চারশো কোটি বছর আগে, তরুণ সূর্যের ম্লান আলোয় উদ্ভাসিত মহাসমুদ্রবেষ্টিত আদিম পৃথিবীতে মহাজাগতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য রূপান্তরটি ঘটেছিল: নির্জীব ভূ-রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো স্বয়ংক্রিয় এবং স্ব-প্রতিলিপিকরণক্ষম প্রাণরসায়নের সীমারেখা অতিক্রম করেছিল। বিদ্যুৎ চমকের আকস্মিক কোনো দৈব দুর্ঘটনায় নয়, বরং গভীর সমুদ্রের ক্ষারীয় হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের জটিল গোলকধাঁধায় গ্রহের অসম রাসায়নিক ভারসাম্য মুক্ত করার এক অনিবার্য তাপগতীয় পরিণতি হিসেবেই প্রাণের স্ফুলিঙ্গ প্রজ্বলিত হয়েছিল।
১. সাম্যাবস্থাহীন তাপগতিবিদ্যা এবং গ্রহীয় বিভবের মুক্তি
শাস্ত্রীয় তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রানুসারে ($dS \ge \frac{dQ}{T}$), যেকোনো ভৌত ব্যবস্থা সময়ের সাথে সাথে সর্বোচ্চ এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু জীবন্ত কোষ হলো প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সাম্যাবস্থাহীন অপচয়মূলক কাঠামো (non-equilibrium dissipative structure)। ১৯৪৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানী এরউইন শ্রোডিঙ্গার তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন, জীবন পরিবেশ থেকে অনবরত ঋণাত্মক এনট্রপি ($\Delta S < 0$) গ্রহণ করে নিজেকে তাপগতীয় ভারসাম্য বা মৃত্যুর দিকে বিলীন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
হেডিয়ান যুগের আদি পৃথিবী ছিল মূলত একটি বিশাল প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল ব্যাটারি। পৃথিবীর ম্যান্টল এবং ক্রাস্টে ছিল বিজারিত লোহা, আণবিক হাইড্রোজেন ($\text{H}_2$) এবং মিথেনের প্রাচুর্য; বিপরীতে মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড ($\text{CO}_2$) এবং সালফার ডাই-অক্সাইডের প্রাচুর্য ছিল। হাইড্রোজেন গ্যাস দ্বারা কার্বন ডাই-অক্সাইডকে বিজারিত করে জৈব কার্বক্সিলিক অ্যাসিড ও মিথেন তৈরি করা তাপগতীয়ভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক:
$$\text{CO}_2 + 4\text{H}_2 \to \text{CH}_4 + 2\text{H}_2\text{O} \quad (\Delta G^\circ = -131\text{ kJ/mol})$$তবে এই বিপুল মুক্ত শক্তি থাকা সত্ত্বেও ($\Delta G < 0$) সাধারণ পরিবেশে এই বিক্রিয়াটি এক বিশাল অ্যাক্টিভেশন শক্তি বাধার সম্মুখীন হয়। বিশেষ অনুঘটক ছাড়া পানিতে দ্রবীভূত $\text{CO}_2$ এবং $\text{H}_2$ কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্রিয়া করতে পারে না। প্রকৃতির এমন একটি অবিচ্ছিন্ন চুল্লি প্রয়োজন ছিল যা একই সাথে ট্রানজিশন ধাতব অনুঘটক সরবরাহ করবে এবং ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল শক্তির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ বজায় রাখবে।
২. ক্ষারীয় হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট: প্রাণের ভূ-রাসায়নিক ইঞ্জিন
১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে ভূ-রসায়নবিদ মাইকেল রাসেল এক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রস্তাব করেন: অগভীর পুকুর কিংবা ফুটন্ত আগ্নেয়গিরির ব্ল্যাক স্মোকারে নয়, বরং মাঝারি তাপমাত্রার ক্ষারীয় সাবমেরিন হাইড্রোথার্মাল ভেন্টেই প্রাণের জন্ম হয়েছিল, যা বর্তমানের ‘লস্ট সিটি’ হাইড্রোথার্মাল ফিল্ডের অনুরূপ।
সার্পেন্টিনাইজেশন নামক একটি তাপমোচী বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই ভেন্টগুলো সৃষ্টি হয়, যেখানে অলিভিন সমৃদ্ধ আল্ট্রাম্যাফিক ম্যান্টল শিলা মাঝারি তাপমাত্রায় ($১০০\text{–}১৫০^\circ\text{C}$) সমুদ্রের পানির সাথে বিক্রিয়া করে:
$$(\text{Mg},\text{Fe})_2\text{SiO}_4 + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2 \to \text{Mg}_3\text{Si}_2\text{O}_5(\text{OH})_4 + \text{Mg(OH)}_2 + \text{Fe}_3\text{O}_4 + \text{H}_2$$এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন পানি অত্যন্ত ক্ষারীয় ($\text{pH } ৯\text{–}১১$) এবং প্রচুর আণবিক হাইড্রোজেনে পরিপূর্ণ হয়ে সমুদ্রতলে উদগিরিত হয়। প্রাচীন হেডিয়ান সাগরের পানি আগ্নেয়গিরির গ্যাসে পরিপূর্ণ থাকার কারণে ছিল অম্লীয় ($\text{pH } ৫.৫\text{–}৬.০$)। ক্ষারীয় তরল এবং অম্লীয় সমুদ্রের সংযোগস্থলে লোহা ও সালফাইড যুক্ত হয়ে ম্যাকিনাউইট ($\text{FeS}$) ও গ্রেইগাইটের ($\text{Fe}_3\text{S}_4$) অণুবীক্ষণিক ফাঁপা ছিদ্রযুক্ত অজৈব শিলার স্তম্ভ বা চিমনি তৈরি করে।
এই ন্যানোমিটার-পাতলা খনিজ প্রাচীরের অভ্যন্তরে ছিল ক্ষারীয় মাধ্যম এবং বাইরে ছিল অম্লীয় সামুদ্রিক পানি, যেখানে প্রোটনের ($\text{H}_3\text{O}^+$) ঘনত্ব ভেতরের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। এর ফলে খনিজ প্রাচীরটির দুই পাশে প্রাকৃতিকভাবে প্রায় $৪\text{ থেকে }৫\text{ pH একক}$-এর প্রোটন ঘনত্বের নতিমাত্রা তৈরি হয়েছিল:
$$\Delta p = \Delta \Psi – \frac{2.303 R T}{F} \Delta \text{pH} \approx ১৮০\text{–}২২০\text{ mV}$$আশ্চর্যজনক সত্য হলো, এই প্রাকৃতিক প্রোটন-মোটিভ ফোর্সটির মান আধুনিক পৃথিবীর প্রতিটি জীবকোষের মাইটোকন্ড্রিয়া বা ঝিল্লিতে এটিপি (ATP) তৈরির জন্য ব্যবহৃত কেমিওসমোটিক বিভবের প্রায় সমান! জীববৈজ্ঞানিক প্রোটিন বা জিনোম সৃষ্টির কোটি বছর আগেই হেডিয়ান পৃথিবী এক নিখুঁত জৈব-বৈদ্যুতিক শক্তির ইঞ্জিন প্রস্তুত করে রেখেছিল।
৩. আরএনএ বিশ্ব: জিনোটাইপ এবং ফিনোটাইপের মেলবন্ধন
জীববিজ্ঞানে বহু দশক ধরে একটি অমীমাংসিত ধাঁধা ছিল: কোষের জেনেটিক তথ্য সংরক্ষণের জন্য ডিএনএ প্রয়োজন, অথচ সেই ডিএনএ প্রতিলিপিকরণের জন্য প্রোটিন এনজাইম অপরিহার্য। এনজাইম ছাড়া ডিএনএ অকেজো, আবার ডিএনএ ছাড়া প্রোটিন তৈরি অসম্ভব—তাহলে কোনটি আগে এসেছিল?
১৯৮০-এর দশকে টমাস চেক এবং সিডনি অল্টম্যান কর্তৃক রাইবোজাইম (অনুঘটক হিসেবে সক্রিয় আরএনএ অণু) আবিষ্কারের মাধ্যমে এই ধাঁধার সমাধান মেলে, যার জন্য তাঁরা ১৯৮৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। আরএনএ একই সাথে জিনের মতো তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে (জিনোটাইপ) এবং প্রোটিনের মতো ত্রিমাত্রিক গঠনে ভাঁজ হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিচালনা করতে পারে (ফিনোটাইপ)। এ থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আরএনএ বিশ্ব’ (RNA World) অনুকল্প।
আধুনিক জীববিজ্ঞানে এই আদিম যুগের সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো আমাদের কোষের রাইবোজোম। রাইবোজোমের পেপটাইডাইল ট্রান্সফারেজ সেন্টার—যেখানে অ্যামিনো অ্যাসিড জোড়া লেগে প্রোটিন তৈরি হয়—তার সক্রিয় কেন্দ্রের ১৮ অ্যাংস্ট্রমের মধ্যে কোনো প্রোটিন নেই; সেটি পুরোপুরি ক্যাটালাইটিক আরএনএ (rRNA) দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ রাইবোজোম প্রকৃতপক্ষে একটি প্রাচীন রাইবোজাইম।
ম্যাগনেসিয়াম ($\text{Mg}^{2+}$) আয়নের উপস্থিতিতে আরএনএ এমন এক চমৎকার ভাঁজ তৈরি করে যা নতুন নিউক্লিওটাইডের ফসফেটে নিউক্লিওফিলিক আক্রমণ ঘটিয়ে ফসফোডাইএস্টার বন্ধন তৈরি করে এবং প্রোটিন ছাড়াই নিজের পলিমার শৃঙ্খলকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
৪. প্রাক-জৈবিক আবরণ: প্রোটোসেলের সূচনা ও প্রাকৃতিক নির্বাচন
পাথরের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে আরএনএ প্রতিলিপিত হতে পারলেও উন্মুক্ত পানিতে এটি মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়ে: প্রসারণ ও ক্ষয়। খোলা পানিতে তৈরি হওয়া নতুন আরএনএ অণুগুলো চারদিকে ছড়িয়ে হারিয়ে যায়। তদুপরি, কোনো কর্মক্ষম রাইবোজাইম তৈরি হলে তার সুফল অন্য অকেজো মিউট্যান্ট আরএনএ অণুগুলোও ভোগ করতে থাকে।
ডালউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন শুরু হওয়ার জন্য জিন এবং তার কর্মক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট আবরণের মধ্যে আটকে রাখা অপরিহার্য ছিল। এই সংকট দূর করে ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোটোসেল-এর আত্মপ্রকাশ।
আধুনিক কোষের জটিল ফসফোলিপিডের তুলনায় আদিম পৃথিবীর ঝিল্লিগুলো ছিল অলিক, লরিক বা মিরিস্টিক অ্যাসিডের মতো সাধারণ একক-শিকল ফ্যাটি অ্যাসিডের সমন্বয়ে গঠিত। পানিতে এদের ঘনত্ব একটি নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে এরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দ্বি-স্তরী গোলক বা ভেসিকল গঠন করে। এটি ঘটে হাইড্রোফোবিক ইফেক্ট-এর কারণে: পানির অণুগুলো ফ্যাটি অ্যাসিডের হাইড্রোকার্বন লেজের চারপাশে আটকে না থেকে মুক্ত হয়, যার ফলে এনট্রপি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় ($+\Delta S_{\text{solvent}}$):
$$\Delta G_{\text{assembly}} = \Delta H – T \Delta S < 0$$এই আদিম ফ্যাটি অ্যাসিড ঝিল্লির এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল: এর দ্রুত ফ্লিপ-ফ্লপ গতির কারণে এতে সাময়িক ক্ষুদ্র ছিদ্র তৈরি হতো। এই ছিদ্র দিয়ে মনোমার অণু—যেমন রাইবোজ শর্করা ও নিউক্লিওটাইড—সহজেই কোষের ভেতরে ঢুকতে পারত। কিন্তু কোষের ভেতরের রাইবোজাইম যখন তাদের জুড়ে দীর্ঘ আরএনএ পলিমার তৈরি করত ($M_w > 1000\text{ Da}$), তখন আকারে বড় এবং ঋণাত্মক আধানযুক্ত হওয়ায় তারা আর বাইরে বের হতে পারত না।
অধিকন্তু, দ্রবণে নতুন ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত হলে প্রোটোসেলের পৃষ্ঠতল প্রসারিত হয়ে লম্বা নলের আকার ধারণ করত। সমুদ্রের ঢেউ বা স্রোতের মৃদু আলোড়নেই এই লম্বা নলের মতো কাঠামোটি বিভক্ত হয়ে দুটি অপত্য কোষে পরিণত হতো, কোনো জটিল প্রোটিন ছাড়াই!
উপসংহার: প্রাণের মাহেন্দ্রক্ষণ
প্রায় ৩৮০ কোটি বছর আগে প্রাক-জৈবিক পৃথিবীর সমস্ত উপাদানগুলো একত্রিত হয়েছিল। ক্ষারীয় হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের গভীরে লোহা-সালফার খনিজ কার্বন বিজারণকে ত্বরান্বিত করেছিল, প্রোটন গ্র্যাডিয়েন্ট নিরবচ্ছিন্ন শক্তি যুগিয়েছিল, আরএনএ একই সাথে জিন ও এনজাইমের ভূমিকা নিয়েছিল এবং ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোটোসেল প্রথম স্বাধীন সত্তার জন্ম দিয়েছিল।
এভাবেই মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের আদিমতম সাধারণ পূর্বপুরুষ—লুকা (LUCA)-র জন্য। ২য় পর্বে আমরা আলোচনা করব কীভাবে আধুনিক ফাইলোজেনোমিক্স লুকার ৩৫৫টি জিনের সন্ধান পেয়েছে এবং কীভাবে আদিম কোষগুলো ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়া—এই দুই চিরন্তন ধারায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Russell, M. J., & Hall, A. J. (1997). The emergence of life from iron monosulphide bubbles at a submarine hydrothermal redox and pH front. Journal of the Geological Society, 154(3), 377–402.
- Martin, W., & Russell, M. J. (2003). On the origins of cells: a hypothesis for the evolutionary transitions from abiotic geochemistry to chemoautotrophic prokaryotes. Philosophical Transactions of the Royal Society of London. Series B, 358(1429), 59–85.
- Cech, T. R. (1986). A model for the RNA-catalyzed replication of RNA. PNAS, 83(12), 4360–4363.
- Szostak, J. W., Bartel, D. P., & Luisi, P. L. (2001). Synthesizing life. Nature, 409(6818), 387–390.
- Lane, N. (2015). The Vital Question: Why Is Life the Way It Is? Profile Books / W. W. Norton.