আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে যে আমাদের চোখ দুটি যেন ভিডিও ক্যামেরা—বাইরের বাস্তব জগত থেকে আলো এসে রেটিনায় পড়ে এবং সেই সংকেত অপটিক স্নায়ু বেয়ে মস্তিষ্কের পর্দায় বাইরের জগতের হুবহু প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে। আধুনিক কম্পিউটেশনাল স্নায়ুবিজ্ঞান দেখিয়েছে যে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ একটি উল্টো বিভ্রান্তি! আমাদের মস্তিষ্ক কখনোই বাইরের তথ্যের জন্য নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকে না; বরং এটি মাথার ভেতরে তৈরি হওয়া মডেল থেকে সার্বক্ষণিক নিচের দিকে অনুমানের ছবি ছুড়ে দেয়, আর চোখ থেকে আসা সংকেত কেবল সেই অনুমানের ভুলত্রুটি সংশোধন করে। যেমনটি স্নায়ুবিজ্ঞানী অনিল শেঠ বলেছেন: “আমাদের প্রত্যক্ষ বাস্তবতা হলো আসলে একটি নিয়ন্ত্রিত হ্যালুসিনেশন।”

হেলমহোল্টজ ও অবচেতন অনুমান (Unconscious Inference)

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জার্মান বহুবিদ্যাবিশারদ হেরমান ফন হেলমহোল্টজ দৃষ্টিবিজ্ঞানের এক মৌলিক সংকট তুলে ধরেন: রেটিনার দ্বিমাত্রিক বক্রতলে আলো পড়ার কোটি কোটি দৃশ্যপট তৈরি হতে পারে।

তাহলে মস্তিষ্ক কীভাবে প্রতিটি মুহূর্তের তাৎক্ষণিক অর্থ বের করে? হেলমহোল্টজ প্রস্তাব করলেন অবচেতন অনুমান: মস্তিষ্ক পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার সূত্র ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাব্য ভৌত দৃশ্যপটটি কল্পনা করে নেয় এবং সেই অনুমানটিকেই আমাদের সামনে নিখুঁত বাস্তবতা হিসেবে উপহার দেয়।

হায়ারারকিক্যাল প্রেডিক্টিভ কোডিং

১৯৯৯ সালে রাজেশ রাও এবং ডানা ব্যালার্ড হেলমহোল্টজের এই ভাবনাকে আধুনিক গাণিতিক রূপ দিলেন: প্রেডিক্টিভ কোডিং (Predictive Coding)।

মস্তিষ্কের কর্টেক্স সাজানো রয়েছে একাধিক স্তরে। উচ্চতর স্তরগুলো জগত সম্পর্কে পূর্বাভাস বা প্রাক-ধারণা ($mu$) তৈরি করে নিচের দিকে পাঠায়। আর নিচের সংবেদনশীল স্তরগুলো বাইরের সংকেতের ($y$) সাথে এই অনুমানের তুলনা করে বের করে বিচ্যুতি বা পূর্বাভাস ত্রুটি (Prediction Error):

$$text{Prediction Error} = text{বাস্তব সংকেত} – text{পূর্বাভাস}$$

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, চোখ থেকে আসা কাঁচা তথ্য মস্তিষ্কের ওপরের স্তরে যায় না! কেবল এই ‘ভুলের সংকেতটুকু’ ওপরের দিকে ওঠে, যার ভিত্তিতে মস্তিষ্ক নিজের ভেতরের ধারণাকে বদলে ফেলে। শারীরবৃত্তীয়ভাবে মানুষের দৃষ্টি কর্টেক্সে ওপর থেকে নিচে নামা স্নায়ুর সংখ্যা নিচ থেকে ওপরে ওঠা স্নায়ুর চেয়ে প্রায় দশ গুণ বেশি!

কার্ল ফ্রিস্টন ও ফ্রি এনার্জি নীতি

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের স্নায়ুতাত্ত্বিক কার্ল ফ্রিস্টন এই ধারণাকে জীববিজ্ঞানের সার্বজনীন তত্ত্বে রূপ দিলেন—ফ্রি এনার্জি নীতি (Free Energy Principle)।

থার্মোডায়নামিক্সের বিশৃঙ্খলা এড়াতে যেকোনো জীবন্ত মস্তিষ্ককে তথ্যের বিস্ময় বা ত্রুটি কমাতে হয়। এই ভ্যারিয়েশনাল ফ্রি এনার্জি ($F$) কমাতে মস্তিষ্কের হাতে মাত্র দুটি পথ খোলা থাকে:

  1. অনুমানের পরিবর্তন (Perceptual Inference): বাইরের বাস্তবতার সাথে মেলাতে গিয়ে নিজের ভেতরের বিশ্বাস বা মতামত বদলে ফেলা (মন পরিবর্তন)।
  2. সক্রিয় হস্তক্ষেপ (Active Inference): নিজের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাইরের পরিবেশকে শারীরিক কাজের মাধ্যমে বদলে ফেলা (বাস্তবতা পরিবর্তন)।

চেতনা: নিয়ন্ত্রিত হ্যালুসিনেশন

প্রেডিক্টিভ ব্রেন তত্ত্ব চেতনার অর্থকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। আমরা এই মুহূর্তে যা দেখছি—গোলাপের লাল রঙ, সুরের মূর্ছনা বা প্রিয়জনের মুখ—তা বাইরের কোনো পরম বস্তু নয়; তা হলো আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে তৈরি হওয়া সেরা বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস বা স্বপ্ন, যা বাইরের ইন্দ্রিয়ের ভুলত্রুটির নিয়মে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রিত।

যখন ইন্দ্রিয়ের এই ভুল সংশোধনের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, তখনই জন্ম নেয় মানসিক রোগ: সিজোফ্রেনিয়ায় মস্তিষ্কের নিজস্ব অবাস্তব পূর্বাভাস বাইরের সংকেতকে অগ্রাহ্য করে উন্মাদনা তৈরি করে। আমাদের জাগ্রত সচেতন জীবন হলো এক অপূর্ব ভারসাম্য—যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরের স্বপ্ন বাইরের পৃথিবীর সাথে এক নিখুঁত মেলবন্ধনে আবদ্ধ থাকে।