২০১৩ সালের শরৎকালে দক্ষিণ আফ্রিকার “ক্র্যাডল অব হিউম্যানকাইন্ড”-এর চুনাপাথরের পাহাড়ের নিচে দুজন অভিযাত্রী গুহার এক অবিশ্বাস্য সংকীর্ণ ফাটল দিয়ে গলে ভেতরে প্রবেশ করেন। মাত্র ১৮ সেন্টিমিটার চওড়া সেই পথ পেরিয়ে তারা এসে পৌঁছান এক ঘোর অন্ধকার ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে, যার মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল শত শত মানুষের প্রাচীন হাড়গোড়। Homo naledi (হোমো নালেদি)-এর এই আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানের সামনে এমন এক রহস্য তুলে ধরেছে, যা মানব বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছে।
১. ভূগর্ভস্থ গোলকধাঁধা: ডিনালেডি প্রকোষ্ঠ
মাটি থেকে ৩০ মিটার গভীরে অবস্থিত এই Dinaledi Chamber-এ পৌঁছানো ছিল এক দুঃসাহসিক অভিযান। লি বার্গারের পরিচালনায় ছয়জন অত্যন্ত রোগা ও দক্ষ নারী বিজ্ঞানী (যাদের “আন্ডারগ্রাউন্ড অ্যাস্ট্রোনট” বলা হতো) এই বিপজ্জনক পথে নেমে গবেষণা চালান। এই পথ অতিক্রম করতে হতো:
- সুপারম্যানস ক্রল: মাত্র ২৫ সেন্টিমিটার উঁচু একটি অনুভূমিক সুড়ঙ্গ, যেখানে শুয়ে নিঃশ্বাস চেপে হামাগুড়ি দিতে হয়।
- ড্রাগনস ব্যাক: খাড়া ১২ মিটার উঁচু ধারালো চুনাপাথরের শৈলশিরা।
- দ্য শ্যুট (The Chute): ১২ মিটার গভীর এক উল্লম্ব চিমনি, যার প্রশস্ততা মাত্র ১৮ সেন্টিমিটার (৭ ইঞ্চি)!
সেখান থেকে ১৫ জনেরও বেশি ভিন্ন বয়সের (শিশু থেকে বৃদ্ধ) মানবের প্রায় ১,৫৫০টি হাড়ের টুকরো উদ্ধার করা হয়। সোথো ভাষায় নালেদি শব্দের অর্থ “তারা”, গুহার নামানুসারে এর নাম রাখা হয় হোমো নালেদি।
২. মোজাইক শারীরস্থান: প্রাচীন মস্তিষ্ক বনাম আধুনিক হাত-পা
হোমো নালেদির শারীরিক গঠন বিজ্ঞানীদের হতভম্ব করে দেয়। এদের শরীরে আদিম বানর এবং আধুনিক মানুষের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়:
- ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক: এদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল মাত্র ৪৬৫ থেকে ৬১০ ঘন সেন্টিমিটার—যা ৩০ লক্ষ বছর আগের অস্ট্রালোপিথেকাসের মতো ছোট!
- গাছে চড়ার কাঁধ: এদের কাঁধের জয়েন্ট ও বুকের খাঁচা ছিল গাছে ওঠার উপযোগী, এবং আঙুলগুলো ছিল কিছুটা বাঁকানো।
- আধুনিক মানুষের হাত ও কবজি: আঙুল বাঁকা হলেও কবজি, বুড়ো আঙুল এবং হাতের তালুর হাড় ছিল প্রায় আজকের মানুষের মতোই উন্নত, যা নিখুঁত হাতিয়ার ব্যবহারে সক্ষম।
- দ্বিপদ পা: এদের পায়ের পাতা ছিল পুরোপুরি আধুনিক মানুষের মতো—সোজা বুড়ো আঙুল এবং ধনুকের মতো আর্চ বিশিষ্ট।
৩. সময়ের মহাবিস্ফোরণ: ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৩৬ হাজার বছর
এত ছোট মস্তিষ্ক দেখে প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল এরা হয়তো ২৫ লক্ষ বছর আগের কোনো আদিম প্রজাতি। কিন্তু ২০১৭ সালে পল ডার্কস ছয়টি স্বাধীন ডেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে হোমো নালেদির বয়স:
$$text{হোমো নালেদির সময়কাল: } quad ৩,৩৫,০০০ text{ থেকে } ২,৩৬,০০০ text{ বছর আগে}$$
এই ফলাফল ছিল এক ঐতিহাসিক বজ্রপাত! কারণ এই একই সময়ে আফ্রিকার অন্য প্রান্তে আধুনিক Homo sapiens-এর জন্ম হচ্ছিল। অর্থাৎ, যখন বড় মস্তিষ্কের উন্নত মানুষ পৃথিবীতে হাঁটছিল, ঠিক তখনই দক্ষিণ আফ্রিকার বনে গাছে চড়া ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের এই প্রজাতিটি তাদের সমান্তরালে টিকে ছিল!
৪. আদিম সমাধি বিতর্ক: অন্ধকারের রহস্য
এমন এক ভয়ংকর ও অন্ধকার গুহায় কীভাবে ১৫টি মানব কঙ্কাল এলো? সেখানে অন্য কোনো পশুর হাড় নেই, কোনো পানির স্রোতের চিহ্ন নেই, এমনকি কোনো পাথরের অস্ত্রও নেই।
লি বার্গার ও তার দল দাবি করেন যে হোমো নালেদিরা সচেতনভাবে তাদের মৃত স্বজনদের সম্মান জানানোর জন্য আগুনের মশাল জ্বালিয়ে এই ভয়ংকর পথ পাড়ি দিয়ে এখানে মৃতদেহ কবর বা নিষ্পত্তি (Deliberate Body Disposal) করত। ২০২৩ সালে তারা গুহার দেয়ালে খোদাই করা জ্যামিতিক চিহ্নের দাবিও করেন। তবে বিজ্ঞানী মহলে এখনও এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে—অনেকে মনে করেন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এরা সেখানে আটকা পড়েছিল। তবে কারণ যাই হোক, হোমো নালেদি প্রমাণ করেছে প্রকৃতির বিবর্তনীয় ক্যানভাস ছিল ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।