একটি বেহালা বা তানপুরার তারে আঙুল দিয়ে মৃদু টান দিন। টানটান তারের ওপর দিয়ে চোখের পলকে একটি অদৃশ্য কম্পন ছুটে যাবে এবং বাতাসের ঘন-লঘু স্তরের মধ্য দিয়ে আপনার কানে মধুর সুর হিসেবে ধরা দেবে। ১৭৪৬ সালে ফরাসি বহুবিদ্যাবিশারদ জঁ ল্য রোঁ দালঁবের (Jean le Rond d’Alembert) এক মৌলিক প্রশ্ন তুললেন: একটি কম্পমান তার ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে? তার অনুসন্ধানের মধ্য দিয়েই মানব ইতিহাসের প্রথম আংশিক ব্যবকলনীয় সমীকরণ (Partial Differential Equation) জন্ম নেয়: তরঙ্গ সমীকরণ (The Wave Equation)। বাদ্যযন্ত্রের তার, সাগরের সুনামি, ভূকম্পন তরঙ্গ থেকে শুরু করে অপটিক্যাল ফাইবারের আলোক তরঙ্গ এবং কোয়ান্টাম কণার তরঙ্গরূপ—সমগ্র মহাবিশ্ব মূলত দালঁবেরের এই সমীকরণের ছন্দে নৃত্যরত।
১. সমীকরণের পরিচয়: কালের ত্বরণ ও স্থানের বক্রতার মিলন
এক-মাত্রিক স্থানে চিরায়ত তরঙ্গ সমীকরণটি কোনো তরঙ্গের সরণ ফিল্ড $u(x, t)$-এর সময়ের সাপেক্ষে দ্বিতীয় অন্তরককে স্থানের সাপেক্ষে দ্বিতীয় অন্তরকের সাথে সম্পর্কিত করে:
ত্রি-মাত্রিক স্থানে সমীকরণটি ল্যাপ্লাসিয়ান অপারেটর $nabla^2 = frac{partial^2}{partial x^2} + frac{partial^2}{partial y^2} + frac{partial^2}{partial z^2}$ গ্রহণের মাধ্যমে সার্বজনীন রূপ ধারণ করে:
এই সংক্ষিপ্ত সমীকরণটি একটি বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সত্য প্রকাশ করে: সময়ের সাপেক্ষে কোনো বিন্দুর ত্বরণ তার নিকটবর্তী পরিবেশের স্থানিক বক্রতার সমানুপাতিক।
- $u(mathbf{x}, t)$ (সরণ ক্ষেত্র): $t$ সময়ে $mathbf{x}$ স্থানে তরঙ্গের বিস্তার। তারের ক্ষেত্রে এটি উলম্ব সরণ; শব্দের ক্ষেত্রে বাতাসের চাপের বিচ্যুতি $Delta p$; আলোর ক্ষেত্রে তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রের মান $mathbf{E}$ ও $mathbf{B}$।
- $frac{partial^2 u}{partial t^2}$ (সময়ের সাপেক্ষে ত্বরণ): কোনো বিন্দু কত দ্রুত কাঁপছে এবং তার গতির পরিবর্তনের হার।
- $nabla^2 u$ (স্থানিক বক্রতা বা ল্যাপ্লাসিয়ান): নির্দেশ করে একটি নির্দিষ্ট বিন্দু তার চারপাশের প্রতিবেশীদের গড় মানের চেয়ে কতটা উঁচুতে বা নিচুতে রয়েছে। তারের কোনো চূড়ায় বক্রতা ঋণাত্মক হওয়ায় প্রত্যয়নী বল তাকে নিচের দিকে ত্বরণ দেয়।
- $v$ (তরঙ্গের গতিবেগ): মাধ্যমের মধ্য দিয়ে তরঙ্গের শক্তি স্থানান্তরের সসীম গতিবেগ: টানটান তারের ক্ষেত্রে $v = sqrt{T/mu}$ (যেখানে $T$ হলো টান এবং $mu$ হলো একক দৈর্ঘ্যের ভর)।
২. নিউটনের গতিসূত্র থেকে সমীকরণটির প্রতিপাদন
দালঁবের কীভাবে এই সম্পর্কে পৌঁছান তা বুঝতে একটি টানটান তারের অতি-ক্ষুদ্র অংশ $dx$ বিবেচনা করি ($x$ থেকে $x + dx$ পর্যন্ত), যার প্রতি একক দৈর্ঘ্যের ভর $mu$ এবং টান $T$। এই ক্ষুদ্র অংশের ভর $dm = mu , dx$।
বাম প্রান্ত $x$-এ টান কাজ করে কোণ $theta_1$-এ, এবং ডান প্রান্ত $x+dx$-এ কোণ $theta_2$-এ। ক্ষুদ্র বিস্তারের জন্য খাড়া বলের উপাংশগুলো হলো:
অতএব, এই ক্ষুদ্র অংশের ওপর প্রযুক্ত মোট উলম্ব বল $dF_y$ হলো দুই প্রান্তের টানের বিয়োগফল:
নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রানুসারে, প্রযুক্ত বল = ভর $times$ ত্বরণ ($dF_y = (mu , dx) frac{partial^2 u}{partial t^2}$):
উভয় পাশ থেকে ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্য $dx$ বর্জন করে এবং তরঙ্গের গতিবেগ $v = sqrt{T/mu}$ বসালে পাওয়া যায় অমর এক-মাত্রিক তরঙ্গ সমীকরণ:
৩. দালঁবেরের গতিশীল তরঙ্গ সমাধান
দালঁবের এই সমীকরণটি সমাধানের জন্য দুটি নতুন চলক ব্যবহার করেন: $xi = x – vt$ এবং $eta = x + vt$। এর মাধ্যমে সমীকরণটি একটি অতি সহজ রূপে রূপান্তরিত হয়:
এর সাধারণ সমাধান হলো:
এর গভীর তাৎপর্য হলো: মহাবিশ্বের যেকোনো তরঙ্গ মূলত দুটি বিপরীতমুখী স্বাধীন তরঙ্গের সমষ্টি। $f(x – vt)$ রূপান্তরহীনভাবে ডানদিকে $v$ গতিবেগে ছুটে চলা তরঙ্গ, আর $g(x + vt)$ বামদিকে ধাবমান তরঙ্গ। এরা যখন সীমাবদ্ধ সীমানায় প্রতিফলিত হয়, তখন তৈরি হয় সুসংগত স্থির তরঙ্গ (Standing Wave), যার ফলে গিটার বা সেতারের সুর সৃষ্টি হয়।
৪. ম্যাক্সওয়েল, আলোকবিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় তরঙ্গ
- ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ: ১৮৬৫ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দেখান যে তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্র শূন্য মাধ্যমে দালঁবেরের ত্রি-মাত্রিক তরঙ্গ সমীকরণ মেনে চলে: $nabla^2 mathbf{E} = frac{1}{c^2} frac{partial^2 mathbf{E}}{partial t^2}$। এখান থেকেই প্রমাণিত হয় যে আলো মূলত এক প্রকার বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ।
- ভূকম্পনবিদ্যা (Seismology): ভূমিকম্পের সময় পৃথিবীর ভূত্বক দিয়ে প্রাইমারি (P) এবং সেকেন্ডারি (S) তরঙ্গ প্রবাহিত হয়, যার গতিবেগ পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর তরল বহিস্থ কোরের সন্ধান পান।
- শ্রোডিঙ্গারের কোয়ান্টাম বলবিদ্যা: ১৯২৬ সালে এরভিন শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ মূলত কোয়ান্টাম কণার সম্ভাব্যতা তরঙ্গের ব্যবকলনীয় রূপ।