সত্তর থেকে চল্লিশ লক্ষ বছর আগের আফ্রিকার জীবাশ্ম ভাণ্ডারে মানব ধারার সবচেয়ে প্রাচীন ও রোমাঞ্চকর প্রমাণগুলো সংরক্ষিত রয়েছে। চাদের Sahelanthropus, কেনিয়ার Orrorin এবং ইথিওপিয়ার Ardipithecus—এই তিনটি আদিম প্রজাতি প্রমাণ করেছে যে দুই পায়ে হাঁটার সূচনা উন্মুক্ত মরুভূমিতে নয়, বরং ঘন বনভূমির বৃক্ষচারী জীবনের মাঝেই শুরু হয়েছিল।
১. Sahelanthropus tchadensis: তৌমাঈ ও করোটির ভিত্তি রূপান্তর (৭০ লক্ষ বছর আগে)
২০০১ সালে চাদের জুরব মরুভূমির তোরোস-মেনালা অঞ্চলে মিশেল ব্রুনে একটি প্রায় অক্ষত কিন্তু চাপা পড়া খুলি (নমুনা TM 266-01-060-1, স্থানীয় ভাষায় “তৌমাঈ”) আবিষ্কার করেন। এর বয়স প্রায় ৬৮ থেকে ৭২ লক্ষ বছর। তৌমাঈ প্রমাণ করে যে মানুষের আদি বিকাশ কেবল পূর্ব আফ্রিকার গ্রেট রিফ্ট ভ্যালিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ জুড়েই বিস্তৃত ছিল।
তৌমাঈর হোমিনিড হওয়ার পেছনে প্রধান দুটি প্রমাণ রয়েছে:
- ফোরামেন ম্যাগনামের অবস্থান: চারপেয়ে প্রাণীদের খুলির পেছনে অনুভূমিকভাবে মেরুদণ্ডের ছিদ্রটি থাকে। কিন্তু তৌমাঈর ক্ষেত্রে ফোরামেন ম্যাগনাম খুলির নিচে একদম সামনে অবস্থিত এবং চোখের সমতলের সাথে প্রায় সমকোণে ($pprox ৯০^circ$) অবস্থান করে। এটি নিশ্চিত করে যে তার মাথা একটি উল্লম্ব, খাড়া মেরুদণ্ডের উপর স্থাপিত ছিল।
- ক্যানাইন দাঁতের হ্রাস: শিম্পাঞ্জি ও অন্যান্য নরবানরদের ওপরের ধারালো ক্যানাইন দাঁত নিচের দাঁতের সাথে ঘষা লেগে ক্ষুরধার থাকে। তৌমাঈর ক্যানাইন দাঁত ছোট এবং এদের মধ্যে কোনো ঘর্ষণমূলক তীক্ষ্ণতা নেই, যা পুরুষে-পুরুষে আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতার হ্রাসের প্রমাণ।
২. Orrorin tugenensis: মিলেনিয়াম ম্যান ও ফিমার হাড়ের শক্তি (৬০ লক্ষ বছর আগে)
২০০০ সালে কেনিয়ার তুগেন হিলসে আবিষ্কৃত Orrorin tugenensis মানব বিবর্তনে দ্বিপদ চলনের প্রাচীনতম প্রত্যক্ষ হাড়ের প্রমাণ এনে দেয়। এর উরুর হাড়ের (ফিমার) জীবাশ্ম BAR 1002’00 সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে এক যুগান্তকারী তথ্য উন্মোচন করে:
$$text{কর্টিক্যাল বোন রেশিও: } frac{text{নিচের অংশের পুরুত্ব}}{text{ওপরের অংশের পুরুত্ব}} > ৩.০$$
চারপেয়ে নরবানরদের ফিমারের গলায় ওপর এবং নিচের হাড়ের পুরুত্ব প্রায় সমান থাকে। কিন্তু মানুষ যখন দুই পায়ে হাঁটে, তখন মাধ্যাকর্ষণ বল ও পেশির চাপের কারণে ফিমার নেকের নিচের অংশে প্রচুর হাড় জমা হয়। ওরোসিনের ফিমারের নিচের অংশ ওপরের তুলনায় তিনগুণ পুরু, যা প্রমাণ করে ৬০ লক্ষ বছর আগেই এরা অভ্যাসবশত সোজা হয়ে দুই পায়ে হাঁটত।
৩. Ardipithecus ramidus: “আর্ডি” ও বহুমুখী বনচারী চলন (৪৪ লক্ষ বছর আগে)
১৯৯৪ সালে ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলে টিম হোয়াইট আবিষ্কার করেন ARA-VP-6/500, যা “আর্ডি” নামে বিশ্বজুড়ে খ্যাত। ৪৪ লক্ষ বছরের প্রাচীন এই নারী কঙ্কালটি ডারউইনের সময় থেকে চলে আসা প্রচলিত ধারণা চূর্ণ করে দেয়।
আর্ডির শারীরিক বৈশিষ্ট্য ছিল এক অসাধারণ রূপতাত্ত্বিক মোজাইক:
- শ্রোণিচক্র (Pelvis): আর্ডির শ্রোণিচক্রের ওপরের অংশ ছিল ছোট ও চওড়া, যা দুই পায়ে হাঁটার সময় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করত। কিন্তু নিচের অংশ ছিল বেশ লম্বা, যা গাছে ওঠার পেশিগুলোকে ধারণ করত।
- পায়ের পাতা: আর্ডির বুড়ো আঙুল ছিল অন্যান্য আঙুল থেকে বিচ্ছিন্ন ও প্রসারিত, যা দিয়ে সে গাছের ডাল শক্ত করে ধরতে পারত। কিন্তু পায়ের পাতার মধ্যভাগ ছিল অনমনীয় ও দৃঢ়, যা মাটিতে দুই পায়ে ধাক্কা দিয়ে হাঁটার উপযোগী।
- হাতের গঠন: এদের হাতের কবজি ছিল অত্যন্ত নমনীয়। শিম্পাঞ্জির মতো এরা কখনোই আঙুলের গিঁটে ভর দিয়ে (knuckle-walking) হাঁটত না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জীবাশ্মের সাথে পাওয়া উদ্ভিজ্জ প্রমাণ নিশ্চিত করে যে আর্ডি উন্মুক্ত সাভানায় বাস করত না; সে বাস করত আর্দ্র ও ঘন বনাঞ্চলে। অর্থাৎ, মানুষের দ্বিপদ চলন বনের গাছপালার মধ্যেই শুরু হয়েছিল, কোনো ফাঁকা প্রান্তরে নেমে আসার জন্য নয়।