ভ্যাকসিন বা টিকাদান মানবজাতির ইতিহাসে জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে সফল বৈজ্ঞানিক বিজয়। বসন্ত নির্মূল এবং পোলিওকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসার পেছনে রয়েছে টিকার অবদান। নিরাপদ ও নিরীহ উপায়ে রোগজীবাণুর পরিচিতি তুলে ধরে ভ্যাকসিন শরীরে এমন স্থায়ী ‘অনাক্রম্য স্মৃতি’ তৈরি করে, যা আসল জীবাণু আক্রমণ করার সাথে সাথে তাকে নিমেষে ধ্বংস করে দেয়।

১. ভ্যাকসিনের আধুনিক প্রযুক্তিসমূহ

প্রযুক্তি কাজের কৌশল প্রধান সুবিধা উদাহরণ
লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড দুর্বল কিন্তু জীবিত জীবাণু প্রাকৃতিক সংক্রমণের মতো তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী অনাক্রম্যতা তৈরি করে MMR, পোলিও ড্রপ (Sabin), BCG
সাবইউনিট / ইনঅ্যাক্টিভেটেড রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা জীবাণুর নির্দিষ্ট প্রোটিন অত্যন্ত নিরাপদ; পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে হেপাটাইটিস বি, রেবিস
ভাইরাল ভেক্টর নিরীহ অ্যাডেনোভাইরাসের ভেতরে টার্গেট জিন ঢুকিয়ে দেওয়া কোষের ভেতরে প্রোটিন তৈরি করিয়ে সাইটোটক্সিক টি-সেলকে উদ্দীপিত করে অ্যাস্ট্রাজেনেকা করোনা ভ্যাকসিন
mRNA-LNP ভ্যাকসিন লিপিড ন্যানোপার্টিকল আবৃত কৃত্রিম এমআরএনএ দ্রুততম সংশ্লেষণ, নিখুঁত অ্যান্টিবডি ও শক্তিশালী Th1 প্রতিক্রিয়া ফাইজার, মডার্না করোনা ভ্যাকসিন

২. এমআরএনএ টিকার বৈপ্লবিক পদার্থবিজ্ঞান

এমআরএনএ প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং মানবদেহের রক্তরসে ঢোকামাত্র এনজাইম দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়। দুটি যুগান্তকারী আবিষ্কার এর সমাধান করে (যার জন্য ২০২৩ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়):

  1. নিউক্লিওসাইড রূপান্তর (Karikó & Weissman): এমআরএনএর ইউরিডিন অণুর বদলে (N1)-মিথাইলসিউডোইউরিডিন (( ext{m}^1Psi)) ব্যবহার করার ফলে দেহের জন্মগত রিসেপ্টর (TLR7) আর একে ক্ষতিকর মনে করে ধ্বংস করে না এবং প্রচুর প্রোটিন উৎপন্ন হয়।
  2. আয়নাইজযোগ্য লিপিড ন্যানোপার্টিকেল (LNPs): চারটি বিশেষ লিপিডের মোড়কে আরএনএ সুরক্ষিত থাকে। রক্তের নিরপেক্ষ pH-এ এটি চার্জহীন থাকলেও কোষের এন্ডোজোমে অম্লীয় পরিবেশে এটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত হয়ে মেমব্রেন ভেদ করে আরএনএকে সাইটোপ্লাজমে মুক্ত করে দেয়।

৩. অ্যাডজুভ্যান্টের ভূমিকা ও বিপদের সংকেত

কেবল প্রোটিন দিলে শরীর অনেক সময় তাকে অবহেলা করে। তাই ভ্যাকসিনের সাথে অ্যাডজুভ্যান্ট মিশিয়ে কৃত্রিম ‘বিপদের সংকেত’ পাঠানো হয়:

  • অ্যালুমিনিয়াম লবণ (Alum): টিস্যুতে NLRP3 ইনফ্ল্যামাজোম সক্রিয় করে শক্তিশালী অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
  • MPLA অ্যাডজুভ্যান্ট: ব্যাকটেরিয়ার লিপিড-এ থেকে প্রাপ্ত নিরীহ অণু, যা TLR4 রিসেপ্টরের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী টি-সেল স্মৃতি তৈরি করে।

৪. দীর্ঘমেয়াদী অনাক্রম্য স্মৃতি (Immunological Memory)

সংক্রমণ বা টিকা শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ যোদ্ধা কোষ মারা গেলেও কিছু বিশেষ কোষ বেঁচে থাকে:

  • সেন্ট্রাল মেমরি টি-সেল (( ext{T}_{ ext{CM}})): লিম্ফ নোডে অবস্থান করে নতুন কোষের জোগান দেয়।
  • টিস্যু-রেসিডেন্ট মেমরি টি-সেল (( ext{T}_{ ext{RM}})): ত্বক ও ফুসফুসের মতো সীমানায় আজীবন পাহারা দেয়।
  • লং-লিভড প্লাজমা সেল (LLPCs): সরাসরি অস্থিমজ্জার নিরাপদ কুঠুরিতে চলে যায় এবং কোনো নতুন জীবাণুর দেখা না পেলেও বছরের পর বছর রক্তে অবিরাম অ্যান্টিবডি নিঃসরণ করে সুরক্ষা নিশ্চিত করে।