গ্রহের ইতিহাসের প্রথম দুইশো কোটি বছর ধরে পৃথিবীর সমস্ত জীবন ছিল অণুবীক্ষণিক। ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়ারা আলোকসংশ্লেষণ থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন পর্যন্ত সবরকম রাসায়নিক কৌশল আয়ত্ত করলেও কাঠামোগতভাবে তারা কখনোই সাধারণ আদিম কোষের গণ্ডি পেরোতে পারেনি: দেয়ালঘেরা ক্ষুদ্র রাসায়নিক থলি মাত্র। অবশেষে প্রায় ১৮০ কোটি বছর আগে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অণুজীবের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য মিলন ঘটেছিল—এমন এক জৈবিক ঘটনা যা চারশো কোটি বছরের ইতিহাসে মাত্র একবারই ঘটেছে, যা আদিম কোষের শক্তির দেয়াল ভেঙে দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি শৈবাল, বটগাছ, ছত্রাক এবং মানুষের জন্ম দিয়েছিল।
১. অ্যাসগার্ড আর্কিয়া: আমাদের সত্যিকারের পূর্বপুরুষের সন্ধান
১৯৭৭ সালে কার্ল ওজের যুগান্তকারী গবেষণার পর কয়েক দশক ধরে পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হতো জীবনের তিনটি মূল রাজ্য: ব্যাকটেরিয়া, আর্কিয়া এবং ইউক্যারিওটা। কিন্তু এই তত্ত্বে ইউক্যারিওটিক কোষের অবিশ্বাস্য জটিলতা—সাইটোস্কেলিটন, অন্তঃঝিল্লি এবং পুষ্টি বহনের ভেসিকল সিস্টেমের উৎপত্তি—এক চিরন্তন রহস্য হয়ে ছিল।
২০১৫ সালে নরওয়ের সভালবার্ডের কাছে গভীর সমুদ্রতলের ‘লকিজ ক্যাসেল’ থেকে সংগৃহীত পলিমাটির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে থিজ এটেমার গবেষক দল এক নতুন আর্কিয়ার জিনোম আবিষ্কার করেন, যার নাম দেওয়া হয় লোকিয়ার্কিয়া। পরবর্তীতে ওডিন, থর এবং হাইমডাল সহ এই নতুন সুপারফাইলামের নাম রাখা হয় অ্যাসগার্ড আর্কিয়া (Asgard Archaea)।
অ্যাসগার্ড আর্কিয়ার জিনোম দেখে বিজ্ঞানীরা স্তম্ভিত হয়ে যান। যেসব জিন এতদিন শুধু আমাদের মতো জটিল ইউক্যারিওটিক কোষে পাওয়া যেত (Eukaryotic Signature Proteins – ESPs), তার প্রায় সবই অ্যাসগার্ড আর্কিয়ার দেহে প্রস্তুত ছিল! এদের দেহে পাওয়া গেল সত্যিকারের অ্যাক্টিন সাইটোস্কেলিটন, কোষঝিল্লি সংকোচনকারী ESCRT-III প্রোটিন এবং কোষের ভেতরে জিনিসপত্র আনা-নেওয়ার ছোট ছোট জিটিপিয়েজ (GTPase) সুইচ।
জিনগত বৃক্ষ পুনর্গঠন করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ইউক্যারিওট কোনো আলাদা রাজ্য নয়: আমরা আর্কিয়ারই একটি শাখা, যারা অ্যাসগার্ড আর্কিয়ার কোল থেকে জন্ম নিয়েছি।
২০২০ সালে জাপানি বিজ্ঞানী মাসারু নোবু দীর্ঘ ১২ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে গবেষণাগারে বিশ্বের প্রথম জীবিত অ্যাসগার্ড আর্কিয়া Prometheoarchaeum syntrophicum চাষ করতে সক্ষম হন। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়, এরা শিকার গিলে খাওয়ার বদলে অত্যন্ত চিকন চিকন শাখা-প্রশাখা বা বাহু তৈরি করে সহযোগী ব্যাকটেরিয়াকে জড়িয়ে ধরে রাখে। এর মাধ্যমে মার্টিন ও মুলারের হাইড্রোজেন অনুকল্প প্রমাণিত হয়: এই মিলন কোনো আক্রমণ ছিল না, বরং হাইড্রোজেন-প্রেমী আর্কিয়া এবং হাইড্রোজেন-নিঃসরণকারী ব্যাকটেরিয়ার এক নিবিড় পারস্পরিক মিথোজীবিতা ছিল।
২. মাইটোকন্ড্রিয়া এবং জৈব-শক্তির স্কেলিং সূত্র
চারশো কোটি বছরে ব্যাকটেরিয়া কেন কখনো বড় ও জটিল বহুকোষী প্রাণী হতে পারল না? কেন তাদের জিনোমের আকার একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আটকে রইল?
২০১০ সালে বিখ্যাত নেচার সাময়িকীতে নিক লেন এবং উইলিয়াম মার্টিন এর নিখুঁত পদার্থবৈজ্ঞানিক উত্তর দেন: বায়ো-এনার্জেটিক স্কেলিং সীমাবদ্ধতা।
প্রতিটি ব্যাকটেরিয়া তার কোষের বাইরের ঝিল্লিটিতে এটিপি বা শক্তি উৎপাদন করে। গোলক বা নলের আকৃতির কোষ যখন আকারে বড় হয়, তার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বাড়ে ব্যাসার্ধের বর্গের অনুপাতে ($A \propto r^2$), কিন্তু ভেতরের আয়তন বাড়ে ঘনকের অনুপাতে ($V \propto r^3$)। ফলে একটি ব্যাকটেরিয়া যখনই বড় হতে চায়, তার বাইরের ঝিল্লি ভেতরের বিপুল সাইটোপ্লাজমকে বাঁচিয়ে রাখার মতো শক্তি সরবরাহ করতে পারে না:
$$\text{Power per Gene} = \frac{P_{\text{ATP}}}{N_{\text{genes}}} \propto \frac{A_{\text{membrane}}}{V_{\text{cytoplasm}}} \cdot \frac{1}{N_{\text{জিনোম কপি}}}$$প্রকৃতিতে যে বিরল বৃহৎ ব্যাকটেরিয়াগুলো দেখা যায় (যেমন Epulopiscium বা Thiomargarita), তারা বেঁচে থাকে এক চরম মূল্যে: তাদের একটি কোষে সম্পূর্ণ জিনোমের হাজার হাজার অভিন্ন কপি রাখতে হয়। ফলে বৃহৎ ব্যাকটেরিয়ায় হাজার হাজার জিনোম থাকা সত্ত্বেও প্রতি জিনের পেছনে উপলব্ধ শক্তির পরিমাণ একটি সাধারণ অণুবীক্ষণিক E. coli-র সমানই থাকে!
মাইটোকন্ড্রিয়ার অন্তর্ভুক্তি এই শক্তির শৃঙ্খল চিরতরে ভেঙে দিয়েছিল। ব্যাকটেরিয়াল সঙ্গীকে নিজের দেহের ভেতরে নিয়ে এসে পোষক কোষ শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়াটিকে দ্বি-মাত্রিক বাইরের তল থেকে ত্রি-মাত্রিক ভেতরের জগতে স্থানান্তরিত করল। প্রতিটি মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরের মেমব্রেন ভাঁজ হয়ে হাজার হাজার ক্রিস্টি (cristae) তৈরি করল, যা কোষের বাইরের ক্ষেত্রফলের ওপর কোনো চাপ না ফেলেই কোটি কোটি এটিপি সিন্থেস মোটর বসানোর জায়গা করে দিল।
অধিকন্তু, কোটি কোটি বছর ধরে মাইটোকন্ড্রিয়া তার অপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিন পোষকের প্রধান নিউক্লিয়াসে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেকে একটি অতি-দক্ষ জৈব ব্যাটারিতে পরিণত করল। ফলে একটি ইউক্যারিওটিক কোষ প্রতিটি জিনের পেছনে সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার চেয়ে ১ লাখ থেকে ২ লাখ গুণ বেশি শক্তি পেতে শুরু করল! এই বিপুল শক্তির জোরেই সম্ভব হয়েছিল নতুন নতুন জিন তৈরি, বিকল্প স্প্লাইসিং এবং চোখ, ডানা ও মস্তিষ্কের মতো কোটি কোটি কোষের বহুকোষী জটিল প্রাণী সৃষ্টি।
৩. নিউক্লিয়াসের জন্ম: বিধ্বংসী ইন্ট্রন থেকে বাঁচার ঢাল
মাইটোকন্ড্রিয়া অফুরন্ত শক্তি আনলেও শুরুতে সে পোষক কোষের জন্য এক মহাবিপদ ডেকে এনেছিল: পরজীবী মোবাইল জিনের আক্রমণ।
আদিম আলফাপ্রোটিওব্যাকটেরিয়ার জিনোমে ছিল হাজার হাজার গ্রুপ-২ সেলফ-স্প্লাইসিং ইন্ট্রন—এক ধরনের স্বার্থপর জাম্পিং জিন। পোষকের ভেতরে যখনই কোনো ব্যাকটেরিয়াল সঙ্গী মারা যেত, তার ডিএনএ গিয়ে পোষকের মূল ক্রোমোজোমে ঢুকে জরুরি জিনগুলোর মাঝখানে ক্ষত তৈরি করত।
ব্যাকটেরিয়ার দেহে কোনো দেয়াল থাকে না; সেখানে আরএনএ তৈরি হওয়ার সাথে সাথেই রাইবোজোম এসে প্রোটিন তৈরি শুরু করে ($২০\text{ অ্যামিনো অ্যাসিড/সেকেন্ড}$)। কিন্তু আরএনএ থেকে এই ক্ষতিকর ইন্ট্রন কেটে বাদ দিতে সময় লাগে কয়েক মিনিট। ফলে ইন্ট্রন কাটার আগেই রাইবোজোম অসম্পূর্ণ ও বিকলাঙ্গ প্রোটিন তৈরি করে কোষকে বিষাক্ত করে মেরে ফেলত!
এই প্রাণঘাতী সংকট দূর করতেই সৃষ্টি হয়েছিল ইউক্যারিওট কোষের প্রধান প্রতীক: নিউক্লিয়ার এনভেলপ (ক্যারিয়োথেকে) বা কোষকেন্দ্রের দেয়াল।
কোষের ভেতরের ঝিল্লি ভাঁজ হয়ে ডিএনএ-র চারপাশে একটি দ্বি-স্তরী দেয়াল এবং তাতে আণবিক দারোয়ান হিসেবে নিউক্লিয়ার পোর কমপ্লেক্স (NPC) বসিয়ে দিল। এর ফলে আরএনএ তৈরির কাজ এবং স্প্লাইসিং-এর ধীরগতির প্রক্রিয়াটি নিউক্লিয়াসের ভেতরে নিরাপদে সম্পন্ন হতে পারত। যতক্ষণ না আরএনএ থেকে ক্ষতিকর অংশ কেটে বাদ দিয়ে নিখুঁত ও পরিপক্ব মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA) তৈরি হতো, ততক্ষণ নিউক্লিয়াসের গেট দিয়ে কোনো আরএনএ বাইরে বের হতে পারত না।
পরবর্তীতে জীবন এই বিপদকেই এক মহাশক্তিতে রূপান্তর করেছিল। এই ইন্ট্রনগুলো কাটার জন্য তৈরি হলো স্প্লাইসিওজোম নামক দানবাকৃতির আণবিক যন্ত্র। এর ফলে একটি একক জিনকে ভিন্ন ভিন্নভাবে জোড়া লাগিয়ে (Alternative Splicing) ডজন ডজন ভিন্ন প্রোটিন তৈরি করা সম্ভব হলো—যা আমাদের ২০ হাজার জিন দিয়ে ১ লাখের বেশি বৈচিত্র্যময় প্রোটিন তৈরির ভিত্তি!
উপসংহার: লেকা (LECA)-র আত্মপ্রকাশ
প্রায় ১৬০ কোটি বছর আগে এই সমস্ত বৈপ্লবিক পরিবর্তন একত্রিত হয়ে জন্ম দিয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত জটিল জীবনের সাধারণ পূর্বপুরুষ: লেকা (LECA – Last Eukaryotic Common Ancestor)। লেকা কোনো অপরিপক্ব অণুজীব ছিল না; সে ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক ইউক্যারিওটিক কোষ, যার দেহে ছিল:
- ক্রিস্টি-সমৃদ্ধ নিখুঁত মাইটোকন্ড্রিয়া;
- নিউক্লিয়ার পোরযুক্ত সুগঠিত নিউক্লিয়াস;
- এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম ও গলগি বডির অন্তঃঝিল্লি সিস্টেম;
- অ্যাক্টিন ও টিউবুলিনের সাইটোস্কেলিটন এবং কাইনেসিনের মতো মোটর প্রোটিন;
- ৯+২ মাইক্রোটিউবিউলের সুগঠিত ফ্ল্যাজেলা বা সিলিয়া;
- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মিয়োসিস ও যৌন প্রজনন, যা ক্ষতিকর মিউটেশন দূর করে জিনের সুস্থ বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখত।
এই লেকার থেকেই পরবর্তীতে শাখা বিস্তার করেছে সমস্ত প্রাণী ও ছত্রাক (Opisthokonta), গাছপালা ও শৈবাল (Archaeplastida) এবং অ্যামিবা সহ সমস্ত ইউক্যারিওটিক পরিবার। ৫ম পর্বে আমরা পদার্পণ করব দ্বিতীয় পর্বে (Phase II)—যেখানে একক কোষের নিভৃত জীবন পেরিয়ে আমরা দেখব বহুকোষী জীবনের সূচনা এবং ইডিয়াকারান সাগরের রহস্যময় প্রাণীদের উত্থান।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Spang, A., et al. (2015). Complex archaea that bridge the gap between prokaryotes and eukaryotes. Nature, 521(7551), 173–179.
- Imachi, H., et al. (2020). Isolation of an archaeon at the interface of the prokaryote–eukaryote divide. Nature, 577(7791), 519–525.
- Lane, N., & Martin, W. (2010). The energetics of genome complexity. Nature, 467(7318), 929–934.
- Martin, W., & Müller, M. (1998). The hydrogen hypothesis for the first eukaryote. Nature, 392(6671), 37–41.
- Martin, W., & Koonin, E. V. (2006). Introns and the origin of nucleus-cytosol compartmentalization. Nature, 440(7080), 41–45.
- Allen, J. F. (2003). Why chloroplasts and mitochondria contain genomes. Comparative and Functional Genomics, 4(1), 31–36.