আজ থেকে প্রায় ৭০ লক্ষ বছর আগে, অন্ত্য মায়োসিন যুগের নিরক্ষীয় আফ্রিকার বনভূমিতে এক যুগান্তকারী জৈবিক রূপান্তর সূচিত হয়েছিল। দীর্ঘ দুই কোটি বছর ধরে ইউরেশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে বৃক্ষবাসী প্রাইমেটদের যে বহুমুখী বিকাশ ঘটেছিল, তারই একটি জনগোষ্ঠী দুটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভাজনের একটি শাখা জন্ম দেয় আধুনিক শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোদের (গণ Pan), আর অপর শাখাটি উন্মোচন করে হোমিনিডদের (উপগোত্র Hominina)—দ্বিপদ বিশিষ্ট সেই অনন্য প্রাণীকূল, যাদের যাত্রা শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে হোমো স্যাপিয়েন্সে।

১. সিনোজোয়িক যুগের সূচনা: প্লেসিয়াডাপিস থেকে ফাইয়ুম নরবানর

মানবজাতির শারীরিক গঠন বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সিনোজোয়িক মহাযুগের শুরুতে। ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে ক্রিটেশিয়াস-প্যালিওজিন মহাবিলুপ্তির পর যখন ডাইনোসরদের যুগ শেষ হলো, তখন প্রাচীন প্রাইমেট-সদৃশ স্তন্যপায়ী Plesiadapiformes আর্দ্র বনাঞ্চলের ক্যানোপিতে রাজত্ব শুরু করে। প্রায় ৫ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে ইওসিন যুগে আধুনিক রূপের আদিম প্রাইমেট (Euprimates) আবির্ভূত হয়:

  • Adapiformes: লেমুর ও লরিসের পূর্বসূরি, যাদের নখের বদলে চেপ্টা নখ এবং গাছে ডালে আঁকড়ে ধরার উপযোগী পা ছিল।
  • Omomyiformes: টারসিয়ার ও উচ্চতর নরবানরদের পূর্বসূরি, যাদের বড় চোখের কোটর নিশাচর জীবনের ইঙ্গিত দেয়।

মিশরের ফাইয়ুম মরুভূমির ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছরের প্রাচীন পললস্তরে পাওয়া যায় উচ্চতর প্রাইমেটদের আদি ফসিল Aegyptopithecus zeuxis। এর দাঁতের বিন্যাস ছিল আধুনিক ওল্ড ওয়ার্ল্ড বানর ও নরবানরের মতোই $2.1.2.3$ (প্রতি চোয়ালে ২টি ইনসিসর, ১টি ক্যানাইন, ২টি প্রিমোলার এবং ৩টি মোলার)।

২. মায়োসিন যুগে নরবানরদের সোনালী বিকাশ

২ কোটি ৩০ লক্ষ থেকে ১ কোটি বছর আগের মায়োসিন যুগ ছিল হোমিনিডদের স্বর্ণযুগ। আজকের মতো বানরদের আধিক্য তখন ছিল না; বরং আফ্রো-ইউরেশিয়া জুড়ে বিস্তৃত ছিল নরবানরদের সমৃদ্ধ প্রজাতিসমূহ:

  • Proconsul (পূর্ব আফ্রিকা, ২ কোটি বছর আগে): এদের কোনো লেজ ছিল না (হোমিনয়েডদের প্রধান শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য) এবং নিচের মাড়িতে Y-5 প্যাটার্নের মোলার দাঁত উপস্থিত ছিল।
  • Dryopithecus ও Ouranopithecus (ইউরোপ, ১ কোটি বছর আগে): এদের বাহু ও কাঁধের গঠন প্রমাণ করে যে এরা গাছের ডালে ঝুলতে ও হাতের সাহায্যে ঝুলন্ত অবস্থায় চলাচলে পারদর্শী ছিল।
  • Sivapithecus (ভারতীয় উপমহাদেশ ও পাকিস্তান): মুখমণ্ডলের অবতল গঠন ও চোখের পাতার দূরত্বের কারণে এটি সরাসরি আধুনিক ওরাংওটাংদের (Pongo) পূর্বপুরুষ বলে স্বীকৃত।

৩. আণবিক বিভাজন ঘড়ি: মানব ও শিম্পাঞ্জি লাইনেজ পৃথকীকরণ

জিনোমিক গবেষণার আগে ধারণা করা হতো মানুষ ও মহাবানরদের বিভাজন ঘটেছিল কোটি কোটি বছর আগে। কিন্তু ১৯৬৫ সালে অ্যালান উইলসন ও ভিনসেন্ট সারিচের প্রোটিন বিশ্লেষণ এবং পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রমাণ করে যে মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির ডিএনএ ক্রমের প্রায় ৯৮.৮% অভিন্ন।

মতু কিমুরার নিরপেক্ষ বিবর্তন তত্ত্ব (Neutral Theory of Molecular Evolution) অনুযায়ী, যদি প্রজাতিভেদে মিউটেশন জমার বার্ষিক হার $mu$ স্থির থাকে, তবে দুটি ভগিনী প্রজাতির মধ্যকার জিনগত দূরত্ব $d$ নির্ধারিত হয় নিম্নোক্ত সমীকরণে:

$$d = 2mu T + 2bar{theta}_{text{ancestral}}$$

যেখানে $T$ হলো বিভাজন সময়কাল এবং $bar{theta}_{text{ancestral}}$ হলো সাধারণ পূর্বপুরুষদের আদি জিনগত বৈচিত্র্য। আধুনিক ডিএনএ পেডিগ্রি সিকোয়েন্সিং অনুযায়ী মানবদেহে প্রতি প্রজন্মে মিউটেশনের হার $mu approx 1.25 times 10^{-8}$ প্রতি ক্ষারকে। গড়ে প্রতি প্রজন্মের ব্যবধান ২৮ বছর বিবেচনা করলে বার্ষিক হার দাঁড়ায় $mu_{text{year}} approx 4.5 times 10^{-10}$। এই গাণিতিক আণবিক ঘড়ি নির্ভুলভাবে নির্দেশ করে যে:

$$T_{text{split}} approx text{৬৫ থেকে ৭০ লক্ষ বছর আগে}$$

৪. শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষের (LCA) প্রকৃতি

শিম্পাঞ্জি ও মানুষের শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ কেমন দেখতে ছিল? প্রচলিত বিশ্বাস ছিল এরা আধুনিক শিম্পাঞ্জির মতো চারপায়ে আঙুলের গিঁটে ভর দিয়ে (knuckle-walking) হাঁটত। কিন্তু সাম্প্রতিক ফসিল আবিষ্কার প্রমাণ করেছে যে সেই পূর্বপুরুষ ছিল তুলনামূলক সোজা মেরুদণ্ড বিশিষ্ট, অত্যন্ত নমনীয় কবজির অধিকারী এক বৃক্ষচারী প্রাণী, যা আফ্রিকার শুকিয়ে যাওয়া বনাঞ্চলের প্রান্তে মাটিতে নেমে দুই পায়ে দাঁড়ানোর প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করেছিল।