তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইউরোপের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদগণ দ্বিঘাত, ত্রিঘাত (কার্দানো) এবং চতুর্ঘাত (ফেরারি) সমীকরণের মতো পঞ্চম মাত্রার বহুপদী সমীকরণ (Quintic Equation) সমাধানের জন্য একটি সাধারণ বীজগাণিতিক সূত্রের সন্ধান করছিলেন। ১৮৩২ সালে মাত্র বিশ বছর বয়সে এক মারাত্মক দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হওয়ার পূর্ব রাতে ফরাসি তরুণ গণিতবিদ এভারিস্ত গ্যালোয়া এই প্রাচীন ধাঁধার চূড়ান্ত সমাধান করেন। তিনি ফিল্ড সম্প্রসারণের সাথে প্রতিসাম্য গ্রুপের এক অনন্য অভিধান রচনা করেন—যার নাম গ্যালোয়া তত্ত্ব (Galois Theory)। এর মাধ্যমে তিনি অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন যে পঞ্চম মাত্রার সাধারণ সমীকরণকে কোনো মূল বা র‍্যাডিক্যাল চিহ্নের সূত্রের সাহায্যে সমাধান করা অসম্ভব।

১. ফিল্ড সম্প্রসারণ ও স্প্লিটিং ফিল্ড

একটি ফিল্ড (Field) $F$ হলো এমন একটি বিনিময়ী রিং যেখানে প্রতিটি অশূন্য উপাদানের গুণাত্মক বিপরীত বিদ্যমান। যদি একটি বৃহত্তর ফিল্ড $E$-এর ভেতরে $F$ উপফিল্ড হিসেবে থাকে, তবে তাকে ফিল্ড সম্প্রসারণ ($E/F$) বলা হয়। $F$-এর সাপেক্ষে $E$ একটি ভেক্টর স্পেস গঠন করে, যার মাত্রাকে বলা হয় সম্প্রসারণের ডিগ্রি: $[E : F] = dim_F(E)$।

  • একটি উপাদান $alpha in E$ যদি $F$-এর সহগযুক্ত কোনো বহুপদীর মূল হয়, তবে তাকে বীজগাণিতিক (Algebraic) বলা হয়; অন্যথায় তা ট্রান্সেন্ডেন্টাল (Transcendental) (যেমন মূলদ সংখ্যার সাপেক্ষে $pi$ ও $e$)।
  • একটি বহুপদী $f(x)$-এর সমস্ত মূলকে ধারণকারী ক্ষুদ্রতম ফিল্ডকে বলা হয় তার স্প্লিটিং ফিল্ড (Splitting Field)।

২. গ্যালোয়া গ্রুপ ও প্রতিসাম্য

একটি নরমাল ও সেপারেবল ফিল্ড সম্প্রসারণকে বলা হয় গ্যালোয়া সম্প্রসারণ। ফিল্ড $E$-এর এমন সমস্ত অটোমরফিজম $sigma$ যারা মূল ফিল্ড $F$-এর প্রতিটি উপাদানকে অপরিবর্তিত রাখে, তাদের সেটকে বলা হয় গ্যালোয়া গ্রুপ $text{Gal}(E/F)$:

text{Gal}(E/F) = { sigma: E to E mid forall c in F, ; sigma(c) = c }

যেহেতু যেকোনো অটোমরফিজম বহুপদীর মূলগুলোকে কেবল নিজেদের মধ্যে অদলবদল (Permutation) করতে পারে, তাই $n$ ডিগ্রির বহুপদীর গ্যালোয়া গ্রুপ মূলত প্রতিসাম্য গ্রুপ $S_n$-এর একটি উপগ্রুপের সমতুল্য।

৩. গ্যালোয়া তত্ত্বের মৌলিক উপপাদ্য

গ্যালোয়া তত্ত্বের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো মধ্যবর্তী ফিল্ড $K$ ($F subseteq K subseteq E$) এবং গ্যালোয়া গ্রুপের উপগ্রুপ $H le text{Gal}(E/F)$-এর মধ্যে একটি নিখুঁত বিপরীতমুখী বাইজেক্টিভ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা:

K longleftrightarrow H = text{Gal}(E/K)

এই সম্পর্কের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো:

  • বৃহত্তর ফিল্ডের বিপরীতে থাকে ক্ষুদ্রতর উপগ্রুপ: $[E : K] = |H|$।
  • মধ্যবর্তী সম্প্রসারণ $K/F$ স্বয়ং একটি গ্যালোয়া সম্প্রসারণ হবে যদি এবং কেবল যদি তার সংশ্লিষ্ট উপগ্রুপ $H$ মূল গ্রুপের একটি স্বাভাবিক উপগ্রুপ (Normal Subgroup) হয় ($H triangleleft G$)। সেই ক্ষেত্রে উপ-সম্প্রসারণের গ্যালোয়া গ্রুপ হবে ভাগফল গ্রুপ:

    text{Gal}(K/F) cong text{Gal}(E/F) / text{Gal}(E/K)

৪. র‍্যাডিক্যালের মাধ্যমে সমাধান ও আবেল-রুফিনি উপপাদ্য

একটি বহুপদী সমীকরণকে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ এবং বর্গমূল/ঘনমূলের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হবে যদি এবং কেবল যদি তার গ্যালোয়া গ্রুপটি একটি সমাধানযোগ্য গ্রুপ (Solvable Group) হয়—অর্থাৎ যার স্বাভাবিক উপগ্রুপের ভাগফলগুলো চক্রীয় গ্রুপ হিসেবে ভেঙে ফেলা যায়।

পঞ্চম মাত্রার সাধারণ বহুপদীর ক্ষেত্রে গ্যালোয়া গ্রুপ হলো সিমেট্রিক গ্রুপ $S_5$। $S_5$-এর একমাত্র স্বাভাবিক উপগ্রুপ হলো অল্টারনেটিং গ্রুপ $A_5$ (যার সদস্য সংখ্যা ৬০)। কিন্তু $A_5$ হলো একটি সিম্পল গ্রুপ (Simple Group)—এর কোনো স্বাভাবিক উপগ্রুপ নেই এবং এটি অ্যাবিলীয় নয়। ফলে $S_5$-কে কোনো চক্রীয় উপগ্রুপের ধারায় ভাঙা অসম্ভব। গ্যালোয়া প্রমাণ করেন যে $S_5$ কোনো সমাধানযোগ্য গ্রুপ নয়—যা প্রমাণ করে অমর আবেল-রুফিনি উপপাদ্য (Abel-Ruffini Theorem): পঞ্চম বা তদূর্ধ্ব মাত্রার সাধারণ বহুপদী সমীকরণের কোনো সার্বজনীন বীজগাণিতিক সূত্র থাকা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।