শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানব সমাজ মানুষকে সাদা, কালো, বাদামী প্রভৃতি কৃত্রিম “বর্ণ” বা “রেস”-এ বিভক্ত করে এসেছে। ধারণা করা হতো বিভিন্ন মহাদেশের মানুষের মধ্যে অলঙ্ঘনীয় জিনগত প্রাচীর রয়েছে। কিন্তু ১৯৭২ সালে বিশ্বখ্যাত বিবর্তনীয় জেনেটিসিস্ট রিচার্ড লিওয়ন্টিন (Richard Lewontin) এক যুগান্তকারী গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এক নীরব বিপ্লব ঘটান। আধুনিক পপুলেশন জেনেটিক্সের সাহায্যে তিনি অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন—জৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তথাকথিত “বর্ণবাদ” বা “রেস”-এর কোনো অস্তিত্বই নেই; এটি কেবল মানুষের তৈরি একটি সামাজিক কুসংস্কার।

১. রাইটের ফিক্সেশন ইনডেক্স ($F_{ST}$) ও বৈচিত্র্যের বিভাজন

যেকোনো প্রজাতির বিভিন্ন পপুলেশনের মধ্যে জিনগত পার্থক্য পরিমাপ করার জন্য বিজ্ঞানী সিউয়াল রাইট $F_{ST}$ (Fixation Index) সমীকরণ আবিষ্কার করেন:

$$F_{ST} = frac{H_T – H_S}{H_T}$$

যেখানে $H_S$ হলো একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভেতরের জিনগত বৈচিত্র্য এবং $H_T$ হলো সমগ্র প্রজাতির মোট বৈচিত্র্য।

প্রাণিবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রাণীর দুটি দলকে আলাদা “উপপ্রজাতি” (Subspecies বা Race) বলতে হলে তাদের $F_{ST}$-এর মান কমপক্ষে ০.২৫ থেকে ০.৩০ হতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, শিম্পাঞ্জি বা নেকড়ের বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের মধ্যে $F_{ST}$ থাকে ০.৩০ থেকে ০.৪৫। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এই মান কত?

২. লিওয়ন্টিনের ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক আবিষ্কার: ৮৫% সত্য

১৯৭২ সালে রিচার্ড লিওয়ন্টিন রক্ত ও প্রোটিনের ১৭টি পলিমরফিক মার্কারের সাহায্যে বিশ্বের সমস্ত মহাদেশের মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিসংখ্যানটি প্রকাশ করেন:

জিনগত বৈচিত্র্যের স্তর মোট বৈচিত্র্যের অনুপাত বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য
যেকোনো একটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে ৮৫.৪% মানুষের সামগ্রিক জিনগত পার্থক্যের সিংহভাগই বিদ্যমান যেকোনো একটি স্থানীয় গ্রামের মানুষের নিজেদের মধ্যে!
একই মহাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ৮.৩% যেমন ফরাসি ও জার্মানদের মধ্যে, বা নাইজেরিয়ার ইগবো ও ইয়োরুবাদের মধ্যে পার্থক্য।
ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশের মানুষের মধ্যে (“বর্ণগত”) মাত্র ৬.৩% আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের মানুষের মধ্যে গড় পার্থক্য মাত্র ৬ শতাংশের মতো!

আধুনিক সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং (1000 Genomes Project) কোটি কোটি ডিএনএ ক্ষারক পরীক্ষা করে প্রমাণ করেছে যে মানব প্রজাতির সামগ্রিক $F_{ST}$ মাত্র ০.১০ থেকে ০.১৫। এর বৈজ্ঞানিক অর্থ হলো:

যদি কোনো মহাপ্রলয়ে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মারা যায় এবং কেবল পাপুয়া নিউগিনির কোনো একটি বিচ্ছিন্ন আদিবাসী গ্রাম অথবা আফ্রিকার কোনো একটি ক্ষুদ্র জনপদ বেঁচে থাকে—তবে সমগ্র মানবজাতির জিনগত বৈচিত্র্যের ৮৫%-এর বেশি অক্ষত অবস্থায় টিকে থাকবে!

৩. দূরত্বের ধারাবাহিকতা: আইসোলেশন বাই ডিসট্যান্স (Clines)

তবে মানুষের গায়ের রঙ বা মুখের গঠনে বাইরে থেকে কেন এত পার্থক্য চোখে পড়ে? এর কারণ মানুষের মস্তিষ্কের এক অদ্ভুত প্রবণতা—অবিচ্ছিন্ন পরিবর্তনকে কয়েকটি কৃত্রিম বাক্সে ভাগ করে ফেলা।

বাস্তবে মানুষের জিনগত বৈচিত্র্য কোনো মহাদেশের সীমান্তে হঠাৎ লাফিয়ে বদলায় না; এটি দূরত্বের সাথে সাথে অত্যন্ত মসৃণভাবে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয় (Geographic Cline):

$$d_{text{জিনগত দূরত্ব}} propto log(d_{text{ভৌগোলিক দূরত্ব}})$$

কায়রো থেকে পায়ে হেঁটে কেপটাউন, কিংবা বেইজিং থেকে মাদ্রিদ গেলে কোথাও কোনো জিনগত সীমান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না; প্রতি পদক্ষেপে মানুষের রূপ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির সাথে মানিয়ে নিতে।

৪. আফ্রিকার বাইরে ধারাবাহিক জনসংখ্যা সংকট (Serial Bottleneck)

মানুষের সমস্ত বৈচিত্র্যের শেকড় আফ্রিকায়। আফ্রিকা থেকে মানুষ যত দূরে গেছে, প্রতি ধাপে একটি ছোট দল আগের দল থেকে আলাদা হয়ে এগিয়ে গেছে। ফলে আফ্রিকা থেকে দূরত্বের সাথে সাথে মানুষের বৈচিত্র্য হ্রাস পেয়েছে।

আফ্রিকার যেকোনো দুটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে পরিমাণ জিনগত পার্থক্য রয়েছে, আফ্রিকার বাইরের সমগ্র বিশ্বের মানুষের মধ্যে তার চেয়ে কম পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক জেনেটিক্স প্রমাণ করেছে—বর্ণবাদ কোনো জীববিজ্ঞান নয়, বরং মানবতার আদিম ইতিহাস এক অখণ্ড, অবিভাজ্য ও তরুণ পরিবারের জয়গান।