আজ থেকে ৭০ হাজার থেকে ১৫ হাজার বছর আগের সময়কাল ছিল পৃথিবীর বুকে মানুষের চূড়ান্ত বিশ্ববিজয়ের ইতিহাস। বুদ্ধি, ভাষা, পোশাক এবং সমুদ্রগামী নৌকার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এক আফ্রিকান প্রাইমেট পৃথিবীর সমস্ত ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তারা বরফাবৃত ইউরেশিয়া পাড়ি দিল, খোলা সমুদ্র পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পদার্পণ করল এবং বরফে ঢাকা বেরিঞ্জিয়া পার হয়ে পৌঁছে গেল দুই আমেরিকায়। কিন্তু মানুষ যেখানেই পা রাখল, সেখানেই প্রকৃতির ভারসাম্য চিরতরে বদলে গেল এবং বরফযুগের দানবীয় প্রাণীকূল চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল।

১. দক্ষিণ উপকূলীয় রুট ও সাহুলে পদার্পণ (৫৫ হাজার বছর আগে)

যদিও ১ লক্ষ ২০ হাজার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মানুষের একটি প্রাথমিক ধারা যাত্রা করেছিল, কিন্তু বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মূল সফল ধারাটি আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে আসে প্রায় ৬৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার বছর আগে। মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-এর L3 হ্যাপ্লোগ্রুপ থেকে জন্ম নেয় ইউরেশিয়ার মূল M ও N গ্রুপ।

এই মানুষেরা ভারত মহাসাগরের উপকূল ধরে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এশিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার বছরের মধ্যে তারা পৌঁছে যায় Sahul মহাদেশে (তৎকালীন অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়া ও নিউগিনির সম্মিলিত ভূখণ্ড):

সাহুলে পৌঁছাতে হলে বরফযুগেও কমপক্ষে আটটি ভিন্ন সামুদ্রিক প্রণালী পার হতে হতো, যার শেষ অংশটি ছিল স্থলভাগ থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য ৭০ কিলোমিটারের খোলা সমুদ্র। এর অর্থ হলো, আজ থেকে ৫০ হাজার বছর আগেই মানুষের গভীর সমুদ্রযাত্রা ও নৌযান নির্মাণের নিখুঁত জ্ঞান ছিল!

২. আমেরিকায় পদার্পণ: বেরিঞ্জিয়া ও হোয়াইট স্যান্ডস

দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো ১৩ হাজার বছর আগে মানুষ বেরিং প্রণালী পার হয়ে আমেরিকায় এসেছিল (Clovis First)। কিন্তু সাম্প্রতিক আবিষ্কার এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে:

  • মন্টে ভার্দে (চিলি, ১৪,৫০০ বছর আগে): দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে বহু প্রাচীন বসতির প্রমাণ।
  • হোয়াইট স্যান্ডস (নিউ মেক্সিকো, ২১-২৩ হাজার বছর আগে): বরফযুগের প্রখর শীতে ম্যামথ এবং দানবীয় স্লথের পায়ের ছাপের সাথে সাথে হেঁটে যাওয়া মানব শিশুর পদচিহ্ন পাথরে রূপান্তরিত হয়ে পাওয়া গেছে।

জিনোমিক তথ্য নিশ্চিত করে যে আদিম শিকারিরা প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় সামুদ্রিক পথ (Kelp Highway) ধরে নৌকায় করে বরফের সীমানা এড়িয়ে দ্রুত দুই আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

৩. দানবীয় মেগাফনা বিলুপ্তি: ওভারকিল হাইপোথিসিস (Overkill Hypothesis)

মানুষ যখনই কোনো নতুন মহাদেশে পা রেখেছিল, সেখানেই ৪৪ কেজির চেয়ে বড় আকারের দানবীয় স্তন্যপায়ী প্রাণীরা (Megafauna) আকস্মিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানী পল মার্টিন একে Overkill Hypothesis নাম দেন:

অঞ্চল মানুষের আগমন মেগাফনা বিলুপ্তির হার বিলুপ্ত হওয়া প্রাণী
অস্ট্রেলিয়া ৫৫ হাজার বছর আগে ৮৮% প্রজাতি বিলুপ্ত ডাইপ্রোটোডন (দানব ক্যাঙ্গারু ও ওমব্যাট), মারসুপিয়াল সিংহ
উত্তর আমেরিকা ১৬ হাজার বছর আগে ৭২% প্রজাতি বিলুপ্ত পশমযুক্ত ম্যামথ, স্মাইলোডন (স্যাবার-টুথ বাঘ), আমেরিকান ঘোড়া
দক্ষিণ আমেরিকা ১৫ হাজার বছর আগে ৮৩% প্রজাতি বিলুপ্ত মেগাথেরিয়াম (হাতি আকৃতির স্লথ), গ্লাইপ্টোডন (বর্মধারী দানব)
আফ্রিকা ৩০ লক্ষ বছরের সহ-বিবর্তন মাত্র ১৮% বিলুপ্তি প্রাণীরা মানুষের সাথে বিবর্তিত হওয়ায় মানুষকে ভয় পেতে শিখেছিল

আফ্রিকার বন্যপ্রাণীরা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষের সাথে একসাথে বিবর্তিত হওয়ায় তারা মানুষের বল্লম ও আগুনকে ভয় পেত। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার নিরীহ প্রাণীরা আগে কখনো দুই পায়ের শিকারি দেখেনি। তাদের প্রজনন হার ছিল কম, ফলে মানুষের ধারাবাহিক শিকার ও অগ্নিকাণ্ডের চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র কয়েক শতাব্দীর মধ্যে বরফযুগের এই দানবরা পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে যায়।