একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত জীববিজ্ঞানে ধারণা করা হতো অভিযোজিত অনাক্রম্যতা (মেমরিভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা) কেবল মেরুদণ্ডী প্রাণীদের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য। CRISPR-Cas সিস্টেম আবিষ্কার এই ধারণা ভেঙে চুরমার করে দেয়। প্রমাণিত হয় যে ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়ার মধ্যেও রয়েছে এক অত্যাধুনিক আরএনএ-নির্ভর জিনোমিক স্মৃতিব্যবস্থা, যা অতীতের আক্রমণকারী ভাইরাসের ডিএনএ তথ্য মনে রেখে পরবর্তীতে নির্ভুলভাবে সেই ভাইরাস ধ্বংস করে দেয়।
১. CRISPR লোকাসের জিনোমিক উপাদান
ব্যাকটেরিয়ার ক্রোমোজোমে CRISPR লোকাস তিনটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত:
- CRISPR অ্যারে: পর্যায়ক্রমিক প্যালিন্ড্রোমিক রিপিট (Direct Repeats) যার ফাঁকে ফাঁকে অতীতের আক্রমণকারী ভাইরাসের জিনোম থেকে কেটে রাখা স্পেসার (Spacers) সাজানো থাকে। এটি ব্যাকটেরিয়ার অপরাধী ভাইরাসের ডেটাবেজ।
- লিডার সিকোয়েন্স: যেখান থেকে এই অ্যারেটি আরএনএ হিসেবে প্রতিলিপিত হয়।
- cas জিনসমূহ: প্রোটিন এনজাইম তৈরির জিন যা নতুন স্পেসার সংগ্রহ এবং ভাইরাস ডিএনএ কাটার কাজ করে।
২. ক্রিসপার প্রতিরোধের তিনটি পর্যায়
১. অ্যাডাপ্টেশন বা স্পেসার গ্রহণ
নতুন কোনো অচেনা ভাইরাস আক্রমণ করলে ব্যাকটেরিয়ার Cas1-Cas2 এনজাইম কমপ্লেক্স সেই ভাইরাসের ডিএনএর একটি নির্দিষ্ট অংশ কেটে নেয়। এরপর লিডার সিকোয়েন্সের ঠিক পরেই প্রথম স্থানে নতুন স্পেসার হিসেবে ঢুকিয়ে দেয়। ফলে সবচেয়ে সাম্প্রতিক আক্রমণের তথ্য সর্বদা তালিকার শীর্ষে সংরক্ষিত হয়।
২. crRNA প্রসেসিং
লিডার প্রমোটার থেকে পুরো ক্রিসপার অ্যারেটি একটি দীর্ঘ প্রি-সিআরআরএনএ (Pre-crRNA) হিসেবে প্রতিলিপিত হয়। এরপর ক্যাস এনজাইম বা হোস্টের RNase III একে কেটে টুকরো টুকরো করে প্রতিটি ভাইরাসের জন্য আলাদা আলাদা গাইড crRNA তৈরি করে।
৩. ইন্টারফারেন্স ও ভাইরাস কর্তন
গাইড crRNA নিয়ে Cas9 প্রোটিন পুরো কোষে টহল দিতে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার নিজের ডিএনএ যাতে ভুল করে না কাটে, সেজন্য Cas প্রোটিন ভাইরাসের গায়ে থাকা একটি বিশেষ ২-৩ অক্ষরের সিকোয়েন্স খোঁজে, যাকে PAM (Protospacer Adjacent Motif) বলা হয় (যেমন Cas9 এর জন্য (5′)-NGG)।
PAM পাওয়ার সাথে সাথে Cas9 ভাইরাসের ডিএনএ খুলে crRNA এর সাথে মিলিয়ে দেখে। যদি কোডন মিলে যায়, Cas9 এর দুটি ব্লেড (HNH এবং RuvC ডোমেন) সাথে সাথে ভাইরাসের ডিএনএর উভয় সূত্রক কেটে টুকরো করে দেয়, ফলে ভাইরাসটি ধ্বংস হয়ে যায়।
৩. ক্লাস-১ বনাম ক্লাস-২ সিস্টেম এবং জিন সম্পাদনা
- ক্লাস-১ (Type I, III): একাধিক প্রোটিনের যৌথ কমপ্লেক্স দিয়ে কাজ করে।
- ক্লাস-২ (Type II, V, VI): মাত্র একটিমাত্র প্রোটিন দিয়ে পুরো কাজ সম্পন্ন করে। এর মধ্যে Cas9 (Type II) ডিএনএ কাটে, Cas12 টি-সমৃদ্ধ PAM কাটে এবং Cas13 (Type VI) আরএনএ কাটে।
প্রকৃতির এই ব্যাকটেরিয়াল প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেই জেনিফার ডাউডনা এবং ইমানুয়েল চার্পেন্টিয়ার ল্যাবরেটরিতে জীবজগতের যেকোনো জিন পরিবর্তনের যুগান্তকারী হাতিয়ার (CRISPR Gene Editing) হিসেবে রূপান্তর করেন, যা ২০২০ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে।
৪. অ্যান্টি-ক্রিসপার (Anti-CRISPR): ভাইরাসের পাল্টা প্রতিরোধ
ব্যাকটেরিয়ার এই মারাত্মক অস্ত্রকে ব্যর্থ করতে কিছু চতুর ব্যাকটেরিওফাজ অ্যান্টি-ক্রিসপার (Acr) প্রোটিন তৈরি করেছে। এই প্রোটিনগুলো Cas9 এর সক্রিয় পকেটে প্লাগের মতো আটকে যায় বা PAM শনাক্তকরণ বন্ধ করে দেয়, যা অণুজীবের অনন্ত বিবর্তনীয় সংঘাতের প্রতীক।