তিনশো কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর বুকে জীবনের সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল এককোষী স্তরে। প্রতিটি কোষ খাদ্যের জন্য একে অপরের সাথে নির্মম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল, যত দ্রুত সম্ভব নিজের প্রতিলিপি তৈরি করাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু ভয়াবহ ক্রায়োজেনিয়ান স্নোবল আর্থ বরফযুগের শেষে, প্রায় ৬০ কোটি বছর আগে, জীববিজ্ঞানে এক অবিশ্বাস্য সমবায় চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো: স্বাধীন কোষেরা তাদের একক প্রজনন ক্ষমতা বিসর্জন দিয়ে একত্রিত হয়ে তৈরি করল এক একটি জটিল, বিশেষায়িত ও বহুকোষী প্রাণিদেহ। অগভীর ও অক্সিজেনসমৃদ্ধ সাগরে জন্ম নিল শান্ত, অদ্ভুত ও পরাবাস্তব এক ম্যাক্রোস্কোপিক জগৎ—ইডিয়াকারান উদ্যান।

১. বহুকোষী জীবনের জিনগত হাতিয়ার: সংলগ্নতা ও সংকেত ব্যবস্থা

বহুকোষী জীবনের উদ্ভাবন জীববিজ্ঞানে কোনো একক ঘটনা নয়; ছত্রাক, স্লাইম মোল্ড, লোহিত শৈবাল এবং সবুজ উদ্ভিদের মধ্যে এটি স্বাধীনভাবে অন্তত ২৫ বার উদ্ভাবিত হয়েছে। তবে জটিল প্রাণী বা মেটাজোয়া (Metazoa)-র জন্ম সাধারণ কোষের স্তূপ তৈরির চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল।

একটি কার্যকর প্রাণিদেহ তৈরি করার জন্য প্রকৃতির তিনটি মৌলিক আণবিক টুলের প্রয়োজন ছিল:

  1. কোষীয় সংলগ্নতা (Cell Adhesion): দুটি কোষকে আঠার মতো শক্ত করে জোড়া লাগিয়ে রাখা যেন টিস্যু বা কলা ছিঁড়ে না যায়।
  2. বহিঃকোষীয় মাতৃকা (Extracellular Matrix): কোলাজেনের মতো নমনীয় সুতোর জাল যা গোটা প্রাণিদেহকে একটি নির্দিষ্ট আকৃতি ও যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করবে।
  3. স্থানিক সংকেত ও মরফোজেনেসিস: এমন রাসায়নিক যোগাযোগ ব্যবস্থা যার ফলে অভিন্ন ডিএনএ থাকা সত্ত্বেও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে কোষেরা ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গে (পেশি, স্নায়ু, ত্বক) রূপান্তরিত হতে পারে।
Cadherin-Catenin Zipper and Integrin-ECM Focal Adhesions
চিত্র ৫.১: মেটাজোয়ার আণবিক বন্ধন ব্যবস্থা। বামে: ক্যালসিয়াম আয়নের ($\text{Ca}^{2+}$) সাহায্যে ক্যাডারিন প্রোটিনের জিপার-সদৃশ সংযোগ, যা বিটা ও আলফা ক্যাটেনিনের মাধ্যমে কোষের অভ্যন্তরীণ অ্যাক্টিন সাইটোস্কেলিটনের সাথে যুক্ত থাকে। ডানে: ইন্টিগ্রিন হেটেরোডাইমার যা প্লাজমা মেমব্রেন ভেদ করে কোলাজেন ফাইবারের সাথে যুক্ত হয়ে টিস্যুকে টানটান ও দৃঢ় রাখে।

২০০৮ সালে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী নিকোল কিং প্রাণীদের নিকটতম এককোষী আত্মীয় Monosiga brevicollis নামক চোয়ানোফ্ল্যাজেলেটের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স করে এক চমকপ্রদ সত্য উন্মোচন করেন: প্রাণীদের বহুকোষী দেহ গঠনের মৌলিক উপাদানগুলো প্রথম প্রাণীর জন্মের কোটি কোটি বছর আগেই এককোষী জীবের দেহে উপস্থিত ছিল!

এককোষী চোয়ানোফ্ল্যাজেলেটের দেহে আগে থেকেই ক্যাডারিন, লেকটিন এবং টাইরোসিন কাইনেজ সংকেত ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। তবে এককোষী অবস্থায় তারা এই আঠালো প্রোটিনগুলো টিস্যু বানাতে নয়, বরং সমুদ্রের পানিতে ভেসে বেড়ানো ব্যাকটেরিয়া শিকার করে আটকে রাখার জন্য ব্যবহার করত। বহুকোষী প্রাণীর বিবর্তন ছিল একটি অপূর্ব রূপান্তর: ব্যাকটেরিয়া শিকারের সেই আঠালো প্রোটিনগুলোকেই পরবর্তীতে নিজের অপত্য কোষকে জোড়া লাগিয়ে প্রথম এপিথেলিয়াল স্তর বা ত্বক তৈরির কাজে ব্যবহার করা হলো।

অধিকন্তু, প্রাণীদের টিস্যুর ভিত্তি হলো টাইপ-৪ কোলাজেন। কোলাজেনের ট্রিপল হেলিক্স ফাইবার তৈরি করতে গেলে প্রোলিন ও লাইসিন অ্যামিনো অ্যাসিডে হাইড্রক্সিল গ্রুপ যুক্ত করার জন্য আণবিক অক্সিজেন অপরিহার্য। পর্যাপ্ত অক্সিজেন ছাড়া কোলাজেন তৈরি অসম্ভব; আর কোলাজেন ছাড়া প্রাণীর শরীর গঠিত হতে পারে না। ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের মাত্রা না বাড়া পর্যন্ত বহুকোষী প্রাণী সৃষ্টি হওয়া রসায়নের নিয়মেই অসম্ভব ছিল।

Dickinsonia Costata and Fractal Rangeomorph Morphogenesis
চিত্র ৫.২: ইডিয়াকারান প্যারাডাইম। বামে: ডিকিনসোনিয়া কস্টাটা (Dickinsonia costata) যার দেহে গ্লাইড প্রতিসাম্য এবং স্তরযুক্ত বাতাস-ভরা গদির মতো বৃদ্ধি দেখা যায়। ২০১৮ সালে এতে ৯৩% প্রাণিজ কোলেস্টেরল আবিষ্কারের মাধ্যমে এর প্রাণী পরিচয় নিশ্চিত হয়। ডানে: চার্নিয়া ম্যাসোনি (Charnia masoni) যার দেহে ৪র্থ-মাত্রার ফ্র্যাক্টাল শাখা দেখা যায়, যা পরিপাকতন্ত্র ছাড়াই ত্বক দিয়ে দ্রবীভূত পুষ্টি শুষে নিত।

২. ইডিয়াকারান উদ্যান: ফ্র্যাক্টাল ফার্ন ও বাতাস-ভরা গদি

প্রায় ৫৭.৫ থেকে ৫৪.১ কোটি বছর আগে শান্ত ও আলোড়িতহীন নিওপ্রোটেরোজয়িক সাগরে এক অপূর্ব ও পরাবাস্তব ম্যাক্রোস্কোপিক জীবজগৎ গড়ে উঠেছিল: ইডিয়াকারান বায়োটা (Ediacaran Biota)।

১৯৪৬ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ইডিয়াকারা পাহাড়ে রেজিনাল্ড স্প্রিগ কর্তৃক প্রথম আবিষ্কৃত এই অদ্ভুত জীবাশ্মগুলো বিজ্ঞানীদের দশকের পর দশক বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। এদের শরীরে কোনো শক্ত খোলস, চোয়াল, দাঁত, চোখ বা ডানা ছিল না। দেখতে এগুলো ছিল বাতাস-ভরা কুশনযুক্ত গদি, পাতার মতো ডালপালা বা বৃত্তাকার ডিস্কের মতো।

আদি ইডিয়াকারান যুগের প্রধান অধিবাসী ছিল রেঞ্জিওমর্ফ (যেমন চার্নিয়া ম্যাসোনি)। রেঞ্জিওমর্ফদের দেহের গঠন ছিল এক নিখুঁত গাণিতিক বিস্ময়: সেলফ-সিমিলার ফ্র্যাক্টাল শাখা। একটি প্রধান পাতা বিভক্ত হতো কয়েকটি উপ-পাতায়, সেগুলো আবার ক্ষুদ্রতর উপ-শাখায় এবং সেগুলো আরও ক্ষুদ্রতর সূক্ষ্মতম শাখায়—৪র্থ মাত্রা পর্যন্ত এই ফ্র্যাক্টাল পুনরাবৃত্তি ঘটত। এর ফলে তাদের দেহের ক্ষেত্রফল হতো সুবিশাল। মুখ বা পরিপাকতন্ত্র না থাকায় তারা অসমোট্রফি প্রক্রিয়ায় তাদের চামড়া দিয়ে সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত জৈব কার্বন ও পুষ্টি সরাসরি শুষে নিত।

এই যুগের সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী হলো ডিকিনসোনিয়া—একটি সমতল, ডিম্বাকৃতি জীব যা লম্বায় এক মিটারেরও বেশি হতো। জার্মান বিজ্ঞানী অ্যাডলফ সেইলাখার মনে করতেন এরা বর্তমানের কোনো প্রাণীর পূর্বপুরুষ নয়, বরং বহুকোষী জীবনের সম্পূর্ণ বিলুপ্ত এক স্বাধীন পরীক্ষা, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘ভেন্ডোবায়োন্টা’ (Vendobionta)।

২০১৮ সালে রাশিয়ার শ্বেত সাগরের খাড়া পাহাড় থেকে সংগৃহীত ডিকিনসোনিয়া জীবাশ্মের আণবিক বিশ্লেষণ করে অস্ট্রেলীয় গবেষক ইলিয়া বোব্রোভস্কি এই বিতর্কের চির অবসান ঘটান। গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফিতে দেখা গেল, জীবাশ্মের পাথরে ৯৩% প্রাণিজ কোলেস্টেরয়েড (কোলেস্টেরল) অক্ষত রয়েছে, যেখানে আশেপাশের শ্যাওলাতে তা ছিল মাত্র ১০%। অর্থাৎ ডিকিনসোনিয়া কোনো ছত্রাক বা শৈবাল ছিল না; সে ছিল পৃথিবীর আদিমতম সত্যিকারের প্রাণী!

Cryogenian Glacial Weathering and the Rise of Kimberella
চিত্র ৫.৩: পরিবেশগত অনুঘটক ও বাইলেটারিয়ান চলন। বামে: স্নোবল আর্থের হিমবাহ মহাদেশীয় শিলা গুঁড়িয়ে বিপুল ফসফরাস ($\text{PO}_4^{3-}$) সাগরে মিশিয়ে সবুজ শৈবালের মহাবিস্ফোরণ ঘটায়। ডানে: কিম্বেরোলা কোয়াড্রাটা—পেশিবহুল পা ও চামড়ার খোলসযুক্ত আদিম দ্বিপার্শ্বীয় প্রাণী, যা দাঁতের সাহায্যে জীবাণুস্তর চেঁছে খাওয়ার পাখাসদৃশ দাগ (Radulichnus) রেখে গেছে।

৩. পরিবেশের ধাক্কা এবং দ্বিপার্শ্বীয় প্রাণীদের উত্থান

শত কোটি বছর ধরে অণুজীবের রাজত্ব চলার পর হঠাৎ কেন এই ম্যাক্রোস্কোপিক বহুকোষী প্রাণের বিস্ফোরণ ঘটল?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে ঠিক পূর্ববর্তী ক্রায়োজেনিয়ান তুষারযুগের (Snowball Earth) নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্যে। স্টারশিয়ান ও মারিনোয়ান হিমবাহে কিলোমিটার-পুরু বরফের চাদর কোটি কোটি বছর ধরে মহাদেশীয় গ্রানাইট ও ব্যাসল্ট শিলাকে দানবাকৃতির জাঁতাকলের মতো পিষে মিহি পাথুরে ধূলিকণায় পরিণত করেছিল। বরফ যখন গলল, সেই বরফগলা পানির ঢল ট্রিলিয়ন টন খনিজ উপাদান সমুদ্রের বুকে ভাসিয়ে নিয়ে এলো।

২০১৭ সালে জোচেন ব্রকস দেখান যে এই ক্ষয়প্রাপ্ত শিলার মাধ্যমে সাগরে এক বিশাল ফসফরাস পালস বা ফসফেটের বন্যা ঘটেছিল। ফসফেট হলো সামুদ্রিক জীবনের প্রধান পুষ্টি। ফসফেটের প্রাচুর্য পেয়ে আদিম সায়ানোব্যাকটেরিয়াকে হটিয়ে সমুদ্রের দখল নিল বড় বড় লিপিডসমৃদ্ধ সবুজ ইউক্যারিওটিক শৈবাল। এর ফলে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আধুনিক মাত্রার ১০–২০ শতাংশে পৌঁছাল, যা প্রাণীদের শরীর ও কোলাজেন তৈরির জন্য পর্যাপ্ত ছিল।

এই সমৃদ্ধ সাগরেই প্রায় ৫৫.৫ কোটি বছর আগে আত্মপ্রকাশ করল এক অসাধারণ জীব: কিম্বেরোলা (Kimberella quadrata)।

স্থবির রেঞ্জিওমর্ফদের বিপরীতে কিম্বেরোলা ছিল একটি গতিশীল দ্বিপার্শ্বীয় প্রাণী (Bilaterian)—যার একটি নির্দিষ্ট অগ্রভাগ, পশ্চাৎভাগ, পিঠ ও পেট ছিল। তার পিঠে ছিল চামড়ার তৈরি শক্ত ঢাকনা, নিচে ছিল শামুকের মতো পেশিবহুল পা এবং সামনে ছিল দাঁতের মতো খাঁজযুক্ত একটি শুঁড়। পাথুরে জীবাশ্মে কিম্বেরোলার সামনে পাখার মতো চেঁছে খাওয়ার দাগ দেখা যায়, যাকে ভূতাত্ত্বিকরা বলেন Radulichnus। এটি প্রমাণ করে কিম্বেরোলাই ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রাণী যে সচেতনভাবে সমুদ্রতলের জীবাণুস্তর চেঁছে খেত।

কিম্বেরোলাই হলো আধুনিক অধিকাংশ প্রাণীর আদি রূপ: তিনটি ভ্রূণস্তর (Triploblastic: এক্টোডার্ম, মেসোডার্ম, এন্ডোডার্ম), একটি পেশিবহুল শরীর এবং সামনে একটি সুগঠিত মাথার সূচনা (Cephalization)। শান্ত ‘ইডিয়াকারান উদ্যান’ যেখানে সবাই কোনো সংঘর্ষ ছাড়া শুয়ে থাকত, তার দিন ফুরিয়ে আসছিল।

উপসংহার: মাটির বিপ্লব ও উদ্যানের পতন

প্রায় ৫৪.১ কোটি বছর আগে শান্ত ইডিয়াকারান জগৎ হঠাৎ করেই বিলীন হয়ে গেল ভূতাত্ত্বিকদের কথিত কৃষি বিপ্লব (Agronomic Revolution)-এর আঘাতে। দ্বিপার্শ্বীয় কৃমিজাতীয় প্রাণীরা সমুদ্রতলের পলির গভীরে লম্বালম্বি গর্ত খুঁড়তে শুরু করল (Bioturbation)।

মাটি খুঁড়ে খাওয়ার এই নতুন অভ্যাসের ফলে শত কোটি বছর ধরে সমুদ্রের তলদেশকে চাদরের মতো ঢেকে রাখা শক্ত মাইক্রোবিয়াল স্তরগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। এর ফলে যেসব শান্ত ইডিয়াকারান জীব মাটির ওপর স্থির হয়ে পুষ্টি শুষে বাঁচত, তারা বাসস্থান হারিয়ে ধ্বংস হয়ে গেল।

তাদের স্থান দখল করল চোখ, চোয়াল ও সাঁতারের পাখনাযুক্ত আগ্রাসী দ্বিপার্শ্বীয় শিকারীরা। হক্স (Hox) জিনের জাদুকরী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা এমন এক বিবর্তনীয় বিস্ফোরণ ঘটাতে যাচ্ছিল যা পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীগোষ্ঠীর জন্ম দেবে। ৬ষ্ঠ পর্বে আমরা প্রবেশ করব সেই রুদ্ধশ্বাস ক্যামব্রিয়ান মহাবিস্ফোরণে।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • King, N., et al. (2008). The genome of the choanoflagellate Monosiga brevicollis and the origin of metazoans. Nature, 451(7180), 783–788.
  • Bobrovskiy, I., et al. (2018). Ancient steroids establish the Ediacaran fossil Dickinsonia as one of the earliest animals. Science, 361(6408), 1246–1249.
  • Narbonne, G. M. (2005). The Ediacara biota: Neoproterozoic origin of animals and their ecosystems. Annual Review of Earth and Planetary Sciences, 33, 421–442.
  • Brocks, J. J., et al. (2017). The rise of algae in Cryogenian oceans and the emergence of animals. Nature, 548(7669), 578–581.
  • Fedonkin, M. A., & Waggoner, B. M. (1997). The Late Precambrian fossil Kimberella is a mollusc-like bilaterian organism. Nature, 388(6645), 868–871.