প্রায় ৩৮০ কোটি বছর আগে, প্যালিওআর্কিয়ান সমুদ্রতলের তপ্ত ও অক্সিজেনহীন আধো-অন্ধকারে এমন এক অণুবীক্ষণিক সত্তার বাস ছিল যার থেকে মাটির প্রতিটি ব্যাকটেরিয়া, ফুটন্ত ঝর্ণার প্রতিটি আর্কিয়া, বনের প্রতিটি সবুজ ঘাস এবং মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিটি চিন্তা প্রত্যক্ষভাবে উদ্ভূত হয়েছে: তিনি হলেন আমাদের সবার শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ—লুকা (LUCA: Last Universal Common Ancestor)। তিনি কোনো মুক্ত সাঁতারু একক জীব ছিলেন না; বরং সমুদ্রতলের ক্ষারীয় হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের খনিজ প্রকোষ্ঠে বাস করা একদল অর্ধ-বিকশিত কোষের সমষ্টি, যারা ভূ-রাসায়নিক শক্তি থেকে জৈব বংশগতির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল।

১. ফাইলোজেনোমিক প্রত্নতত্ত্ব: লুকার আণবিক দেহের পুনর্গঠন

চারশো কোটি বছর আগের কোমল-দেহের অণুজীবদের কোনো পাথুরে জীবাশ্ম অবশিষ্ট থাকা অসম্ভব। তাই আধুনিক বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন ফাইলোজেনোমিক প্রত্নতত্ত্ব (Phylogenomic Archaeology)। হাজার হাজার আধুনিক ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়ার সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করে শক্তিশালী কম্পিউটার অ্যালগরিদমের সাহায্যে তাদের সাধারণ মিলনবিন্দু বা আদিম পূর্বপুরুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছে।

২০১৬ সালে বিখ্যাত নেচার মাইক্রোবায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত উইলিয়াম মার্টিন এবং ম্যাডেলিন ওয়েইসের এক যুগান্তকারী গবেষণায় ১,৮৪৭টি ব্যাকটেরিয়া এবং ১৩৪টি আর্কিয়া প্রজাতির মোট ৬১ লাখ প্রোটিন-কোডিং জিন বিশ্লেষণ করা হয়। অনুভূমিক জিন স্থানান্তর (Horizontal Gene Transfer) বাদ দিয়ে উভয় ধারায় টিকে থাকা আদিম জিনগুলোকে আলাদা করে তাঁরা লুকার মূল জিনোমে ঠিক ৩৫৫টি প্রোটিন-কোডিং জিনের একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা পুনর্গঠন করেন।

LUCA's 355-Gene Minimal Genome and Wood-Ljungdahl Pathway
চিত্র ২.১: লুকার সংরক্ষিত জিনোমিক কোর। ওয়েইস এট আল. (২০১৬) কর্তৃক চিহ্নিত ৩৫৫টি আদিম জিনের চক্রাকার বিন্যাস। এতে স্পষ্ট দেখা যায় অ-চক্রীয় উড-লাংডাহল কার্বন-সংবন্ধন পাথওয়ের প্রাধান্য, যা পরিচালিত হতো অজৈব [4Fe-4S] ফেরেডক্সিন ($E^\circ \approx -৪৫০\text{ mV}$) এবং নিকেল-লোহা কার্বন মনোক্সাইড ডিহাইড্রোজিনেজের শক্তিতে।

এই ৩৫৫টি জিনের কার্যপদ্ধতি পর্যালোচনা করলে লুকার জীবনযাপনের এক নিখুঁত ছবি ফুটে ওঠে:

  • অক্সিজেনহীন রসায়ননির্ভর স্বভোজী: লুকার জিনোমে আণবিক অক্সিজেনের ($\text{O}_2$) কোনো স্থান ছিল না। তার দেহে সাইটোক্রোম বা কুইনোন ছিল না এবং সে অ্যারোবিক শ্বসনে সম্পূর্ণ অক্ষম ছিল।
  • উচ্চ তাপমাত্রাপ্রেমী (থার্মোফাইল): লুকার জিনোমে রিভার্স জাইরেজ এবং হিট-শক প্রোটিন ছিল, যা প্রমাণ করে সে ৬০° থেকে ৮০° সেলসিয়াস তাপমাত্রার উষ্ণ ভেন্ট পরিবেশে বাস করত।
  • উড-লাংডাহল পাথওয়ে (Wood-Ljungdahl Pathway): লুকা অজৈব কার্বন ডাই-অক্সাইড আবদ্ধ করতে ব্যবহার করত উড-লাংডাহল বা রিডাক্টিভ অ্যাসিটাইল-কোএ চক্র। ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়া—উভয় ধারায় প্রাপ্ত এটিই একমাত্র কার্বন সংবন্ধন পথ যা এটিপি খরচ করার বদলে সরাসরি নেট শক্তি উৎপাদন করে।

উড-লাংডাহল প্রক্রিয়ার সার্বিক রাসায়নিক বিক্রিয়াটি তাপমোচী হওয়ায় তা লুকাকে কোষ গঠনের পাশাপাশি শক্তি যোগাত:

$$2\text{CO}_2 + 4\text{H}_2 + \text{HS-CoA} \to \text{CH}_3\text{CO-S-CoA} + 3\text{H}_2\text{O} \quad (\Delta G^{\circ\prime} = -৩৭.৪\text{ kJ/mol})$$

আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, লুকার দেহে অনেক মৌলিক অ্যামিনো অ্যাসিড ও নিউক্লিওটাইড তৈরির সম্পূর্ণ এনজাইম ছিল না এবং আধুনিক এটিপি সিন্থেসের ঘূর্ণায়মান মোটর প্রোটিনেরও অভাব ছিল। এর অর্থ হলো, লুকা তখনো সমুদ্রে স্বাধীনভাবে সাঁতার কাটার মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি; সে ছিল ক্ষারীয় ভেন্টের পাথুরে প্রকোষ্ঠে বন্দি এক আদিম সত্তা, যে বেঁচে থাকার জন্য ভেন্টের খনিজ প্রোটন গ্রেডিয়েন্ট এবং রাসায়নিক গ্যাসের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল ছিল।

The Enantiomeric Lipid Divide: Bacteria vs Archaea
চিত্র ২.২: লিপিডের এন্যান্টিওমেরিক বিভাজন। ব্যাকটেরিয়ার G3P ফ্যাটি অ্যাসিড এস্টার (G3PDH দ্বারা তৈরি) এবং আর্কিয়ার G1P শাখান্বিত আইসোপ্রিনয়েড ইথারের (G1PDH দ্বারা তৈরি) মধ্যকার মৌলিক অমিল। এই এনজাইমগুলোর মধ্যে কোনো মিল না থাকায় প্রকৃত কোষঝিল্লি দুই ধারায় স্বাধীনভাবে দু’বার উদ্ভাবিত হয়েছিল।

২. লিপিড বিভাজন: জীবনের দুই আদিম রাজ্যে বিভক্তি

লুকা যদি সবার একক পূর্বপুরুষ হয়, তবে ইউক্যারিওট সৃষ্টির কোটি কোটি বছর আগেই জীবনের বৃক্ষ কেন প্রধান দুটি ধারায়—ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়া—চিরতরে বিভক্ত হয়ে গেল?

এর সবচেয়ে চমকপ্রদ রাসায়নিক উত্তর হলো লিপিড বিভাজন (The Lipid Divide)। প্রতিটি জীবন্ত কোষের উপাদানগুলোকে ধরে রাখতে এবং জৈব-তড়িৎ বিভব বজায় রাখতে একটি হাইড্রোফোবিক ঝিল্লি বা মেমব্রেন অপরিহার্য। কিন্তু যখন ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়ার কোষঝিল্লি বিশ্লেষণ করা হয়, তখন তাদের মধ্যে এক অলঙ্ঘনীয় রাসায়নিক ব্যবধান চোখে পড়ে:

  1. গ্লিসারলের স্টেরিওকেমিস্ট্রি: ব্যাকটেরিয়ার ঝিল্লি তৈরি হয় $sn\text{-গ্লিসারল-৩-ফসফেট}$ (G3P) দিয়ে, যা তৈরি করে G3PDH এনজাইম। অন্যদিকে আর্কিয়ার ঝিল্লি গঠিত হয় তার দর্পণ প্রতিবিম্ব $sn\text{-গ্লিসারল-১-ফসফেট}$ (G1P) দিয়ে, যা তৈরি করে সম্পূর্ণ ভিন্ন G1PDH এনজাইম। এই দুটি এনজাইমের মধ্যে কোনো জিনগত মিল নেই।
  2. রাসায়নিক বন্ধন: ব্যাকটেরিয়া তাদের হাইড্রোকার্বন শৃঙ্খলকে গ্লিসারলের সাথে যুক্ত করে এস্টার বন্ধন ($\text{-C(=O)-O-}$) দিয়ে। বিপরীতে, আর্কিয়া ব্যবহার করে ইথার বন্ধন ($\text{-C-O-C-}$), যা তাপ ও অ্যাসিডে সহজে ভেঙে যায় না।
  3. হাইড্রোকার্বন শিকল: ব্যাকটেরিয়ার লেজগুলো তৈরি হয় সরল সোজা ফ্যাটি অ্যাসিড দিয়ে। অন্যদিকে আর্কিয়ার লেজ তৈরি হয় আইসোপ্রিনয়েড নামক শাখান্বিত শৃঙ্খল দিয়ে। চরম পরিবেশে থাকা আর্কিয়াদের ঝিল্লি দুটি স্তরের বদলে একটি অভেদ্য মনোলেয়ারে পরিণত হয়, যা ফুটন্ত পানিতেও অক্ষত থাকে।

যেহেতু G1P এবং G3P একে অপরের এন্যান্টিওমার বা প্রতিবিম্ব, তাই একটি জীব কখনো অন্যটিতে ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত হতে পারে না। কোগা এট আল. (১৯৯৮) এবং মার্টিন ও রাসেল (২০০৩) প্রমাণ করেন যে লুকার নিজের কোনো আধুনিক এনজাইমেটিক ফসফোলিপিড ঝিল্লি ছিল না। লুকা বাস করত ক্ষারীয় ভেন্টের ভঙ্গুর অজৈব ও ফ্যাটি অ্যাসিড প্রাচীরে। পরবর্তীতে একটি ধারা এস্টার ঝিল্লি তৈরি করে ব্যাকটেরিয়া হিসেবে এবং অপর ধারাটি ইথার ঝিল্লি তৈরি করে আর্কিয়া হিসেবে পাথর ছেড়ে মুক্ত সাগরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

The Universal Triplet Genetic Code and Translation Complex
চিত্র ২.৩: সার্বজনীন জেনেটিক কোড এবং অনুবাদ প্রক্রিয়া। ৬৪টি ট্রিপলেট কোডনের সার্বজনীন ডিকশনারি, ট্রান্সফার আরএনএ (tRNA) অ্যাডাপ্টার, রাইবোজোমের তিনটি সক্রিয় কেন্দ্র (E, P, A সাইট) এবং ৩য় বেসের ক্রিক ওবল পেয়ারিং।

৩. সার্বজনীন জেনেটিক কোড: লুকার ‘হিমায়িত দুর্ঘটনা’

ঝিল্লির গঠনে জীবন দুটি রাজ্যে বিভক্ত হলেও কোষের ভেতরের জেনেটিক অপারেটিং সিস্টেমটি অবিকল এক রয়ে গেছে। ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে আর্কিয়া, আম গাছ কিংবা মানুষ—পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণকোষে ডিএনএ ও আরএনএ-র ৬৪টি ট্রিপলেট কোডন অবিকল একই ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করে।

১৯৬৮ সালে বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক একে দ্য ফ্রোজেন অ্যাকসিডেন্ট (The Frozen Accident) বা হিমায়িত দুর্ঘটনা বলে অভিহিত করেন। যদিও শুরুর দিকে কোনো নির্দিষ্ট কোডনের সাথে নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডের সংযুক্তি কিছুটা আকস্মিক ছিল, কিন্তু যখন কোষে শত শত প্রোটিন তৈরি শুরু হয়ে গেল, তখন কোনো একটি কোডনের অর্থ সামান্য বদলে গেলেই শত শত জরুরি প্রোটিন এক সাথে বিকল হয়ে যেত। ফলে লুকার যুগে একবার যে জেনেটিক ভাষা নির্ধারিত হয়েছিল, তা চিরকালের জন্য ‘হিমায়িত’ বা স্থায়ী হয়ে গেছে।

অধিকন্তু, ফ্রি-ল্যান্ড ও হার্স্টের গাণিতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের জেনেটিক কোডটি কোটি কোটি বিকল্প কোডের মধ্যে ত্রুটি দূর করার ক্ষেত্রে শীর্ষ ০.০০০১% নিখুঁত। একটি একক অক্ষরের মিউটেশন হলেও নতুন কোডনটি প্রায়শই আগের অ্যামিনো অ্যাসিডেরই সমধর্মী আরেকটি অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করে, ফলে প্রোটিনের গঠন সহজে নষ্ট হয় না:

$$\omega = \frac{K_a}{K_s} \ll 1 \quad (\text{পিউরিফাইং সিলেকশন})$$

এই সার্বজনীনতার কারণেই মানুষের ইনসুলিনের জিন ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে ব্যাকটেরিয়া হুবহু মানুষের ইনসুলিন প্রোটিন তৈরি করতে পারে। বিশুদ্ধ পরিসংখ্যানের বিচারে দুটি স্বাধীন উৎপত্তির জীব অবিকল একই ৬৪টি কোডনের ভাষা গ্রহণ করার সম্ভাবনা $১০^{২৮৬০}$-এ মাত্র একবার! এই জেনেটিক কোডই হলো পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের একই পরিবারভুক্ত হওয়ার সবচেয়ে অকাট্য গাণিতিক প্রমাণ।

উপসংহার: মুক্ত পৃথিবীর পথে

প্রায় ৩৫০ কোটি বছর আগে ব্যাকটেরিয়ার দল এবং আর্কিয়ার দল সমুদ্রতলের ভেন্ট থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। ব্যাকটেরিয়া দখল করে নেয় অগভীর সমুদ্র ও পলিমাটি; আর আর্কিয়া তাদের অভেদ্য ইথার ঝিল্লি নিয়ে জয় করে নেয় ফুটন্ত খনিজ মোহনা ও চরম বৈরী পরিবেশ।

পরবর্তী ৫০ কোটি বছর ধরে পৃথিবী ছিল শুধুই এই আণুবীক্ষণিক জীবনের রাজ্য। কিন্তু সমুদ্রের উপরিভাগে সূর্যের আলোয় ভেসে বেড়ানো সায়ানোব্যাকটেরিয়ার এক দল এমন এক বিধ্বংসী এবং সৃষ্টিশীল রসায়ন আবিষ্কার করতে যাচ্ছিল যা গোটা গ্রহের চেহারাই বদলে দেবে: পানি ভেঙে অক্সিজেন উৎপাদন। ৩য় পর্বে আমরা দেখব সেই সৌরশক্তির মহাবিপ্লব।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • Weiss, M. C., et al. (2016). The physiology and habitat of the last universal common ancestor. Nature Microbiology, 1(9), 16116.
  • Woese, C. R., & Fox, G. E. (1977). Phylogenetic structure of the prokaryotic domain: the primary kingdoms. PNAS, 74(11), 5088–5090.
  • Koga, Y., et al. (1998). Did the last common ancestor have a membrane of lipids with ether or ester linkages? Journal of Molecular Evolution, 46(2), 125–134.
  • Crick, F. H. (1968). The origin of the genetic code. Journal of Molecular Biology, 38(3), 367–379.
  • Freeland, S. J., & Hurst, L. D. (1998). The genetic code is one in a million. Journal of Molecular Evolution, 47(3), 238–248.