১৯৪৮ সালের জুলাই ও অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিজের ৩২ বছর বয়সী গণিতবিদ ও প্রকৌশলী ক্লদ এলউড শ্যানন বেল সিস্টেম টেকনিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশ করেন তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা: “এ ম্যাথমেটিক্যাল থিওরি অফ কমিউনিকেশন”। একশত পৃষ্ঠারও কম পরিসরে রচিত এই গবেষণাপত্রটি কেবল কোনো প্রকৌশল সমস্যার সমাধান করেনি, বরং মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক শাখা হিসেবে ইনফরমেশন থিওরি বা তথ্য তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিল। শ্যাননের পূর্বে যোগাযোগ ছিল একটি অ্যানালগ এবং পৃথক পৃথক কারিগরি বিদ্যা—টেলিগ্রাফে বিদ্যুৎ স্পন্দন, টেলিফোনে শব্দ তরঙ্গ এবং রেডিওতে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের ওঠানামা। শ্যানন প্রমাণ করেন যে বার্তার ধরন যা-ই হোক না কেন—টেক্সট, ভয়েস, সঙ্গীত বা ছবি—সকল তথ্যকে বাইনারি প্রতীক বা বিট (Bit)-এ রূপান্তর করা যায় এবং যেকোনো নয়েজপূর্ণ মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সীমা পর্যন্ত নিখুঁতভাবে আদান-প্রদান করা সম্ভব।
১. তথ্যের অর্থগত পৃথকীকরণ: অর্থ নয়, বিকল্প নির্বাচনের পরিমাপ
শ্যাননের সবচেয়ে বড় দার্শনিক বিপ্লব ছিল তথ্য (Information)-কে মানবিক অর্থ (Meaning) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা। দৈনন্দিন জীবনে আমরা তথ্য বলতে জ্ঞান বা সত্য বুঝি। কিন্তু প্রকৌশলগত বিশ্লেষণের জন্য শ্যানন উপলব্ধি করেছিলেন যে তথ্যের মানবিক মূল্যায়ন অপ্রাসঙ্গিক:
“বার্তার প্রায়শই একটি অর্থ থাকে; অর্থাৎ এটি কোনো ভৌত বা ধারণাগত বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত। যোগাযোগের এই অর্থগত দিকগুলো প্রকৌশলগত সমস্যার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। যোগাযোগের মূল সমস্যা হলো এক প্রান্তে নির্বাচিত একটি বার্তা অন্য প্রান্তে হুবহু বা প্রায় অবিকলভাবে পুনরুৎপাদন করা।”
শ্যাননের তত্ত্বে একটি বার্তা তথ্যবহুল হয় তার গুরুত্বের জন্য নয়, বরং তা সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্য থেকে একটি নির্বাচন নির্দেশ করে বলে। সাহারা মরুভূমির আবহাওয়া পূর্বাভাসে যদি বলা হয় “আজ রৌদ্রোজ্জ্বল থাকবে”, তবে তা প্রায় শূন্য তথ্য বহন করে কারণ এটি পূর্বনির্ধারিত। কিন্তু যদি বলা হয় “সাহারা মরুভূমিতে আজ তুষারঝড় হচ্ছে”, তবে তা অপরিমেয় তথ্য প্রদান করে কারণ একটি অতি বিরল সম্ভাবনা বাস্তবে ঘটেছে। অতএব, তথ্য হলো মূলত অনিশ্চয়তা হ্রাসের গাণিতিক পরিমাপ।
২. সাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার পঞ্চস্তরীয় কাঠামো
শ্যানন একটি সার্বজনীন যোগাযোগ মডেল প্রস্তাব করেন যা আজও পৃথিবীর সকল ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ও কম্পিউটারের মূল ভিত্তি:
- তথ্য উৎস (Information Source): বার্তা তৈরি করে। এটি একটি সম্ভাবনা বিন্যাস $p(x)$ মেনে প্রতীক তৈরি করে।
- প্রেরক যন্ত্র (Transmitter/Encoder): বার্তাকে চ্যানেলের উপযোগী বৈদ্যুতিক বা অপটিক্যাল সিগন্যালে এনকোড করে।
- চ্যানেল বা মাধ্যম (The Channel): সংকেত প্রেরণের ভৌত পথ (যেমন অপটিক্যাল ফাইবার, তামার তার বা বাতাস)।
- শব্দ বা নয়েজ উৎস (Noise Source): তাপীয় উত্তেজনা বা পরিবেশীয় কারণে সংকেতে বিশৃঙ্খলা যোগ করে।
- গ্রাহক যন্ত্র (Receiver/Decoder): নয়েজযুক্ত সংকেত থেকে মূল বার্তা উদ্ধার বা ডিকোড করে।
- গন্তব্য (Destination): যার জন্য বার্তাটি উদ্দিষ্ট (মানুষ বা সার্ভার)।
৩. লগারিদমিক পরিমাপ ও “বিট” (Bit)-এর জন্ম
তথ্যকে কীভাবে গাণিতিকভাবে পরিমাপ করা যায়? ধরা যাক একটি উৎস $M$ সংখ্যক সমান সম্ভাবনাময় বিকল্প থেকে একটি বার্তা বেছে নেয়। শ্যানন যুক্তি দেন যে তথ্য পরিমাপক ফাংশন $I(M)$ অবশ্যই তিনটি স্বাভাবিক শর্ত পূরণ করবে:
- বিকল্প সংখ্যা বাড়লে তথ্য বাড়বে (মনোটনিসিটি)।
- দুটি স্বাধীন উৎস যৌথভাবে কাজ করলে মোট তথ্য তাদের তথ্যের যোগফল হবে: $I(M_1 cdot M_2) = I(M_1) + I(M_2)$।
- সম্ভাবনার সূক্ষ্ম পরিবর্তনে তথ্যের মান অবিচ্ছিন্নভাবে পরিবর্তিত হবে (কন্টিনিউইটি)।
এই শর্ত পূরণকারী একমাত্র গাণিতিক ফাংশন হলো লগারিদম: $I(M) = K log_b(M)$। ভিত্তি হিসেবে $2$ নির্বাচন করলে দুটি সমান সম্ভাবনাময় বিকল্পের মধ্য থেকে একটি বেছে নিতে প্রয়োজনীয় তথ্যের মান হয় $log_2(2) = 1$। জন টুকির পরামর্শে শ্যানন এই এককটির নাম দেন বিট (Binary Digit-এর সংক্ষিপ্ত রূপ)।
৪. শ্যানন এনট্রপির গাণিতিক রূপ
যখন প্রতীকের সম্ভাবনা সমান না হয়ে $p_1, p_2, dots, p_n$ হয়, তখন কোনো একটি প্রতীকের নিজস্ব চমক বা তথ্যের পরিমাণ হলো $I(x_i) = -log_2 p_i$। সম্পূর্ণ উৎস থেকে প্রত্যাশিত গড় তথ্যই হলো বিখ্যাত শ্যানন এনট্রপি:
[
H(X) = -sum_{i=1}^n p(x_i) log_2 p(x_i) quad text{bits/symbol}
]
জন ভন নিউম্যান শ্যাননকে এই সমীকরণের নাম ‘এনট্রপি’ রাখতে বলেছিলেন, কারণ থার্মোডাইনামিকসের অপ্রতিরোধ্য সমীকরণের সাথে এর নিখুঁত মিল রয়েছে এবং বিজ্ঞানের বিতর্কে এটি চিরকাল বিজয়ী থাকবে। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব কীভাবে এই এনট্রপি তথ্য মহাবিশ্বের চরম সীমা নির্ধারণ করে।