অস্তিত্বের শুরুর প্রথম কুড়ি মিনিটে সমগ্র মহাবিশ্ব একটি অখণ্ড, মহাজাগতিক থার্মোনিউক্লিয়ার চুল্লি (thermonuclear reactor) হিসেবে কাজ করেছিল। এই অতি-উত্তপ্ত অগ্নিকুণ্ডে, পদার্থের মৌলিক গাঠনিক উপাদানগুলো এক প্রায়-ঘর্ষণহীন মুক্ত কোয়ার্কের তরল থেকে আত্মপ্রকাশ করে, প্রতিপদার্থের সাথে মহাপ্রলয়ঙ্কর সংঘর্ষে অলৌকিকভাবে টিকে থাকে, এবং ফিউশনের মাধ্যমে ঠিক সেই আদিম রাসায়নিক অনুপাতে রূপান্তরিত হয়—৭৫% হাইড্রোজেন এবং ২৫% হিলিয়াম—যা আজও রাতের আকাশে জ্বলতে থাকা প্রতিটি নক্ষত্রের মূল জ্বালানি।
তড়িদ্দুর্বল যুগ ($10^{-12}\text{ সেকেন্ড}$): কণা কীভাবে ভর লাভ করল
মহাজাগতিক স্ফীতি (Cosmic Inflation) শেষ হওয়ার পর এবং পুনঃউত্তাপন (Reheating)-এর প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পর মহাবিশ্ব তড়িদ্দুর্বল যুগে (Electroweak Epoch) প্রবেশ করে। তখন সমগ্র মহাবিশ্ব লেপটন, কোয়ার্ক এবং গেজ বোসনের এক তীব্র আপেক্ষিকীয় স্যুপে নিমজ্জিত ছিল, যার তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল $10^{15}\text{ কেলভিন}$ ($E \sim 100\text{ GeV}$)। এই অবিশ্বাস্য শক্তিমাত্রায় তড়িচ্চুম্বকীয় বল এবং দুর্বল নিউক্লীয় বলের মাঝে কোনো পার্থক্য ছিল না; তারা একটি সমন্বিত $SU(2)_L \times U(1)_Y$ তড়িদ্দুর্বল গেজ প্রতিসাম্যের অধীনস্থ ছিল।
তখনকার প্রতিটি মৌলিক কণা ছিল সম্পূর্ণ ভরহীন এবং তারা স্থান জুড়ে আলোর গতিবেগে ছুটে চলত। কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের প্রায় $10^{-12}\text{ সেকেন্ড}$ পর মহাবিশ্বের তাপমাত্রা সংকটকালীন তড়িদ্দুর্বল সীমার ($T_c \approx 160\text{ GeV}$) নিচে নেমে আসে। স্কেলার হিগস ক্ষেত্র (scalar Higgs field) তখন তড়িদ্দুর্বল প্রতিসাম্য ভাঙন (Electroweak Symmetry Breaking) ঘটায় এবং শূন্যস্থান প্রত্যাশিত মানে ($v \approx 246\text{ GeV}$) স্থিতিশীল হয়:
- দুর্বল গেজ বোসনসমূহ ($W^+$, $W^-$, এবং $Z^0$): হিগস ক্ষেত্রের সাথে প্রচণ্ড শক্তিতে আবদ্ধ হয়ে বিপুল পরিমাণ জড় স্থিতিভর লাভ করে ($\approx 80.4\text{ GeV}$ এবং $91.2\text{ GeV}$)। যেহেতু এদের বাহক কণাগুলো ভারী হয়ে গেল, দুর্বল নিউক্লীয় বল তাত্ক্ষণিকভাবে একটি স্বল্প-পাল্লার বলে রূপ নিল, যা কেবল পরমাণুর অতি-ক্ষুদ্র দূরত্বের ($10^{-18}\text{ মিটার}$) ভেতরেই কাজ করতে পারে।
- ফোটন ($\gamma$): হিগস ক্ষেত্রের সাথে সম্পূর্ণ অবিচ্ছিন্ন থেকে যায় এবং এর স্থিতিভর শূন্যই রয়ে যায়। এর ফলে তড়িচ্চুম্বকত্ব একটি অসীম পাল্লার বলে রূপান্তরিত হয়, যা অক্ষত $U(1)_{em}$ প্রতিসাম্য দ্বারা পরিচালিত।
- ফার্মিয়নসমূহ (কোয়ার্ক ও চার্জযুক্ত লেপটন): হিগস ঘনীভবনের সাথে ইউকাওয়া কাপলিংয়ের (Yukawa coupling) মাধ্যমে পৃথক পৃথক ভর লাভ করে। টপ কোয়ার্ক সবচেয়ে তীব্রভাবে আবদ্ধ হয়ে সবচেয়ে ভারী কণিকায় ($173\text{ GeV}$) পরিণত হয়, অন্যদিকে ইলেকট্রন খুব দুর্বলভাবে আবদ্ধ হয়ে স্বল্প ভর ($0.511\text{ MeV}$) লাভ করে।
কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা: মহাবিশ্বের “নিখুঁত তরল”
$10^{-12}$ থেকে $10^{-5}\text{ সেকেন্ড}$-এর মধ্যবর্তী সময়ে মহাবিশ্ব পদার্থের এমন এক চরম অবস্থায় অবস্থান করছিল, যা পৃথিবীতে কেবল ব্রুকহ্যাভেনের আরএইচআইসি (RHIC) এবং সার্নের এলএইচসি (LHC)-র সংঘর্ষ প্রকোষ্ঠে এক সেকেন্ডের কোটি ভাগের এক ভগ্নাংশের জন্য তৈরি করা সম্ভব হয়েছে: কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা (Quark-Gluon Plasma বা QGP)।
সাধারণ পৃথিবীতে শক্তিশালী নিউক্লীয় বল পরিচালিত হয় কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিক্স (QCD) কালার কনফাইনমেন্ট দ্বারা: কোয়ার্ক কখনো মুক্ত অবস্থায় থাকতে পারে না। আপনি যদি দুটি কোয়ার্ককে পরস্পরের থেকে টেনে আলাদা করার চেষ্টা করেন, তাদের মধ্যবর্তী গ্লুয়ন ফ্লাক্স টিউবে সঞ্চিত শক্তি রৈখিকভাবে বাড়তে থাকে, যতক্ষণ না শূন্যস্থান থেকে নতুন একটি কোয়ার্ক-অ্যান্টিকোয়ার্ক জোড়া তৈরি করা শক্তির দিক থেকে সুবিধাজনক হয় ($E = mc^2$)।
১৯৭৩ সালে ডেভিড গ্রস, ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক এবং ডেভিড পলিৎজার প্রমাণ করেন যে অতি-উচ্চ শক্তিমাত্রা এবং ক্ষুদ্রতম দূরত্বে শক্তিশালী বলের ধ্রুবক $\alpha_s$ লগারিদমিক হারে হ্রাস পায়। আদিম মহাবিশ্বে, যখন ঘনত্ব পারমাণবিক ঘনত্বের চেয়েও বেড়ে গিয়েছিল ($\rho > 10^{18}\text{ kg/m}^3$) এবং তাপমাত্রা $2 \times 10^{12}\text{ কেলভিন}$ ($T > 170\text{ MeV}$) ছাড়িয়েছিল, তখন হ্যাড্রনগুলো গলে গিয়ে কোয়ার্ক, অ্যান্টিকোয়ার্ক ও গ্লুয়ন সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে প্লাজমা হিসেবে ভাসতে শুরু করেছিল।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সার্ন ও ব্রুকহ্যাভেনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে এই কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা কোনো গ্যাসীয় কণার মতো আচরণ করেনি। এটি ছিল প্রকৃতিতে পরিমাপ করা সবচেয়ে নিখুঁত কোয়ান্টাম তরল, যার সান্দ্রতা ও এন্ট্রপি ঘনত্বের অনুপাত ($\eta/s$) ইতিহাসে সর্বনিম্ন—যা কোভতুন-সন-স্টারিনেটস (KSS) মৌলিক কোয়ান্টাম সীমার কাছাকাছি:
$$\frac{\eta}{s} \approx \frac{\hbar}{4\pi k_B}$$
আদিম মহাবিশ্ব কোনো অগোছালো গ্যাসের মেঘ ছিল না; এটি ছিল এক অতি-ঘন, ঘর্ষণহীন নিখুঁত তরল (perfect liquid), যা কোয়ান্টাম ঘূর্ণিতে আন্দোলিত হচ্ছিল।
ব্যারোজেনেসিসের রহস্য: কেন মহাবিশ্বে পদার্থের অস্তিত্ব আছে?
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গভীরতম অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি হলো: আমাদের মহাবিশ্ব কেন প্রায় সম্পূর্ণভাবে কেবল পদার্থ দিয়ে গঠিত, যেখানে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের পরিমাণ সমান হওয়ার কথা ছিল? কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্স (QED) এবং স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সমীকরণগুলো প্রায় নিখুঁতভাবে প্রতিসম: যখনই বিশুদ্ধ শক্তি যুগল সৃষ্টির মাধ্যমে পদার্থে রূপান্তরিত হয় ($\gamma + \gamma \to q + \bar{q}$), তখন সমান সংখ্যক কণা এবং প্রতিকণা তৈরি হয়।
আদিম মহাবিশ্বে যদি এই প্রতিসাম্য সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ থাকত, তবে তাপমাত্রা কমার সাথে সাথে প্রতিটি কোয়ার্ক একটি অ্যান্টিকোয়ার্কের মুখোমুখি হতো এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গামা-রশ্মি ফোটনে পরিণত হতো:
$$q + \bar{q} \to \gamma + \gamma$$
ফলস্বরূপ, মহাবিশ্ব পরিণত হতো সম্পূর্ণ প্রাণহীন, শীতল বিকিরণের এক শূন্য প্রান্তরে—যেখানে কোনো প্রোটন, নিউট্রন, পরমাণু, নক্ষত্র বা মানুষের কোনো অস্তিত্ব থাকত না। কিন্তু বাস্তবে আমরা পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে প্রায় $10^{80}$ প্রোটন ও নিউট্রন দেখতে পাই, অথচ কোথাও আদিম প্রতিপদার্থের কোনো ম্যাক্রোস্কোপিক সন্ধান মেলে না।
আন্দ্রেই সাখারভের তিনটি শর্ত (১৯৬৭)
১৯৬৭ সালে সোভিয়েত পারমাণবিক পদার্থবিদ আন্দ্রেই সাখারভ একটি প্রতিসম অবস্থা থেকে নেট ব্যারিয়ন অসমতা সৃষ্টির জন্য তিনটি অপরিহার্য গাণিতিক শর্ত চিহ্নিত করেছিলেন:
- ১. ব্যারিয়ন সংখ্যা ($B$) লঙ্ঘন: এমন ভৌত প্রক্রিয়া থাকতে হবে যা মোট ব্যারিয়ন সংখ্যা সংরক্ষণ করে না। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে তড়িদ্দুর্বল স্ফ্যালেরন (sphaleron) রূপান্তর $B$ লঙ্ঘন করতে পারে। গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড তত্ত্বে অতি-ভারী বোসনের ক্ষয়ে সরাসরি অসম সংখ্যক কোয়ার্ক ও লেপটন উৎপন্ন হয়।
- ২. $C$ এবং $CP$ প্রতিসাম্য লঙ্ঘন: চার্জ কনজুগেশন ($C$) এবং প্যারিটি মিলিয়ে $CP$ প্রতিসাম্য অবশ্যই লঙ্ঘিত হতে হবে। যদি $CP$ নিখুঁত থাকত, তবে পদার্থ সৃষ্টির বিক্রিয়ার হার ($\Gamma(X \to q + q)$) প্রতিপদার্থ সৃষ্টির হারের ($\Gamma(\bar{X} \to \bar{q} + \bar{q})$) হুবহু সমান হতো, ফলে কোনো উদ্বৃত্ত থাকত না।
- ৩. তাপীয় ভারসাম্যহীনতা (Departure from Thermal Equilibrium): নিখুঁত তাপীয় ভারসাম্যে CPT উপপাদ্য গ্যারান্টি দেয় যে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের ঘনত্ব সর্বদা সমান থাকবে। তাই ব্যারিয়ন সৃষ্টির বিক্রিয়াগুলোকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণকালীন দ্রুত ভারসাম্যহীন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঘটতে হয়েছিল।
এই তিনটি শর্ত পূরণ হওয়ার ফলেই এক অতি-সূক্ষ্ম অসমতার জন্ম হয়েছিল: প্রতি ১,০০০,০০০,০০০ অ্যান্টিকোয়ার্কের বিপরীতে ছিল ১,০০০,০০০,০০১টি কোয়ার্ক। তাপমাত্রা কমতেই যখন মহাপ্রলয়ঙ্কর পারস্পরিক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটল, তখন এক বিলিয়ন জোড়া কোয়ার্ক-অ্যান্টিকোয়ার্ক একে অপরকে বিলীন করে এক তীব্র আলোর সাগরে রূপ নিল। আমাদের সমগ্র দৃশ্যমান মহাবিশ্ব—প্রতিটি গ্যালাক্সি, প্রতিটি কার্বন পরমাণু, এক ফোঁটা পানি এবং আপনার মস্তিষ্ক—সেই একশো কোটির মাঝে বেঁচে যাওয়া মাত্র ১টি নিঃসঙ্গ কণার উদ্বৃত্ত দিয়ে তৈরি!
হ্যাড্রোনাইজেশন ($t \approx 10^{-5}\text{ সেকেন্ড}$): প্রোটন ও নিউট্রনের স্ফটিকায়ন
বিগ ব্যাংয়ের ১০ মাইক্রোসেকেন্ডের মাথায় ($10^{-5}\text{ s}$) মহাবিশ্বের তাপমাত্রা নেমে আসে $1.7 \times 10^{12}\text{ কেলভিন}$ ($150\text{ MeV}$)-এ। এই তাপমাত্রায় শক্তিশালী কাপলিং ধ্রুবক $\alpha_s$ এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা আর মুক্ত থাকতে পারে না। মহাবিশ্ব QCD কনফাইনমেন্ট দশান্তর বা হ্যাড্রোনাইজেশন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে।
গ্লুয়ন বিনিময়ের মাধ্যমে কোয়ার্কগুলো চিরতরে আবদ্ধ হয়ে বর্ণ-নিরপেক্ষ যৌগিক কণা (হ্যাড্রন)-এ পরিণত হয়:
- প্রোটন ($p = uud$): দুটি আপ কোয়ার্ক ($+2/3 e$) এবং একটি ডাউন কোয়ার্ক ($-1/3 e$), যার মোট চার্জ $+1$। এটি চিরস্থায়ীভাবে স্থিতিশীল।
- নিউট্রন ($n = udd$): একটি আপ কোয়ার্ক ($+2/3 e$) এবং দুটি ডাউন কোয়ার্ক ($-1/3 e$), যার মোট চার্জ $0$। একটি মুক্ত নিউট্রন প্রোটনের চেয়ে সামান্য ভারী ($\Delta m \approx 1.293\text{ MeV}$) এবং বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে ($n \to p + e^- + \bar{\nu}_e$) প্রায় ৮৭৯ সেকেন্ডের (১৪.৬ মিনিট) অর্ধায়ু নিয়ে প্রোটনে রূপান্তরিত হয়।
- মেসন ($\pi^+, \pi^-, \pi^0$): কোয়ার্ক-অ্যান্টিকোয়ার্ক জোড়া, যা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ফোটন ও লেপটনে রূপ নেয়।
এরপর মহাবিশ্ব লেপটন যুগে ($t \approx 10^{-5}\text{ s থেকে } 1\text{ সেকেন্ড}$) প্রবেশ করে। তাপমাত্রা তখনও প্রচুর ইলেকট্রন-পজিট্রন জোড়া তৈরির জন্য যথেষ্ট ছিল। বিগ ব্যাংয়ের ঠিক $1\text{ সেকেন্ড}$ পর ($T \approx 10^{10}\text{ K} \approx 1\text{ MeV}$), দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার হার হাবল সম্প্রসারণ হারের চেয়ে কমে যায়। নিউট্রিনো প্লাজমা থেকে বিচ্ছিন্ন (Decouple) হয়ে যায়, যা স্থান জুড়ে মুক্তভাবে প্রবাহিত হয়ে তৈরি করে মহাজাগতিক পটভূমি নিউট্রিনো (Cosmic Neutrino Background বা C$\nu$B)—যা আজও ১.৯৫ কেলভিন তাপমাত্রায় সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে নিঃশব্দে বিরাজ করছে।
বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস ($t = 10\text{ সেকেন্ড থেকে } 20\text{ মিনিট}$): আদিম পরমাণুর জন্ম
বিগ ব্যাংয়ের ১০ সেকেন্ড থেকে ২০ মিনিটের মধ্যবর্তী সময়ে মহাবিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক রূপান্তর সংঘটিত হয়: বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস (Big Bang Nucleosynthesis বা BBN)। মহাজাগতিক ইতিহাসে প্রথম ও শেষবারের মতো সমগ্র মহাবিশ্ব এক সর্বব্যাপী পারমাণবিক ফিউশন চুল্লি হিসেবে কাজ করেছিল।
১. নিউট্রন ও প্রোটনের ফ্রিজ-আউট অনুপাত
লেপটন যুগের শুরুতে প্রোটন ও নিউট্রন দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একে অপরে রূপান্তরিত হচ্ছিল:
$$n + \nu_e \leftrightarrow p + e^- \quad \text{এবং} \quad n + e^+ \leftrightarrow p + \bar{\nu}_e$$
যেহেতু নিউট্রন প্রোটনের চেয়ে $1.293\text{ MeV}$ ভারী, বোল্টজম্যান বণ্টন কম শক্তির প্রোটন অবস্থাকে অগ্রাধিকার দেয় ($n/p \propto e^{-\Delta m / k_B T}$)। তাপমাত্রা যখন $0.8\text{ MeV}$ ($t \approx 1\text{ s}$)-এর নিচে নামল, দুর্বল বিক্রিয়াগুলো মহাজাগতিক সম্প্রসারণের সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে নিউট্রন ও প্রোটনের অনুপাত স্থির হয়ে যায় (Freeze-out) প্রায় $n/p \approx 1/6$ মানে।
পরবর্তী কয়েক মিনিটে মুক্ত নিউট্রনগুলো বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে ক্ষয় হতে থাকে ($n \to p + e^- + \bar{\nu}_e$)। ফিউশন যখন সক্রিয়ভাবে শুরু হলো, অনুপাতটি নেমে দাঁড়ায় প্রায় $n/p \approx 1/7$ (প্রতি ৭টি প্রোটনের বিপরীতে ১টি নিউট্রন)।
২. ডয়টেরিয়াম বাধা (The Deuterium Bottleneck)
ভারী মৌল তৈরি করতে হলে প্রথমে একটি প্রোটন ও একটি নিউট্রনকে যুক্ত করে ডয়টেরিয়াম (ভারী হাইড্রোজেন) তৈরি করতে হয়:
$$p + n \to {}^2\text{H} + \gamma$$
ডয়টেরিয়ামের বন্ধন শক্তি অত্যন্ত ভঙ্গুর: মাত্র $E_b = 2.22\text{ MeV}$। যদিও মহাবিশ্বের গড় তাপমাত্রা $2.22\text{ MeV}$-এর নিচে ছিল, কিন্তু ফোটন ও ব্যারিয়নের অনুপাত ছিল বিশাল—প্রতিটি ব্যারিয়নের বিপরীতে প্রায় ২০০ কোটি ফোটন ($\eta \approx 6 \times 10^{-10}$)। ব্ল্যাকবডি বিকিরণের উচ্চ-শক্তির প্ল্যাঙ্কিয়ান প্রান্তে কোটি কোটি গামা-রশ্মি ফোটন নতুন তৈরি হওয়া ডয়টেরিয়ামকে পলকের মাঝে ভেঙে আবার প্রোটন ও নিউট্রনে আলাদা করে দিচ্ছিল।
এই বিলম্বকে বলা হয় ডয়টেরিয়াম বাধা (Deuterium Bottleneck)। তাপমাত্রা যতক্ষণ না $8 \times 10^8\text{ কেলভিন}$ ($0.08\text{ MeV}$, প্রায় $t \approx 3\text{ মিনিট}$)-এ নামল, ততক্ষণ ফিউশন শুরুই হতে পারেনি।
৩. হিলিয়াম-৪-এ ফিউশন ক্যাসকেড
ডয়টেরিয়াম টিকে থাকার মতো পরিবেশ তৈরি হতেই কয়েক সেকেন্ডের বিস্ফোরক শৃঙ্খল বিক্রিয়ায় উপলব্ধ সমস্ত নিউট্রন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়:
- ${}^2\text{H} + p \to {}^3\text{He} + \gamma$ (হিলিয়াম-৩)
- ${}^2\text{H} + n \to {}^3\text{H} + \gamma$ (ট্রিটিয়াম)
- ${}^2\text{H} + {}^2\text{H} \to {}^3\text{He} + n$
- ${}^3\text{H} + {}^2\text{H} \to {}^4\text{He} + n$ (হিলিয়াম-৪)
- ${}^3\text{He} + {}^2\text{H} \to {}^4\text{He} + p$ (হিলিয়াম-৪)
যেহেতু হিলিয়াম-৪ (${}^4\text{He}$) নিউক্লিয়াসের বন্ধন শক্তি অবিশ্বাস্য রকমের দৃঢ় ($28.3\text{ MeV}$, বা নিউক্লিয়ন প্রতি $7.07\text{ MeV}$), এটি একটি নিউক্লিয়ার “ব্ল্যাক হোল”-এর মতো আচরণ করে—উপলব্ধ প্রায় প্রতিটি নিউট্রন হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াসে বন্দী হয়ে যায়। ১টি নিউট্রন বনাম ৭টি প্রোটনের অনুপাত থেকে অতি সহজ একটি গণনায় সমগ্র মহাবিশ্বের আদিম রাসায়নিক ভর অনুপাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
১৬টি নিউক্লিয়নের একটি দল কল্পনা করুন: ২টি নিউট্রন এবং ১৪টি প্রোটন (১:৭ অনুপাত)। ২টি নিউট্রন ২টি প্রোটনের সাথে যুক্ত হয়ে ১টি ${}^4\text{He}$ নিউক্লিয়াস গঠন করে (যার মোট ভর = ৪)। এর ফলে অবশিষ্ট থাকে $14 – 2 = 12$টি মুক্ত প্রোটন (হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস, ভর = ১২)।
অতএব হিলিয়াম-৪-এর ভর ভগ্নাংশ দাঁড়ায়:
$$Y_p = \frac{\text{হিলিয়ামের ভর}}{\text{মোট ভর}} = \frac{4}{4 + 12} = \frac{4}{16} = 25\%$$
বাকি ৭৫% ব্যারিয়নিক ভর মুক্ত প্রোটন হিসেবে থেকে যায়—যা সাধারণ হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস।
৪. কেন বিগ ব্যাং কার্বন বা লোহা তৈরি করতে পারল না?
কেন নিউক্লিওসিন্থেসিস হিলিয়ামেই থেমে গেল? কেন বিশাল নক্ষত্রের মতো মহাবিশ্ব কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন বা লোহা পর্যন্ত ফিউশন চালিয়ে যেতে পারল না?
প্রকৃতিতে দুটি অলঙ্ঘনীয় পারমাণবিক প্রাচীর রয়েছে: ভর সংখ্যা $A = 5$ বা $A = 8$-এর কোনো স্থিতিশীল আইসোটোপ নেই। হিলিয়াম-৪ যদি একটি প্রোটন বা নিউট্রন শোষণ করে, তবে তা তৈরি করে ${}^5\text{Li}$ বা ${}^5\text{He}$, যা এক সেকেন্ডের ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগে ($10^{-21}\text{ s}$) চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। আবার দুটি হিলিয়াম-৪ যুক্ত হলে তৈরি হয় বেরিলিয়াম-৮ (${}^8\text{Be}$), যার অর্ধায়ু মাত্র $10^{-16}\text{ সেকেন্ড}$ এবং তা সাথে সাথে ভেঙে আবার দুটি আলফা কণায় রূপ নেয়।
দানবাকৃতির নক্ষত্রের কেন্দ্রে ট্রিপল-আলফা প্রক্রিয়ার (${}^4\text{He} + {}^4\text{He} + {}^4\text{He} \to {}^{12}\text{C}$) মাধ্যমে এই বাধা অতিক্রম করা সম্ভব হয়, যার জন্য প্রয়োজন বছরের পর বছর ধরে অপরিসীম ঘনত্ব ও মাধ্যাকর্ষণ। কিন্তু আদিম মহাবিশ্বে সম্প্রসারণের বেগ ছিল এত তীব্র যে বিগ ব্যাংয়ের মাত্র ২০ মিনিটের মাথায় তাপমাত্রা ও ঘনত্ব ফিউশন বন্ধ হওয়ার স্তরে নেমে যায়। মহাজাগতিক পারমাণবিক চুল্লির দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
ভারী মৌলগুলোর মধ্যে কেবল অতি-নগণ্য ভগ্নাংশ টিকে থাকতে পেরেছিল: কিছু অবিক্রীত ডয়টেরিয়াম (${}^2\text{H}/\text{H} \approx 2.5 \times 10^{-5}$), হিলিয়াম-৩ (${}^3\text{He}/\text{H} \approx 10^{-5}$) এবং এক চিমটি লিথিয়াম-৭ (${}^7\text{Li}/\text{H} \approx 1.6 \times 10^{-10}$)।
কালানুক্রমিক সারণী: কোয়ার্ক স্যুপ থেকে প্রথম পারমাণবিক নিউক্লিয়াস
| পর্যায় / যুগ | অতিবাহিত সময় | তাপমাত্রা ($K$) | শক্তিমাত্রা | প্রধান ভৌত রূপান্তর |
|---|---|---|---|---|
| তড়িদ্দুর্বল প্রতিসাম্য ভাঙন | $10^{-12}\text{ s}$ | $10^{15}\text{ K}$ | $100\text{ GeV}$ | হিগস ক্ষেত্র ভ্যাকুয়াম মান লাভ করে; $W^\pm, Z^0$ ভর লাভ করে; তড়িচ্চুম্বকত্ব ও দুর্বল বল আলাদা হয়ে যায়। |
| কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা (QGP) | $10^{-12} \text{ থেকে } 10^{-5}\text{ s}$ | $> 2 \times 10^{12}\text{ K}$ | $> 170\text{ MeV}$ | অ্যাসিম্পটোটিক ফ্রিডম; কোয়ার্ক ও গ্লুয়ন মুক্তভাবে শূন্য-সান্দ্রতার নিখুঁত তরল হিসেবে প্রবাহিত হয়। |
| ব্যারোজেনেসিস যুগ | $10^{-11} \text{ থেকে } 10^{-6}\text{ s}$ | $\sim 10^{13}\text{ K}$ | $\sim 1\text{ GeV}$ | সাখারভ শর্তাবলির অধীনে প্রতি ১০০ কোটিতে ১টি পদার্থের উদ্বৃত্ত সৃষ্টি; পারস্পরিক ধ্বংসযজ্ঞে আলোর সাগরের উৎপত্তি। |
| হ্যাড্রোনাইজেশন | $10^{-5}\text{ s}$ ($10\text{ \mu s}$) | $1.7 \times 10^{12}\text{ K}$ | $150\text{ MeV}$ | কালার কনফাইনমেন্ট কোয়ার্ককে প্রোটন ($uud$) ও নিউট্রনে ($udd$) চিরতরে আবদ্ধ করে। |
| নিউট্রিনো বিচ্ছিন্নকরণ (Decoupling) | $1.0\text{ s}$ | $10^{10}\text{ K}$ | $1\text{ MeV}$ | দুর্বল বল ফ্রিজ-আউট হয়; $n/p$ অনুপাত প্রায় ১:৬-এ স্থির হয়; মহাজাগতিক পটভূমি নিউট্রিনো (C$\nu$B) মুক্ত হয়। |
| ডয়টেরিয়াম বাধা | $10 \text{ থেকে } 180\text{ s}$ | $10^9 \text{ থেকে } 8 \times 10^8\text{ K}$ | $0.1\text{ MeV}$ | উচ্চ ফোটন-ব্যারিয়ন অনুপাতের কারণে ফিউশনে বিলম্ব; নিউট্রন ক্ষয় হয়ে অনুপাত ১:৭-এ পৌঁছায়। |
| আদিম নিউক্লিওসিন্থেসিস (BBN) | $3 \text{ থেকে } 20\text{ min}$ | $8 \times 10^8 \text{ থেকে } 3 \times 10^8\text{ K}$ | $< 0.05\text{ MeV}$ | পারমাণবিক ফিউশন শৃঙ্খল; ৭৫% ${}^1\text{H}$, ২৫% ${}^4\text{He}$, সামান্য ডয়টেরিয়াম ও লিথিয়াম তৈরি হয়। মহাজাগতিক সম্প্রসারণ ফিউশন থামিয়ে দেয়। |
মহাজাগতিক উত্তরাধিকার: বিগ ব্যাংয়ের স্বর্ণালি আঙুলের ছাপ
মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (CMB) এবং মহাজাগতিক লোহিত অপসরণ (Redshift)-এর পাশাপাশি বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস বিগ ব্যাং মডেলের সবচেয়ে মজবুত ও অভ্রান্ত তিনটি পর্যবেক্ষণমূলক স্তম্ভের একটি। ১৯৪৮ সালে রাল্ফ আলফার, হ্যান্স বেথে এবং জর্জ গ্যামো তাদের যুগান্তকারী $\alpha\beta\gamma$ গবেষণাপত্রে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে আদিম মহাবিশ্বের সিংহভাগ উপাদানই হতে হবে মহাবিশ্বের শুরুর কুড়ি মিনিটে তৈরি হওয়া হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম।
প্রাচীনতম বামন গ্যালাক্সি এবং ধাতুমুক্ত আন্তঃগ্যালাকটিক গ্যাস মেঘের আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণ এই হিসাবের অভ্রান্ত সত্যতা নিশ্চিত করেছে: মহাবিশ্বে আদিম হিলিয়ামের ভর অনুপাত পরিমাপ করা হয়েছে $Y_p = 0.245 \pm 0.003$, যা বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিসের গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে দশমিকের পর শতভাগ মিলে যায়! ডয়টেরিয়ামের অনুপাত মহাবিশ্বের মোট ব্যারিয়নিক পদার্থের ঘনত্বকে ($\Omega_b h^2 \approx 0.022$) নিখুঁতভাবে সীমাবদ্ধ করে, যা প্রমাণ করে যে আমাদের পরিচিত সাধারণ পারমাণবিক পদার্থ মহাবিশ্বের মোট শক্তি ঘনত্বের মাত্র ৫%।
মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছিল। পারমাণবিক নিউক্লিয়াসগুলো গঠিত হয়েছিল। কিন্তু মহাবিশ্ব তখনও মুক্ত ইলেকট্রন ও প্রোটনের এক অন্ধ, অস্বচ্ছ প্লাজমা কুয়াশায় আচ্ছন্ন ছিল, যেখানে আলো এক পা-ও ভ্রমণ করতে পারত না। মহাবিশ্বের মহাবৃত্তান্তের তৃতীয় পর্বে আমরা উন্মোচন করব মহাকাশের প্রথম আলো ফোটার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ: আকাশের উন্মোচন — রিকম্বিনেশন, মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ এবং ১০ কোটি বছরের অন্ধকার যুগ।
বৈজ্ঞানিক তথ্যসূত্র ও প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি
- Alpher, R. A., Bethe, H., & Gamow, G. (1948). “The Origin of Chemical Elements.” Physical Review, 73(7), 803–804. doi:10.1103/PhysRev.73.803.
- Sakharov, A. D. (1967). “Violation of CP Invariance, C Asymmetry, and Baryon Asymmetry of the Universe.” JETP Letters, 5, 24–27.
- Gross, D. J., & Wilczek, F. (1973). “Ultraviolet Behavior of Non-Abelian Gauge Theories.” Physical Review Letters, 30(26), 1343–1346. doi:10.1103/PhysRevLett.30.1343.
- Kovtun, P. K., Son, D. T., & Starinets, A. O. (2005). “Viscosity in Strongly Coupled Gauge Theories from AdS/CFT.” Physical Review Letters, 94(11), 111601. doi:10.1103/PhysRevLett.94.111601.
- Fields, B. D., Olive, K. A., Yeh, T. H., & Young, C. (2020). “Big-Bang Nucleosynthesis after Planck.” Journal of Cosmology and Astroparticle Physics, 2020(03), 010. doi:10.1088/1475-7516/2020/03/010.
- Weinberg, S. (1977). The First Three Minutes: A Modern View of the Origin of the Universe. Basic Books.