আজ থেকে চল্লিশ থেকে বিশ লক্ষ বছর আগের আফ্রিকা ছিল গ্রেসিল (কৃশতনু) অস্ট্রালোপিথেকাসদের চারণভূমি। ১৯২৪ সালে রেমন্ড ডার্ট কর্তৃক দক্ষিণ আফ্রিকায় “তাউং চাইল্ড” আবিষ্কার এবং ১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়ায় ডোনাল্ড জোহানসনের যুগান্তকারী “লুসি” আবিষ্কার—মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই অস্ট্রালোপিথেকাসরাই প্রমাণ করেছিল যে মস্তিষ্কের আকার বড় হওয়ার লক্ষ লক্ষ বছর আগেই মানুষের পূর্বপুরুষরা দুই পায়ে সম্পূর্ণ দক্ষভাবে হাঁটতে শিখেছিল।
১. আফার উপত্যকায় লুসি: AL 288-1 কঙ্কালের শারীরস্থান (৩২ লক্ষ বছর আগে)
১৯৭৪ সালের ২৪ নভেম্বর ইথিওপিয়ার হাডার অঞ্চলে একটি মাটির ঢালে বিজ্ঞানীদের চোখে পড়ে একটি করোটির অংশ। পরবর্তীতে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় একটি প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রায় ৪০% অক্ষত কঙ্কাল, যার নাম রাখা হয় AL 288-1 (জনপ্রিয় নাম “লুসি”, আমহারিক ভাষায় Dinkinesh যার অর্থ “তুমি অপূর্ব”)। আর্গন-আর্গন আইসোটোপীয় ডেটিংয়ে এর বয়স নির্ধারিত হয় ৩২ লক্ষ বছর।
লুসির শারীরিক গঠন মানব বিবর্তনের প্রাথমিক ধাঁচকে উন্মোচিত করে:
- উচ্চতা ও ওজন: লুসির উচ্চতা ছিল মাত্র ১০৫ সেন্টিমিটার (৩ ফুট ৫ ইঞ্চি) এবং ওজন ছিল প্রায় ২৮ কেজি। এদের মধ্যে পুরুষ ও নারীর আকারে ব্যাপক পার্থক্য (Sexual Dimorphism) ছিল।
- শ্রোণিচক্র (Pelvis): লুসির পেলভিস ছিল মানুষের মতোই খাটো এবং বাটির মতো চওড়া, যা দ্বিপদ চলনের নিখুঁত রূপ নির্দেশ করে।
- হাঁটুর ভালগাস কোণ: লুসির ফিমারের কোণ ছিল $approx ৯^circ$, যা প্রমাণ করে সে আজকের মানুষের মতোই পা সরাসরি দেহের নিচে ফেলে হাঁটত।
- মস্তিষ্কের আকার: অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিসের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৩৮০ থেকে ৪৫০ ঘন সেন্টিমিটার, যা আধুনিক শিম্পাঞ্জির সমতুল্য। অর্থাৎ, পায়ের বিবর্তন মস্তিষ্কের বিবর্তনের চেয়ে অনেক আগে ঘটেছিল।
২. গাছে চড়ার বিতর্ক: ভূমিচর বনাম বৃক্ষচারী
লুসি কি পুরোপুরি মাটিতে হাঁটত, নাকি গাছের ডালেও চড়ত? এই নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। জীবাশ্মের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে দেখা যায়:
- লুসির হাতের ও পায়ের আঙুলের হাড় ছিল কিছুটা বাঁকানো, যা গাছের ডাল শক্ত করে ধরে ঝুলে থাকার পক্ষে উপযোগী।
- কাঁধের জয়েন্ট ছিল কিছুটা ওপরের দিকে মুখ করা।
- হাতের দৈর্ঘ্য পায়ের তুলনায় মানুষের চেয়ে লম্বা ছিল।
নৃবিজ্ঞানীদের ঐক্যমত্য হলো: এরা মাটিতে মানুষের মতোই সাবলীলভাবে হাঁটত, কিন্তু রাতের বেলা হিংস্র শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে এবং বনের ফলমূল সংগ্রহের জন্য নিয়মিত গাছে চড়ত।
৩. লেতোলির পদচিহ্ন: ৩.৬৬ মিলিয়ন বছরের জীবন্ত দলিল
১৯৭৮ সালে তানজানিয়ার ওল্ডুভাই গিরিখাতের কাছে Laetoli নামক স্থানে মেরি লিকির দল এক অবিশ্বাস্য আবিষ্কার করেন। নিকটবর্তী সাদিমান আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর ভেজা ছাইয়ের স্তরের (Tuff 7) ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া তিনটি আদিম মানুষের ২৭ মিটার দীর্ঘ পদচিহ্ন পাথরে রূপান্তরিত হয়ে টিকে ছিল।
৩৬ লক্ষ ৬০ হাজার বছর আগের এই পদচিহ্নগুলো আধুনিক বায়োমেকানিক্সের চোখে এক অপূর্ব বিস্ময়:
- গোড়ালির আঘাত (Heel Strike): প্রতিটি পদচিহ্নে পেছনের গোড়ালির স্পষ্ট ও গভীর ছাপ রয়েছে।
- পায়ের পাতার মেকানিক্স: ভর গোড়ালি থেকে পাতার বাইরের অংশ হয়ে আঙুলের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে।
- সমান্তরাল বুড়ো আঙুল: কোনোরূপ বানরের মতো পৃথক বুড়ো আঙুল ছিল না; বুড়ো আঙুল অন্য আঙুলের সাথে সমান্তরালে ছিল।
- টো-অফ (Toe-off): বুড়ো আঙুল মাটিতে চাপ দিয়ে শরীরকে সামনের দিকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ সেখানে মুদ্রিত ছিল।
৪. অস্ট্রালোপিথেকাসদের বৈচিত্র্যময় প্রজাতি
লুসির সমসাময়িক ও পরবর্তী যুগে আফ্রিকায় গ্রেসিল অস্ট্রালোপিথেকাসদের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল:
- Australopithecus anamensis (৪২-৩৯ লক্ষ বছর আগে): কেনিয়ার ক্যানাপয়ে প্রাপ্ত লুসির সরাসরি পূর্বসূরি প্রজাতি।
- Australopithecus africanus (৩৩-২১ লক্ষ বছর আগে): দক্ষিণ আফ্রিকার স্টার্কফনটেইনে আবিষ্কৃত (“Mrs. Ples”), যাদের মুখ কিছুটা খাড়া এবং মস্তিষ্ক ছিল ৪৫০-৫০০ ঘন সেন্টিমিটার।
- Australopithecus sediba (১৯.৮ লক্ষ বছর আগে): মালাপা গুহায় আবিষ্কৃত প্রজাতি, যা অস্ট্রালোপিথেকাস ও আদিম হোমো গণের মধ্যে এক নিখুঁত রূপান্তরকালীন যোগসূত্র।