আজ থেকে ৮ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ বছর আগের মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগ ছিল পৃথিবীর বুকে তীব্র বরফযুগ ও আন্তঃহিমবাহের নাটকীয় জলবায়ু পরিবর্তনের কাল। এই যুগে হোমো ইরেক্টাসের বংশধরদের মস্তিষ্কে ঘটে এক দ্বিতীয় মহাবিস্ফোরণ। প্রায় ১,১০০ থেকে ১,৪০০ ঘন সেন্টিমিটার মস্তিষ্কের অধিকারী এই মধ্যবর্তী মানবদের বলা হয় Homo heidelbergensis (ইউরোপে) এবং Homo rhodesiensis (আফ্রিকায়)—যারা ছিল পরবর্তীকালে আবির্ভূত হওয়া নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো স্যাপিয়েন্সের সাধারণ পূর্বপুরুষ।
১. হোমো হাইডেলবার্গেনসিস ও রোবোস্ট শিকারি মানব
১৯০৭ সালে জার্মানির হাইডেলবার্গের কাছে মাউয়ার গ্রামে প্রথম এক বিশাল চিবুকহীন চোয়ালের ফসিল আবিষ্কৃত হয় (Mauer 1, বয়স প্রায় ৬ লক্ষ বছর)। পরবর্তীতে আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে এদের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে:
- কাবওয়ে ১ (“ব্রোকেন হিল”, জাম্বিয়া, ৩ লক্ষ বছর আগে): বিশাল ভ্রুর হাড় (Supraorbital torus) এবং ১,২৮০ ঘন সেন্টিমিটার মস্তিষ্কের অধিকারী হোমো রোডেসিয়েনসিসের বিখ্যাত খুলি।
- বোডো (ইথিওপিয়া, ৬ লক্ষ বছর) ও আরাগ্যো (ফ্রান্স): প্রমাণ করে এরা সমগ্র পুরাতন পৃথিবী জুড়ে বৃহৎ বন্যপ্রাণী শিকার করে টিকে ছিল।
২. সিমা দে লস হুয়েসোস: আটাপুয়েরকার হাড়ের পাতালকুয়ো (৪ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগে)
স্পেনের আটাপুয়েরকার এক গভীর ভূগর্ভস্থ গুহায় ১৩ মিটার উল্লম্ব কুয়োর তলদেশে আবিষ্কৃত হয় Sima de los Huesos (“Pit of Bones”)। হুয়ান লুইস আরসুয়াগার দল এখান থেকে প্রায় ৬,৫০০টি মানুষের হাড়ের টুকরো উদ্ধার করেন, যা অন্তত ২৮ জন ভিন্ন আদিম মানবের কঙ্কাল।
এই জীবাশ্মগুলোর শারীরস্থান ও প্রাচীন পারমাণবিক ডিএনএ (Ancient Nuclear DNA) বিশ্লেষণ মানব বিবর্তনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য উন্মোচন করে:
- নিয়ান্ডারথালদের আদি রূপ: সিমা মানবের খুলিতে নিয়ান্ডারথালদের মতো সামনের দিকে বাড়ানো মুখমণ্ডল (Midfacial prognathism) এবং পেছনের বিশেষ ফাঁকা জায়গা (Retromolar space) দেখা যায়।
- জিনোমিক সময়কাল: এদের হাড় থেকে নিষ্কাশিত ডিএনএ প্রমাণ করে যে আজ থেকে ৪ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগেই নিয়ান্ডারথালদের ধারা আধুনিক মানব ধারা থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, স্যাপিয়েন্স ও নিয়ান্ডারথালদের শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ বাস করত প্রায় ৫ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ৭ লক্ষ বছর আগে।
৩. মোড-৩ লেভালোয়া প্রযুক্তি: প্রস্তুতকৃত কোর পাথুরে কৌশল
মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগে পাথুরে প্রযুক্তিতে ঘটে এক বৈপ্লবিক মানসিক রূপান্তর—যা Levallois Technique (লেভালোয়া প্রযুক্তি) নামে পরিচিত:
আশুলিয়ান কুঠার তৈরির সময় মূল পাথরটি কেটে কেটে কুঠার বানানো হতো। কিন্তু লেভালোয়া প্রযুক্তিতে মূল পাথরটিকে একটি বাতিল ছাঁচ হিসেবে প্রস্তুত করা হতো, যাতে এক আঘাতেই কল্পিত ক্ষুরধার ব্লেডটি আলাদা হয়ে আসে:
- কচ্ছপাকৃতি কোর তৈরি: পাথরের চতুর্দিক থেকে গোল করে ছোট ছোট চিপ ফেলে কোরটিকে একটি কচ্ছপের পিঠের মতো উত্তল রূপ দেওয়া হতো।
- স্ট্রাইকিং প্ল্যাটফর্ম মসৃণকরণ: যেখানে শেষ আঘাতটি করা হবে, সেই জায়গাটি নিখুঁত কোণে ঘষে প্রস্তুত করা হতো।
- একক চূড়ান্ত আঘাত: নির্দিষ্ট কোণে একটি প্রচণ্ড আঘাত হেনে এক নিমেষে একটি অত্যন্ত ধারালো, পাতলা এবং চারপাশে ক্ষুরধার ফলক আলাদা করে ফেলা হতো।
৪. শ্যোনিঙ্গেনের কাঠের বল্লম (৩ লক্ষ বছর আগে)
জার্মানির Schöningen কয়লা খনিতে ১৯৯০-এর দশকে আবিষ্কৃত হয় দেবদারু কাঠের তৈরি ১০টি অক্ষত বল্লম। এর বয়স প্রায় ৩ লক্ষ বছর।
এই বল্লমগুলো কেবল ছুঁচলো কাঠ ছিল না; এগুলো ছিল অ্যারোডাইনামিক্সে ভরপুর প্রায় ২.৩ মিটার লম্বা জ্যাভলিন—যার ভরকেন্দ্র ছিল আধুনিক অলিম্পিক বর্শার মতোই সামনের এক-তৃতীয়াংশে। সেখানে পাওয়া বুনো ঘোড়ার কঙ্কাল নিশ্চিত করে যে হোমো হাইডেলবার্গেনসিস ছিল দলবদ্ধ ও ভয়ংকর শিকারি, যারা বরফযুগের দানবীয় প্রাণীদের অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বধ করতে পারত।