তিনশো কোটি বছর আগে পৃথিবীর সমস্ত জীবন এক কঠিন শক্তি-সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। সমুদ্রের অতল অন্ধকার ভেন্ট কিংবা আগ্নেয়গিরির খনিজ মোহনায় বন্দি আদিম অণুজীবেরা বেঁচে থাকত ক্ষারীয় পানি ও হাইড্রোজেন সালফাইডের সামান্য ভূ-রাসায়নিক জোগান দিয়ে। কিন্তু সমুদ্রের উপরিভাগে সূর্যের আলোয় ভেসে থাকা সায়ানোব্যাকটেরিয়াদের এক দল এক অবিশ্বাস্য রাসায়নিক উদ্ভাবন সম্পন্ন করল। তারা একটি ক্ষুদ্র ম্যাঙ্গানিজ-ক্যালসিয়াম ক্লাস্টার ব্যবহার করে প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন রাসায়নিক কাজটি করে দেখাল: পানির অণুর বন্ধন ভেঙে ইলেকট্রন আহরণ এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন নিঃসরণ, যা চিরকালের জন্য এই গ্রহের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছিল।

১. পানি বিভাজনের তাপগতিবিদ্যা: Mn₄CaO₅ ক্লাস্টার

আদিম সালোকসংশ্লেষণকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো অক্সিজেন তৈরি করত না। তারা হাইড্রোজেন সালফাইড ($\text{H}_2\text{S}$) কিংবা ফেরাস আয়রন ($\text{Fe}^{2+}$) থেকে ইলেকট্রন আহরণ করত। হাইড্রোজেন সালফাইডের বিজারণ বিভব কম থাকায় ($E^{\circ\prime} \approx -০.২৫\text{ V}$) তা থেকে ইলেকট্রন আলাদা করা সহজ ছিল; কিন্তু মহাসমুদ্রের বুকে হাইড্রোজেন সালফাইডের জোগান ছিল অত্যন্ত সীমিত।

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার জন্য জীবনের প্রয়োজন ছিল এমন এক ইলেকট্রন দাতা যা পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া যায়। সেই অনন্ত উৎস ছিল পানি ($\text{H}_2\text{O}$)। কিন্তু পানির শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে ইলেকট্রন বের করে আনা এক বিশাল তাপগতীয় চ্যালেঞ্জ। পানির বিজারণ বিভব অত্যন্ত উঁচু:

$$2\text{H}_2\text{O} \to \text{O}_2 + 4\text{H}^+ + 4e^- \quad (E^{\circ\prime} = +০.৮১৫\text{ V})$$

পানি থেকে ইলেকট্রন ছিনিয়ে নিতে হলে এমন এক শক্তিশালী জারক তৈরি করতে হতো যার ক্ষমতা স্বয়ং অক্সিজেনের চেয়েও বেশি! ফটোসিস্টেম-২ (PSII)-এর রিঅ্যাকশন সেন্টার ক্লোরোফিল P680 সূর্যালোকের ফোটন গ্রহণ করে ঠিক সেই কাজটিই করেছিল। এর উত্তেজিত রূপ P680*-এর জারণ বিভব দাঁড়ায় $+১.২৫\text{ V}$, যা প্রকৃতির জানা সবচেয়ে শক্তিশালী জৈবিক জারক।

The Mn4CaO5 Water-Splitting Cluster and Kok S-State Cycle
চিত্র ৩.১: অক্সিজেনিক সালোকসংশ্লেষণের অনুঘটকীয় কেন্দ্র। ফটোসিস্টেম-২-এ অবস্থিত $\text{Mn}_4\text{CaO}_5$ ক্লাস্টারের পরমাণু বিন্যাস। বেসেল ককের ৪-ধাপের এস-স্টেট ক্লক চক্রের ($S_0 \to S_4$) মাধ্যমে ৪টি ফোটন ($h\nu$) শোষণ করে ধাপে ধাপে ৪টি ইলেকট্রন জমা করে এক অণু অক্সিজেন ($\text{O}_2$) নিঃসরণ ঘটে।

এই চারটি ইলেকট্রন আহরণের কাজটি সুচারুভাবে পরিচালনা করে অক্সিজেন-ইভলভিং কমপ্লেক্স (OEC), যা চারটি ম্যাঙ্গানিজ, একটি ক্যালসিয়াম এবং পাঁচটি অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে গঠিত: $\text{Mn}_4\text{CaO}_5$।

১৯৭০ সালে বেসেল কক আবিষ্কার করেন যে এই ম্যাঙ্গানিজ ক্লাস্টারটি একটি প্রাকৃতিক ক্যাপাসিটরের মতো কাজ করে, যাকে ককের এস-স্টেট চক্র বলা হয়। একক ইলেকট্রন সরালে কোষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হাইড্রক্সিল র‍্যাডিক্যাল তৈরি হতে পারত। তাই OEC একটি করে ফোটন গ্রহণ করে $S_0$ থেকে $S_1, S_2, S_3$ পেরিয়ে $S_4$ দশায় পৌঁছায়। চারটি ইলেকট্রনের ঘাটতি তৈরি হলেই সে পানির দুটি অণুকে সংযুক্ত করে তাদের জারিত করে এক অণু মুক্ত অক্সিজেন ($\text{O}_2$) এবং চারটি প্রোটন ($\text{H}^+$) ছেড়ে দিয়ে পুনরায় $S_0$ দশায় ফিরে আসে।

The Z-Scheme Dual Photosystem Electron Cascade
চিত্র ৩.২: জীব-পদার্থবৈজ্ঞানিক Z-স্কিম। দুটি ফটোসিস্টেমকে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত করে পানি থেকে ইলেকট্রন ছিনিয়ে এনে ($+০.৮২\text{ V}$) তা কার্বন সংবন্ধনের উপযোগী $\text{NADPH}$ স্তরে ($-০.৩২\text{ V}$) উন্নীত করা হয়। সাইটোক্রোম $b_6f$ প্রোটন পাম্পের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে এটিপি সংশ্লেষণ নিশ্চিত করে।

২. Z-স্কিম: দুটি সৌর ইঞ্জিনের মেলবন্ধন

দৃশ্যমান আলোর একটিমাত্র ফোটনের শক্তিতে পানি থেকে ইলেকট্রন বের করে একই সাথে কার্বন ডাই-অক্সাইড বিজারণের জন্য অত্যন্ত উচ্চ শক্তিসম্পন্ন $\text{NADPH}$ অণু তৈরি করা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে অসম্ভব ছিল।

সায়ানোব্যাকটেরিয়া এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল তাদের অনন্য Z-স্কিম আর্কিটেকচারের মাধ্যমে। তারা ফটোসিস্টেম-২ (PSII) এবং ফটোসিস্টেম-১ (PSI)—এই দুটি স্বাধীন ফটোকেমিক্যাল ইঞ্জিনকে একটির পর একটি তারে যুক্ত করেছিল:

  1. প্রথম আলোক ধাক্কা (PSII): P680 আলো শোষণ করে উত্তেজিত হয়ে ইলেকট্রনকে উঁচুতে তুলে দেয় ($-০.৬\text{ V}$)। সেখান থেকে ইলেকট্রন প্লাস্টোকুইনোন ও সাইটোক্রোম $b_6f$ কমপ্লেক্সের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে ধাবিত হয়। এই ঢালু পথে নামার সময় নির্গত শক্তিতে প্রোটন পাম্পিং ঘটে, যা এটিপি (ATP) সংশ্লেষণ করে।
  2. মধ্যবর্তী পরিবাহক: তামাযুক্ত প্লাস্টোসায়ানিন (PC) প্রোটিন সেই ইলেকট্রনকে বহন করে নিয়ে যায় ফটোসিস্টেম-১ (P700)-এর দরবারে।
  3. দ্বিতীয় আলোক ধাক্কা (PSI): P700 সূর্যালোক শোষণ করে সেই ইলেকট্রনকে দ্বিতীয়বার ধাক্কা দিয়ে চরম শক্তিশালী $-১.২\text{ V}$ বিভবে উন্নীত করে। এই অবিশ্বাস্য শক্তি নিয়ে ইলেকট্রন ফেরেডক্সিনের মাধ্যমে FNR এনজাইমে পৌঁছায় এবং তৈরি করে কার্বন সংবন্ধনের প্রধান চালিকাশক্তি: $\text{NADPH}$।

এর সার্বিক ফলাফল ছিল প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর বায়ো-এনার্জেটিক ইঞ্জিন:

$$2\text{H}_2\text{O} + 2\text{NADP}^+ + 3\text{ADP} + 3\text{P}_i + 8h\nu \to \text{O}_2 + 2\text{NADPH} + 3\text{ATP} + 2\text{H}^+$$

সূর্যালোক ও পানির অফুরন্ত জোগান পেয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার জন্মহার ও জৈববস্তুর পরিমাণ শতগুণ বেড়ে গেল। অগভীর সমুদ্রে তাদের তৈরি পাথুরে কলোনিগুলো স্ট্রমাটোলাইট নামে আজও অস্ট্রেলিয়ার পিলবারায় জীবাশ্ম আকারে টিকে রয়েছে।

Banded Iron Formations and the Huronian Snowball Earth
চিত্র ৩.৩: গ্রহজোড়া ভূ-রাসায়নিক বিপর্যয়। বামে: সমুদ্রের দ্রবীভূত লোহা অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে তৈরি হওয়া ব্যান্ডেড আয়রন ফরমেশনের লাল হেমাটাইট ও সিলিকা স্তর। ডানে: বায়ুমণ্ডলের মিথেন গ্রিনহাউস ধ্বংস হয়ে বিশ্বজুড়ে নেমে আসা হুরোনিয়ান স্নোবল আর্থ (২৪০–২১০ কোটি বছর পূর্বে)।

৩. মহাজাগতিক অক্সিজেন বিপর্যয় এবং স্নোবল আর্থ

ভবিষ্যতের জটিল জীবনের জন্য অক্সিজেন আশীর্বাদ হলেও আদিম আর্কিয়ান পৃথিবীর অ্যানেরোবিক অণুজীবদের জন্য এটি ছিল এক মহাপ্রলয়ঙ্কর বিষ! মুক্ত অক্সিজেন এবং তার বিক্রিয়াশীল ফ্রি-র‍্যাডিক্যালগুলো প্রাচীন ব্যাকটেরিয়ার দেহের এনজাইম ও ডিএনএ-কে সরাসরি পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলতে লাগল।

তবে প্রায় ৮০ কোটি বছর ধরে ($৩২০\text{–}২৪০\text{ কোটি বছর আগে}$) একটি বিশাল প্রাকৃতিক স্পঞ্জ পৃথিবীকে রক্ষা করেছিল: প্রাচীন সাগরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টন দ্রবীভূত সবুজ ফেরাস লোহা ($\text{Fe}^{2+}$) ভাসমান অবস্থায় ছিল। সায়ানোব্যাকটেরিয়া যে অক্সিজেন তৈরি করত, তা সাথে সাথে এই লোহার সাথে বিক্রিয়া করে মরচে বা অদ্রবণীয় আয়রন অক্সাইড হয়ে সমুদ্রতলে জমা হতো:

$$4\text{Fe}^{2+} + \text{O}_2 + 10\text{H}_2\text{O} \to 4\text{Fe(OH)}_3\text{(s)} + 8\text{H}^+$$

এই বিক্রিয়ার ফলে সমুদ্রের তলদেশে তৈরি হলো মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ব্যান্ডেড আয়রন ফরমেশন (BIF)—লাল জ্যাসপার ও কালো হেমাটাইটের রূপালী স্তর, যা থেকে আজ বিশ্বের ৯০% লোহার আকরিক উত্তোলন করা হয়।

অবশেষে প্রায় ২৪০ কোটি বছর আগে সাগরের সমস্ত লোহা ফুরিয়ে গেল। তখন অতিরিক্ত অক্সিজেন বাতাস ও বায়ুমণ্ডলে উপচে পড়তে শুরু করল, যাকে ভূ-তত্ত্ববিদরা বলেন গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট (GOE)।

২০০০ সালে জেমস ফারকুহার সালফারের আইসোটোপীয় বিশ্লেষণ করে এর নিশ্চিত প্রমাণ পান: ২৪০ কোটি বছরের আগের শিলায় সালফারের অস্বাভাবিক ভর-নিরপেক্ষ ফ্র্যাকশনেশন ($\Delta^{33}\text{S} \ne 0$) পাওয়া যায়, যা বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন না থাকার প্রমাণ। কিন্তু ঠিক ২৩৩ কোটি বছর আগে এই সংকেতটি হঠাৎ করে শূন্যে নেমে আসে ($\Delta^{33}\text{S} = 0$), অর্থাৎ বায়ুমণ্ডলে স্থায়ী ওজোন স্তর গঠিত হয়েছিল।

বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন প্রবেশের ফলে এক ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় ঘটে। তখন সূর্যের তেজ ছিল আজকের চেয়ে প্রায় ২০–২৫% কম। পৃথিবীকে উষ্ণ রাখত বায়ুমণ্ডলের মিথেন গ্যাস ($\text{CH}_4$)। বাতাসে আসা অক্সিজেন এই মিথেনকে জারিত করে দুর্বল কার্বন ডাই-অক্সাইডে রূপান্তর করে ফেলল:

$$\text{CH}_4 + 2\text{O}_2 \to \text{CO}_2 + 2\text{H}_2\text{O}$$

মুহূর্তের মধ্যে গ্রহের গ্রিনহাউস কম্বল ছিঁড়ে গেল। বৈশ্বিক তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এলো। মেরু অঞ্চলের বরফ অগ্রসর হতে হতে বিষুবরেখা পর্যন্ত পৌঁছাল। শুরু হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম বরফযুগ—হুরোনিয়ান স্নোবল আর্থ ($২৪০\text{–}২১০\text{ কোটি বছর পূর্বে}$)। টানা ৩০ কোটি বছর ধরে গোটা পৃথিবী কিলোমিটার-পুরু বরফের চাদরে ঢেকে রইল।

উপসংহার: বায়বীয় জীবনের উন্মেষ

গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম বৈশ্বিক পরিবেশগত বিপর্যয় এবং আদিম অক্সিজেনহীন জীবনের সবচেয়ে বড় গণবিলুপ্তি। তবে স্নোবল আর্থের বরফগলা সংকীর্ণ ফাটলে বেঁচে থাকা অণুজীবেরা এই ঘাতক অক্সিজেনকে বশ মানাতে শিখল। তারা উদ্ভাবন করল সুপারঅক্সাইড ডিসমিউটেজ এবং ক্যাটালেজ এনজাইম।

অক্সিজেনকে গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রাণরসায়নে সৃষ্টি হলো এক অভূতপূর্ব শক্তির জোয়ার। এক অণু গ্লুকোজ ভেঙে ফারমেন্টেশন যেখানে মাত্র ২টি এটিপি শক্তি দেয়, অক্সিজেনের সাহায্যে শ্বসন সেখানে দেয় ৩৬ থেকে ৩৮টি এটিপি—১৮ গুণ বেশি শক্তি! এই বিপুল শক্তির ওপর ভর করেই সৃষ্টি হতে পেরেছিল জটিল ও উন্নত ইউক্যারিওটিক কোষ। ৪র্থ পর্বে আমরা দেখব সেই ইউক্যারিওটিক মহাবিস্ফোরণ।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • Kok, B., Forbush, B., & McGloin, M. (1970). Cooperation of charges in photosynthetic O₂ evolution–I. A linear four step mechanism. Photochemistry and Photobiology, 11(6), 457–475.
  • Barber, J. (2006). Photosystem II: an enzyme of global significance. Biochemical Society Transactions, 34(5), 619–625.
  • Farquhar, J., Bao, H., & Thiemens, M. (2000). Atmospheric influence of Earth’s earliest sulfur cycle. Science, 289(5480), 756–758.
  • Lyons, T. W., Reinhard, C. T., & Planavsky, N. J. (2014). The rise of oxygen in Earth’s early ocean and atmosphere. Nature, 506(7488), 307–315.
  • Fischer, W. W., Hemp, J., & Johnson, J. E. (2016). Evolution of oxygenic photosynthesis. Annual Review of Earth and Planetary Sciences, 44, 647–672.