জীবাণু ও মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোটি কোটি বছর ধরে এক অবিরাম বিবর্তনীয় যুদ্ধ চলছে, যা বিজ্ঞানে ‘রেড কুইন প্রিন্সিপল’ নামে পরিচিত। দেহ যখনই জীবাণুর বিরুদ্ধে নতুন কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করে, জীবাণুও তখন ছদ্মবেশ ধারণ, জিনগত রূপ পরিবর্তন বা প্রতিরক্ষা সংকেত ধ্বংসের মাধ্যমে নিজেকে আড়াল করে নেয়।

১. ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের অ্যান্টিজেনিক ড্রিফট বনাম শিফট

ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাস মানবদেহের অ্যান্টিবডি এড়াতে দুটি সুনির্দিষ্ট বিবর্তনীয় কৌশল ব্যবহার করে:

অ্যান্টিজেনিক ড্রিফট (Antigenic Drift)

ভাইরাল আরএনএ পলিমারেজ এনজাইমের কোনো প্রুফরিডিং বা ভুল সংশোধনের ক্ষমতা নেই। প্রতি প্রতিলিপনে প্রচুর ভুল হয়। ধীরে ধীরে হেমাগ্লুটিনিন (HA) প্রোটিনের পৃষ্ঠের অ্যান্টিজেনিক লুপে ছোট ছোট বিন্দু মিউটেশন জমতে থাকে। ফলে আগের বছরের অ্যান্টিবডি নতুন ভাইরাসকে চিনতে পারে না—এ কারণেই প্রতি বছর নতুন ফ্লু ভ্যাকসিন নিতে হয়।

অ্যান্টিজেনিক শিফট (Antigenic Shift)

ইনফ্লুয়েঞ্জার জিনোম ৮টি আলাদা টুকরায় বিভক্ত। যখন একটি শূকর বা প্রাণীর কোষে দুটি ভিন্ন জাতের ভাইরাস (যেমন পাখির এভিয়ান ফ্লু এবং মানুষের সাধারণ ফ্লু) একসাথে সংক্রমণ ঘটায়, তখন নতুন ভাইরাস তৈরির সময় ৮টি আরএনএ টুকরা ওলটপালট হয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন সংকর ভাইরাস জন্ম নেয়:

[
ext{পাখির ভাইরাস (H5N1)} + ext{মানুষের ভাইরাস (H3N2)} longrightarrow ext{নতুন মহামারী সৃষ্টিকারী স্ট্রেন}
]

মানবদেহের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে প্রলয়ঙ্করী প্যানডেমিক বা বিশ্বমহামারী দেখা দেয় (যেমন ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু বা ২০০৯ সালের সোয়াইন ফ্লু)।

২. ট্রাইপ্যানোসোমার VSG জিনের রূপবদল

আফ্রিকান স্লিপিং সিকনেসের পরজীবী Trypanosoma brucei এর জিনোমে ২০০০ টিরও বেশি ভ্যারিয়েন্ট সারফেস গ্লাইকোপ্রোটিন (VSG) জিন সংরক্ষিত থাকে। দেহের অ্যান্টিবডি যখন একটি নির্দিষ্ট VSG রূপের ৯৯.৯% পরজীবী মেরে ফেলে, তখন বেঁচে থাকা একটি পরজীবী জেনেটিক রিকম্বিনেশনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি VSG কোট গায়ে জড়িয়ে ফেলে। এর ফলে নতুন করে পরজীবীর বংশবৃদ্ধি ঘটে এবং রোগী দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়রোগে ভোগে।

৩. প্রতিরোধ ব্যবস্থার সরাসরি নাশকতামূলক কৌশল

  • MHC ক্লাস-I ধ্বংস: সাইটোমেগালোভাইরাস (CMV) কোষের ভেতরের MHC-I অণুগুলোকে প্রোটিওজোমে ধ্বংস করে দেয়, যাতে সাইটোটক্সিক টি-সেল ভাইরাসের উপস্থিতি টেরই না পায়।
  • ছদ্মবেশী MHC ও NK কোষ ফাঁকি: MHC না দেখলে ন্যাচারাল কিলার (NK) কোষ আক্রমণ করে। তাই CMV ভাইরাস UL18 নামক একটি নকল MHC তৈরি করে কোষের বাইরে ঝুলিয়ে রাখে, যা NK কোষকে ভুল ‘সব ঠিক আছে’ সংকেত দেয়।
  • সাইটোকাইন ডিকয়: পক্সভাইরাস রক্তরসে ভাসমান নকল রিসেপ্টর ছড়িয়ে দেয়, যা মানবদেহের ইন্টারফেরন ও টিএনএফ সাইটোকাইনগুলোকে কোষের সাথে যুক্ত হওয়ার আগেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।