকে সরাসরি সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে সুড়ঙ্গ বা টানেল তৈরি করে ওপারে চলে যাওয়ার—যেখানে শক্তিশালী নিউক্লীয় বল ($r \approx 10^{-15}\text{ m}$) তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে। ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান গতিশক্তি বণ্টন এবং কোয়ান্টাম টানেলিং সম্ভাবনার গুণফলের ফলে একটি অতি-সংকীর্ণ সোনালী শক্তিমাত্রা তৈরি হয়—যাকে বলে গ্যামো উইন্ডো (Gamow Window)। এর ফলেই কোটি কোটি বছর ধরে নক্ষত্র শান্ত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বলতে পারে।

সূর্যের সমান ভরের নক্ষত্রগুলোতে হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয় মূলত প্রোটন-প্রোটন (p-p) শৃঙ্খলের মাধ্যমে, যা প্রতিটি হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াসে ২৬.৭৩ মেগা-ইলেকট্রনভোল্ট শক্তি নির্গত করে। অন্যদিকে সূর্যের চেয়ে ১.৩ গুণ ভারী নক্ষত্রগুলোতে কেন্দ্রের তাপমাত্রা ১ কোটি ৮০ লাখ কেলভিন ছাড়িয়ে যাওয়ায় সেখানে প্রাধান্য বিস্তার করে কার্বন-নাইট্রোজেন-অক্সিজেন (CNO) চক্র, যেখানে কার্বন ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে তীব্র গতিতে ফিউশন ঘটায়।

The 25 Solar Mass Onion-Skin Crucible: Concentric Shells and Fusion Lifetimes
চিত্র ৫.২: পেঁয়াজের খোসার মতো স্তরযুক্ত নাক্ষত্রিক চুল্লি এবং দহনকাল। একটি বিশাল নক্ষত্র যখন একের পর এক জ্বালানি পুড়িয়ে ফেলে, তখন কেন্দ্রের চারপাশে পেঁয়াজের খোসার মতো সমকেন্দ্রী ফিউশন স্তর তৈরি হয়। ১০০ কোটি কেলভিনের উপরে নিউট্রিনো নিঃসরণ সরাসরি মহাকাশে শক্তি শুষে নেয়—যার ফলে হাইড্রোজেনের ৭০ লাখ বছরের আয়ু কার্বনের জন্য ৬০০ বছর, অক্সিজেনের জন্য ৬ মাস এবং সিলিকনের ক্ষেত্রে মাত্র ২৪ ঘণ্টার এক চূড়ান্ত দৌড়ে সংকুচিত হয়ে আসে।

পেঁয়াজের খোসার মতো স্তরযুক্ত চুল্লি: ২৫ সৌর ভরের নক্ষত্রের ৬টি দহন পর্যায়

সূর্যের চেয়ে ৮ গুণ বা তার বেশি ভারী একটি নক্ষত্র যখন তার কেন্দ্রের হাইড্রোজেন পুড়িয়ে ফেলে, তখন তার ভেতরের হাইড্রোস্ট্যাটিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। বিকিরণ চাপ কমে যাওয়ায় মাধ্যাকর্ষণ তার নিষ্ক্রিয় হিলিয়াম কোরকে সংকুচিত করতে থাকে, যার ফলে কেন্দ্রের তাপমাত্রা ২০ কোটি কেলভিনে এবং ঘনত্ব প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ১০,০০০ গ্রামে উন্নীত হয়। এই তাপমাত্রায় শুরু হয় ট্রিপল-আলফা প্রক্রিয়া:

$$3 \, {}^4\text{He} \to {}^{12}\text{C} + \gamma \quad \text{এবং পরবর্তীতে} \quad {}^{12}\text{C} + {}^4\text{He} \to {}^{16}\text{O} + \gamma$$

জ্বালানি শেষ হওয়া, মহাকর্ষীয় সংকোচন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরবর্তী ভারী মৌলের প্রজ্বলনের এই চক্রটি ক্রমান্বয়ে দ্রুত ও উন্মত্ত গতিতে ঘটতে থাকে। দানবাকৃতির একটি বিবর্তিত নক্ষত্রের অভ্যন্তর তখন সমকেন্দ্রী পেঁয়াজের খোসার মতো স্তরযুক্ত কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়:

  • ১. হাইড্রোজেন দহন স্তর ($T \sim ৪ \times ১০^৭\text{ K}$): হাইড্রোজেন পুড়ে হিলিয়াম হয়। সময়কাল: $\approx ৭\text{ মিলিয়ন (৭০ লাখ) বছর}$।
  • ২. হিলিয়াম দহন স্তর ($T \sim ২ \times ১০^৮\text{ K}$): হিলিয়াম পুড়ে কার্বন ও অক্সিজেন তৈরি করে। সময়কাল: $\approx ৫,০০,০০০\text{ বছর}$।
  • ৩. কার্বন দহন স্তর ($T \sim ৮ \times ১০^৮\text{ K}$): ${}^{12}\text{C} + {}^{12}\text{C} \to {}^{20}\text{Ne}, {}^{24}\text{Mg}, {}^{23}\text{Na}$। সময়কাল: $\approx ৬০০\text{ বছর}$।
  • ৪. নিয়ন দহন স্তর ($T \sim ১.৫ \times ১০^৯\text{ K}$): ফটোডিসইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে আলফা ক্যাপচার: ${}^{20}\text{Ne}(\alpha, \gamma){}^{24}\text{Mg}$। সময়কাল: $\approx ১\text{ বছর}$।
  • ৫. অক্সিজেন দহন স্তর ($T \sim ২.০ \times ১০^৯\text{ K}$): ${}^{16}\text{O} + {}^{16}\text{O} \to {}^{28}\text{Si}, {}^{32}\text{S}, {}^{31}\text{P}$। সময়কাল: $\approx ৬\text{ মাস}$।
  • ৬. সিলিকন দহন কোর ($T \sim ৩.৫ \times ১০^৯\text{ K}$): দ্রুত আলফা ক্যাপচারের মাধ্যমে সিলিকন পুড়ে নিকেল-৫৬ তৈরি হয়, যা তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ে লোহা-৫৬-তে রূপ নেয়। সময়কাল: মাত্র ২৪ ঘণ্টা!
২৫ সৌর ভরের সুপারজায়ান্ট নক্ষত্রের পেঁয়াজের খোসার মতো স্তরযুক্ত গঠন ও আলফা মই ফিউশন
২৫ সৌর ভরের সুপারজায়ান্ট নক্ষত্রের পেঁয়াজের খোসার মতো স্তরযুক্ত গঠন ও আলফা মই ফিউশন। মহাকর্ষীয় সংকোচন কেন্দ্রস্থ তাপমাত্রাকে ৩.৫ বিলিয়ন কেলভিনে উন্নীত করে সিলিকন দহন চালু করে। ধারাবাহিক আলফা কণা সংযোজনের ($+^4\text{He}$) মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রধান মৌলিক পদার্থসমূহ ($^{12}\text{C} \to ^{16}\text{O} \to ^{20}\text{Ne} \to ^{24}\text{Mg} \to ^{28}\text{Si} \to ^{56}\text{Ni} \to ^{56}\text{Fe}$) তৈরি হয়, যার ব্যাপ্তিকাল হাইড্রোজেনের ৭০ লাখ বছর থেকে দ্রুত সংকুচিত হয়ে সিলিকনের ক্ষেত্রে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় নেমে আসে।
The Nuclear Binding Energy Curve: The Iron Wall of Death
চিত্র ৫.৩: পারমাণবিক বন্ধন শক্তি বক্ররেখা এবং লোহার মৃত্যু-প্রাচীর। নিউক্লিয়ন প্রতি বন্ধন শক্তি ঠিক লোহা-৫৬ (৮.৭৯ MeV) এবং নিকেল-৬২ (৮.৭৯৫ MeV)-তে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। লোহার পূর্ব পর্যন্ত ফিউশন তাপমোচী (শক্তি উৎপন্ন করে মহাকর্ষ রোধ করে); কিন্তু লোহার পরবর্তী ফিউশন তাপহারী, যা কেন্দ্রের তাপীয় শক্তি শুষে নিয়ে নক্ষত্রের ভেতরের চাপকে মুহূর্তের মাঝে ধ্বংস করে দেয়।

লোহার মহাবিপর্যয়: কেন ২৬ নম্বর মৌলে ফিউশন চিরতরে থেমে যায়?

লাখ লাখ বছর ধরে নক্ষত্রটি তাপমোচী ফিউশনের মাধ্যমে মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে এসেছিল: হালকা মৌল যখন যুক্ত হয়, তখন নতুন নিউক্লিয়াসের ভর তার উপাদানের ভরের চেয়ে সামান্য কম হয় ($E = \Delta m c^2$); আর সেই হারিয়ে যাওয়া ভর তাপীয় শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে নক্ষত্রটিকে ফুলিয়ে রাখে।

কিন্তু নিউক্লিয়ন প্রতি পারমাণবিক বন্ধন শক্তি সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায় ঠিক আয়রন-গ্রুপের মৌলগুলোতে—বিশেষ করে নিকেল-৬২, লোহা-৫৮ এবং লোহা-৫৬ ($B/A \approx ৮.৮\text{ MeV প্রতি নিউক্লিয়ন}$)-এ:

লোহার দুর্লঙ্ঘ্য পারমাণবিক দেওয়াল

লোহা-৫৬ থেকে ফিউশনের মাধ্যমে বাড়তি কোনো শক্তি নিষ্কাশন করা অসম্ভব। লোহার সাথে আরেকটি নিউক্লিয়াস যুক্ত করার বিক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে তাপহারী (Endothermic)—এটি শক্তি উৎপন্ন করার বদলে উল্টো নক্ষত্রের কোরের তাপ শুষে নেয়। যে মুহূর্তে একটি দানব নক্ষত্রের কেন্দ্রে লোহার কোর জমা হতে শুরু করে, নক্ষত্রটির পারমাণবিক ইঞ্জিন চিরতরে মারা যায়। নক্ষত্রকে ফুলিয়ে রাখা কেন্দ্রস্থ চাপ এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে শূন্যে নেমে আসে।

পারমাণবিক বন্ধন শক্তি বক্ররেখা এবং লোহার মহাবিপর্যয়
পারমাণবিক বন্ধন শক্তি বক্ররেখা এবং লোহার মহাবিপর্যয়। নিউক্লিয়ন প্রতি বন্ধন শক্তি ($B/A$) লোহা-৫৬ এবং নিকেল-৬২-তে সর্বোচ্চ শিখরে ($৮.৭৯\text{ MeV/নিউক্লিয়ন}$) পৌঁছায়। এর বামে তাপমোচী ফিউশন ($Q > 0$) নক্ষত্রকে বাঁচিয়ে রাখে; ডানে তাপমোচী ফিশন ($Q > 0$) ঘটে। লোহার ফিউশন সম্পূর্ণ তাপহারী ($Q < 0$) হওয়ায় তা কোরের তাপ শুষে নিয়ে কেন্দ্রস্থ চাপ ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে নক্ষত্রটি ১০০ মিলিসেকেন্ডে আলোর গতির ২৩% বেগে অন্তর্মুখী পতনে নিমজ্জিত হয়।
Core-Collapse Supernova: 4-Stage Infall, Bounce and Neutrino Revival
চিত্র ৫.৪: কোর-ক্ল্যাপস সুপারনোভার ব্যবচ্ছেদ (ধস, প্রতিক্ষেপ এবং নিউট্রিনো পুনরুজ্জীবন)। ১০০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে ইলেকট্রন ক্যাপচার এবং ফটোডিসইন্টিগ্রেশনের কারণে আলোর গতির ২৩% বেগে মুক্ত মহাকর্ষীয় ধস ঘটে। পারমাণবিক স্যাচুরেশন ঘনত্বের ওপর আছড়ে পড়ে বহির্মুখী শকওয়েভ প্রতিক্ষিপ্ত হয়; পরে নিউট্রিনোর তীব্র প্রবাহ ধাক্কা দিয়ে ১০⁴⁴ জুল শক্তির এক প্রলয়ঙ্কর সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটায়।

কোর-ক্ল্যাপস সুপারনোভা (টাইপ ২): পারমাণবিক ঘনত্বের দেয়ালে নক্ষত্রের প্রতিক্ষেপ

যখনই লোহার কোরের ভর চন্দ্রশেখর সীমা ($M_{\text{Ch}} \approx 1.44 M_\odot$) অতিক্রম করে, তখনই ইলেকট্রন ডিজেনারেসি চাপ আর মাধ্যাকর্ষণকে ধরে রাখতে পারে না। সমগ্র কোর এক পলকে মহাকর্ষীয় ধ্বংসের মুখে পতিত হয়:

১. ইলেকট্রন ক্যাপচার ও ফটোডিসইন্টিগ্রেশন (০ থেকে ১০০ মিলিসেকেন্ড)

ঘনত্ব যখন প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ১০ হাজার কোটি গ্রাম ($10^{11}\text{ g/cm}^3$) ছাড়িয়ে যায়, তখন অতি-উচ্চ শক্তির গামা রশ্মি লোহার নিউক্লিয়াসকে চূর্ণ করে আবার আলফা কণা ও মুক্ত নিউট্রনে ভেঙে ফেলে। একই সাথে ইলেকট্রনগুলো প্রচণ্ড চাপে সরাসরি প্রোটনের ভেতরে ঢুকে নিউট্রনে পরিণত হয় (ইনভার্স বিটা ক্ষয়):

$$p + e^- \to n + \nu_e$$

এর ফলে সমগ্র কোরটি পরিণত হয় খাঁটি নিউট্রনের এক পিণ্ডে। পৃথিবীর সমান আকৃতির একটি লোহার বল ১০০ মিলিসেকেন্ডেরও কম সময়ে সংকুচিত হয়ে মাত্র ২০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি গোলকে পরিণত হয়, যা আলোর গতির প্রায় ২৫% বেগে ($৭০,০০০\text{ কিমি/সেকেন্ড}$) ভেতরের দিকে আছড়ে পড়ে।

২. নিউক্লিয়ার প্রতিক্ষেপ এবং নিউট্রিনোর শকওয়েভ

কোরটি যখন পারমাণবিক স্যাচুরেশন ঘনত্বে ($\rho_{\text{nuc}} \approx 3 \times 10^{14}\text{ g/cm}^3$) পৌঁছায়, তখন শক্তিশালী নিউক্লীয় বল হঠাৎ বিকর্ষণমূলক আচরণ শুরু করে। নিউট্রন ডিজেনারেসি চাপ কংক্রিটের নিরেট দেওয়ালের মতো ধসটিকে আটকে দেয়। ওপর থেকে ধেয়ে আসা বাইরের স্তরগুলো এই কঠিন কোরের ওপর আছড়ে পড়ে প্রতিক্ষিপ্ত (Rebound) হয়, তৈরি করে একটি প্রচণ্ড বহির্মুখী সুপারসনিক শকওয়েভ।

এই শকওয়েভটি সদ্যজাত নিউট্রন তারা থেকে মুক্ত হওয়া কোটি কোটি নিউট্রিনোর তীব্র শক্তিতে সঞ্জীবিত হয়ে সমগ্র নক্ষত্রটিকে উড়িয়ে দেয়। একটি কোর-ক্ল্যাপস সুপারনোভায় নির্গত হয় $১০^{৪৬}\text{ জুল}$ শক্তি—যা আমাদের সূর্য তার পুরো ১০ বিলিয়ন বছরের জীবনে যে আলো ছড়াবে, তার চেয়েও বহুগুণ বেশি! আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শক্তির ৯৯% বহন করে নিয়ে যায় নিউট্রিনো, ১% গতিশক্তি হিসেবে নক্ষত্রটির শরীর উড়িয়ে দেয়, আর মাত্র ০.০১% দৃশ্যমান আলো হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।

টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে এই বিস্ফোরিত নক্ষত্রটি তার সম্পূর্ণ ছায়াপথের শত শত কোটি তারার সম্মিলিত আলোকে একাই ছাড়িয়ে যায়, প্রতি সেকেন্ডে ১০,০০০ কিলোমিটার বেগে মহাকাশে ছড়িয়ে দেয় কোটি কোটি টন কার্বন, অক্সিজেন, নিয়ন ও সিলিকন।

Beyond Iron: The s-Process vs r-Process Neutron Capture Pathways
চিত্র ৫.৫: লোহার ওপারের ভারী মৌল গঠন (s-প্রক্রিয়া বনাম r-প্রক্রিয়া)। লোহার চেয়ে ভারী মৌল তৈরির জন্য প্রয়োজন নিউট্রন গ্রহণ, যার কোনো কুলম্ব বিকর্ষণ নেই। স্পন্দিত AGB নক্ষত্রে ধীর ($s$) প্রক্রিয়া শত শত বছর ধরে নিউট্রন শোষণ করে বিসমাথ-২০৯ পর্যন্ত মৌল গড়ে। অন্যদিকে দুটি নিউট্রন তারার সংঘর্ষে (কিলোনোভা) তীব্র ($r$) প্রক্রিয়া প্রতি সেকেন্ডে ১০²² নিউট্রনের বন্যায় নিউক্লিয়াসকে ভাসিয়ে সোনা, প্ল্যাটিনাম ও ইউরেনিয়াম তৈরি করে।

লোহার ওপারের মৌলসমূহ: ধীর ($s$) ও দ্রুত ($r$) নিউট্রন গ্রহণ প্রক্রিয়া

যেহেতু ফিউশনের মাধ্যমে লোহার চেয়ে ভারী মৌল তৈরি সম্ভব নয়, তাই তামা, রূপা, আয়োডিন, বেরিয়াম, সোনা, প্ল্যাটিনাম ও ইউরেনিয়ামের মতো মৌলগুলো তৈরি হতে হয়েছে নিউট্রন গ্রহণের (Neutron Capture) মাধ্যমে। যেহেতু নিউট্রনের কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই, তাই তারা কোনো কুলম্ব বিকর্ষণের মুখোমুখি না হয়ে অতি সহজেই পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে:

১. $s$-প্রক্রিয়া (ধীর নিউট্রন গ্রহণ)

মধ্যম ভরের বিবর্তিত অ্যাসিম্পটোটিক জায়ান্ট ব্রাঞ্চ (AGB) নক্ষত্রে হাজার হাজার বছর ধরে এটি ঘটে। নিউট্রনের ঘনত্ব এখানে কম থাকে: একটি নিউক্লিয়াস একটি নিউট্রন শোষণ করে, এবং যদি তা অস্থিতিশীল হয়, তবে পরবর্তী নিউট্রন আসার আগেই পর্যাপ্ত সময় পায় বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে ($n \to p + e^- + \bar{\nu}_e$) নতুন উচ্চ পারমাণবিক সংখ্যার মৌলে রূপ নেওয়ার। স্ট্রনশিয়াম, বেরিয়াম ও সীসার মতো লোহার চেয়ে ভারী মৌলগুলোর প্রায় অর্ধেক এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়।

২. $r$-প্রক্রিয়া (কিলোনোভা ও নিউট্রন তারার সংঘর্ষে দ্রুত নিউট্রন গ্রহণ)

এর জন্য প্রয়োজন চরম প্রলয়ঙ্কর পরিবেশ, যেখানে প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে প্রতি সেকেন্ডে $১০^{২০}$-এর বেশি নিউট্রনের বন্যা বয়ে যায়। নিউক্লিয়াসগুলো এক পলকে শত শত নিউট্রন গ্রাস করে ফুলেফেঁপে ওঠে, এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বিটা ক্ষয় করে সোনা, প্ল্যাটিনাম ও ইউরেনিয়ামের মতো অত্যন্ত ভারী স্থায়ী মৌলে রূপ নেয়।

২০১৭ সালে লাইগো-ভার্গো (LIGO-Virgo) মহাকর্ষীয় তরঙ্গ মানমন্দির GW170817 শনাক্ত করে: NGC 4993 গ্যালাক্সিতে দুটি নিউট্রন তারার প্রলয়ঙ্কর সংঘর্ষ ও মহাজাগতিক কিলোনোভা। সেই একক সংঘর্ষে মহাশূন্যে তৈরি ও নিক্ষিপ্ত হয়েছিল পৃথিবীর ভরের চেয়েও দশ গুণ বেশি খাঁটি সোনা ও প্ল্যাটিনাম—যা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেছে যে আমাদের হাতের সোনার আংটি তৈরি হয়েছে মহাকাশে দুটি মৃত নিউট্রন তারার আত্মঘাতী মিলনে!

বাইনারি নিউট্রন তারার কিলোনোভা সংঘর্ষে দ্রুত নিউট্রন গ্রহণ r-প্রক্রিয়া
বাইনারি নিউট্রন তারার কিলোনোভা সংঘর্ষে দ্রুত নিউট্রন গ্রহণ ($r$-প্রক্রিয়া)। চরম আপেক্ষিক সংঘর্ষের ফলে (যেমন GW170817) মহাশূন্যে অতি-ঘন নিউট্রনের বন্যা ($n_n > 10^{20}\text{ নিউট্রন/সেমি}^3$) বয়ে যায়। নিউট্রন গ্রহণের হার বিটা ক্ষয়ের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত হওয়ায় ($\tau_n \ll \tau_\beta$) লোহার আদি নিউক্লিয়াসগুলো নিউট্রন গ্রহণ করে স্ফীত হয় এবং পরবর্তীতে বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর ভরের ১০ গুণেরও বেশি খাঁটি সোনা ($^{197}\text{Au}$), প্ল্যাটিনাম ($^{195}\text{Pt}$) ও ইউরেনিয়াম ($^{238}\text{U}$) তৈরি করে।

পর্যায় সারণীর মহাজাগতিক বংশলতিকা

উৎপত্তির মাধ্যম প্রধান মৌলসমূহ মহাজাগতিক পরিবেশ মানবদেহ ও পৃথিবীর গুরুত্ব
বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস হাইড্রোজেন ($^1\text{H}$), হিলিয়াম ($^4\text{He}$), লিথিয়াম আদিম মহাজাগতিক চুল্লি ($৩\text{–}২০\text{ মিনিট}$) পানির অণু ($\text{H}_2\text{O}$), সূর্যের পারমাণবিক জ্বালানি।
মাঝারি ভরের নক্ষত্র (AGB) কার্বন ($^{12}\text{C}$), নাইট্রোজেন ($^{14}\text{N}$), $s$-প্রক্রিয়া (Sr, Ba, Pb) প্ল্যানেটারি নেবুলা ও নাক্ষত্রিক বায়ু জৈব রসায়ন, ডিএনএ/আরএনএ-র ব্যাকবোন, অ্যামাইনো অ্যাসিড।
কোর-ক্ল্যাপস সুপারনোভা (টাইপ ২) অক্সিজেন ($^{16}\text{O}$), সিলিকন ($^{28}\text{Si}$), ম্যাগনেসিয়াম, সালফার বিস্ফোরিত দানব নক্ষত্র ($M > 8 M_\odot$) বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন, পাথুরে গ্রহের ভূতক ($\text{SiO}_2$)।
টাইপ ১এ সুপারনোভা (শ্বেত বামন) লোহা ($^{56}\text{Fe}$), নিকেল, ক্রোমিয়াম, কোবাল্ট ডিজেনারেট শ্বেত বামনের থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ রক্তের হিমোগ্লোবিন, পৃথিবীর গলিত লোহার কোর ও চৌম্বক ক্ষেত্র।
নিউট্রন তারার সংঘর্ষ (কিলোনোভা) সোনা ($^{197}\text{Au}$), প্ল্যাটিনাম ($^{195}\text{Pt}$), ইউরেনিয়াম ($^{238}\text{U}$) দুটি নিউট্রন তারার আপেক্ষিকীয় সংঘর্ষ অলঙ্কার, পারমাণবিক জ্বালানি, পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরীণ তেজস্ক্রিয় তাপ।
কসমিক রে স্প্যালেশন বোরন ($^{11}\text{B}$), বেরিলিয়াম ($^9\text{Be}$), লিথিয়াম ($^6\text{Li}$) মহাজাগতিক রশ্মির আঘাতে পরমাণুর ভাঙন দুর্লভ খনিজ, আধুনিক ইলেকট্রনিক্স খাদ।

কার্ল সাগানের অমর সত্য: আমরা সবাই নক্ষত্রের ধূলিকণা

১৯৫৭ সালে মার্গারেট বারবিজ, জিওফ্রে বারবিজ, উইলিয়াম ফাউলার এবং ফ্রেড হয়েল তাদের যুগান্তকারী গবেষণাপত্র “Synthesis of the Elements in Stars” ($B^2FH$) প্রকাশ করেন, যা নাক্ষত্রিক নিউক্লিওসিন্থেসিসের পারমাণবিক ব্লুপ্রিন্ট প্রতিষ্ঠা করে।

তাদের আবিষ্কার মানুষের চেতনায় এনে দিয়েছিল এক অবিস্মরণীয় উপলব্ধি, যাকে পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান চিরন্তন কাব্যে রূপ দিয়েছিলেন: “মহাবিশ্ব আমাদের ভেতরেই রয়েছে। আমরা সবাই নক্ষত্রের উপাদান দিয়ে তৈরি। মহাবিশ্ব যেন নিজেকে নিজে জানার জন্যই আমাদের সৃষ্টি করেছে।”

আমাদের ডিএনএ-র নাইট্রোজেন, হাড়ের ক্যালসিয়াম, রক্তের লোহিত কণিকার লোহা এবং কম্পিউটারের মাইক্রোচিপের সিলিকন সময়ের শুরুতে সৃষ্টি হয়নি। কোটি কোটি বছর আগে যেসব প্রাচীন দানব নক্ষত্র পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বেই মহাকাশে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছিল, তাদের সেই ভস্ম থেকেই তৈরি হয়েছে আমাদের পৃথিবী ও সৌরজগৎ।

মহাবিশ্বের মহাবৃত্তান্তের ষষ্ঠ পর্বে আমরা দেখব কীভাবে এই রাসায়নিকভাবে সমৃদ্ধ গ্যাস মেঘগুলো মহাকর্ষের নৃত্যে একত্রিত হয়ে নির্মাণ করেছিল মহাজাগতিক দ্বীপপুঞ্জ: ছায়াপথের স্থাপত্য — সর্পিল বাহু, অতি-দানব ব্ল্যাক হোল এবং আমাদের মিল্কিওয়ে।

বৈজ্ঞানিক তথ্যসূত্র ও প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি

  • Burbidge, E. M., Burbidge, G. R., Fowler, W. A., & Hoyle, F. (1957). “Synthesis of the Elements in Stars.” Reviews of Modern Physics, 29(4), 547–650. doi:10.1103/RevModPhys.29.547.
  • Bethe, H. A. (1939). “Energy Production in Stars.” Physical Review, 55(5), 434–456. doi:10.1103/PhysRev.55.434.
  • Woosley, S. E., Heger, A., & Weaver, T. A. (2002). “The evolution and explosion of massive stars.” Reviews of Modern Physics, 74(4), 1015–1071. doi:10.1103/RevModPhys.74.1015.
  • Abbott, B. P., et al. (LIGO Scientific Collaboration and Virgo Collaboration) (2017). “GW170817: Observation of Gravitational Waves from a Binary Neutron Star Inspiral.” Physical Review Letters, 119(16), 161101. doi:10.1103/PhysRevLett.119.161101.
  • Thielemann, F.-K., et al. (2011). “What are the sources of the r-process?” Progress in Particle and Nuclear Physics, 66(2), 346–353. doi:10.1016/j.ppnp.2011.01.032.
  • Nomoto, K., Kobayashi, C., & Tominaga, N. (2013). “Nucleosynthesis in Stars and the Chemical Enrichment of Galaxies.” Annual Review of Astronomy and Astrophysics, 51(1), 457–509. doi:10.1146/annurev-astro-082812-140956.