ক্লদ শ্যাননের যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশের একই ঐতিহাসিক বছরে, ১৯৪৮ সালে এমআইটি-র প্রখ্যাত গণিতবিদ নরবার্ট উইনার প্রকাশ করেন এক অবিস্মরণীয় গ্রন্থ: “সাইবারনেটিক্স: অর কন্ট্রোল অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইন দ্য অ্যানিমাল অ্যান্ড দ্য মেশিন”। গ্রিক শব্দ কাইবারনেটেস (নৌকার মাঝি বা কর্ণধার) থেকে ‘সাইবারনেটিক্স’ শব্দের উৎপত্তি ঘটিয়ে উইনার তথ্য তত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান, স্বয়ংক্রিয় কামান নিয়ন্ত্রণ এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানকে একীভূত করে একটি সার্বজনীন নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞান রচনা করেন। উইনার প্রমাণ করেন যে মানুষের উদ্দেশ্যমূলক আচরণ (যেমন কোনো বস্তু ধরতে হাত বাড়ানো) এবং স্বয়ংক্রিয় রোবটের আচরণ (যেমন অটোপাইলট বা মিসাইল ট্র্যাকার) হুবহু একই গাণিতিক সমীকরণ মেনে চলে: ভুল বা বিচ্যুতির তথ্য ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করে নেগেটিভ ফিডব্যাক লুপ (Negative Feedback Loop)-এর মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করা।
১. উদ্দেশ্যমূলক আচরণের মেকানিক্স: ফিডব্যাকই লক্ষ্য
বিজ্ঞানে দীর্ঘকাল বিশ্বাস করা হতো যে জীবদেহের “উদ্দেশ্য” (Teleology) কোনো রহস্যময় অতিপ্রাকৃতিক শক্তি। কিন্তু উইনার দেখান যে উদ্দেশ্য হলো সম্পূর্ণ যান্ত্রিক। কোনো সিস্টেম কোনো লক্ষ্যের দিকে এগোয় ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে নয়, বরং তার বর্তমান অবস্থা এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের মধ্যকার এরর সিগন্যাল $e(t)$ পরিমাপ করে:
[
e(t) = r(t) – y(t)
]
এই বিচ্যুতিকে নেগেটিভ পোলারিটিতে ফিডব্যাক হিসেবে অ্যাকচুয়েটরে পাঠিয়ে সিস্টেমটি নিজেকে সংশোধন করে নেয়। মানবদেহের তাপমাত্রা ঠিক ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখা (হোমওস্ট্যাসিস) কিংবা কোনো স্বচালিত গাড়ির লেন ঠিক রাখা—উভয়ই এই একক সাইবারনেটিক লুপ মেনে চলে।
২. সিস্টেমের স্থায়িত্ব ও কম্পন (Cerebellar Ataxia)
ক্লোজড-লুপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ট্রান্সফার ফাংশন ব্ল্যাকের সমীকরণ মেনে চলে:
[
T(s) = frac{G(s)}{1 + G(s)H(s)}
]
যদি সংকেত পৌঁছাতে অতিরিক্ত দেরি হয় (Time Delay), তবে নেগেটিভ ফিডব্যাক অনিচ্ছাকৃতভাবে পজিটিভ ফিডব্যাকে রূপান্তরিত হতে পারে। এর ফলে সিস্টেমটি স্থির হওয়ার বদলে হিংস্রভাবে কাঁপতে থাকে। স্নায়ুবিজ্ঞানীদের সাথে কাজ করে উইনার দেখান যে মানুষের মস্তিষ্কের সেরিবেলাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগীরা হাত দিয়ে কোনো কিছু ধরতে গেলে যে অনিয়ন্ত্রিত কম্পন (Purposive Tremor) দেখা দেয়, তা নিয়ন্ত্রণ প্রকৌশলের ফেজ মার্জিন পতনের হুবহু গাণিতিক প্রকাশ!
৩. তথ্য: জীবনের নেগেটিভ এনট্রপি
উইনার তথ্য ও তাপগতিবিদ্যার মধ্যে এক অনবদ্য দর্শন উন্মোচন করেছিলেন: থার্মোডাইনামিক এনট্রপি যেখানে মহাবিশ্বের ক্রমবিন্যাসকে বিশৃঙ্খলা ও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, সেখানে তথ্য হলো নেগেটিভ এনট্রপি বা সংগঠনের পরিমাপ। জীবদেহ হলো পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে স্থানীয় এনট্রপি হ্রাসকারী এক বিস্ময়কর সাইবারনেটিক দ্বীপ। উইনারের এই দর্শনই আধুনিক রোবোটিক্স, রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং এবং স্বায়ত্তশাসিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্ম দিয়েছে।